ইছাই ঘোষের দেউল: অজয় নদের তীরে ইতিহাস ও দেবী ভগবতীর কথা

পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে দুর্গাপুর মানে ইস্পাত কারখানা আর কোলাহল। কিন্তু শহর থেকে মাত্র ২৮ কিলোমিটার দূরে, কাঁকসা ব্লকের গভীরে একটি জঙ্গল আছে — গড় জঙ্গল। শাল-সেগুন-পলাশে ঘেরা, লাল মাটির সেই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে অজয় নদ। নদের ধারে, জঙ্গলের একটু ভেতরে হঠাৎ করেই যেন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন ইটের মন্দির। এই মন্দিরের চূড়ায় কোনো সোনা নেই, গায়ে টেরাকোটার জৌলুস নেই, তবু ৫০ ফুট উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় মানুষ একে বলে ইছাই ঘোষের দেউল। কেউ বলে এটি ৭ম শতকের, কেউ বলে ১৬শ’ শতকের। কেউ বলে এটি শিব মন্দির, কেউ বলে ভগবতী মন্দির। আর সবচেয়ে বড়ো রহস্য—এই মন্দিরের মুখ প্রচলিত প্রথার উলটো দিকে।
কে ছিলেন ইছাই ঘোষ?
ইতিহাসের বইয়ে ইছাই ঘোষের নাম খুব একটা পাওয়া যায় না, কিন্তু লোককথা আর গাজন গানে তিনি জীবন্ত। তিনি ছিলেন সদগোপ সম্প্রদায়ের মানুষ। সদগোপরা আসলে ছিল গো-পালক, কিন্তু বাংলার পাল ও সেন যুগে তাঁরা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
কথিত আছে, ইছাই ঘোষ প্রথমে লক্ষ্মণসেনের সেনাপতি ছিলেন। পরে তিনি বিদ্রোহ করে অজয় ও দামোদর নদের মধ্যবর্তী গড় জঙ্গল এলাকায় নিজের স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর রাজধানী ছিল ঢেকুরগড়। তিনি এতটাই শক্তিশালী ছিলেন যে তাঁকে ‘গোপরাজা’ বলা হত। ১৮৪৩ সালে ইংরেজ ঐতিহাসিকরাও লিখেছেনঃ “Ichhai Ghosh, the powerful Goala chief who ruled over the jungle tracts of western Bengal.”
ইছাই ঘোষ শুধু মন্দির নির্মাতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিদ্রোহী রাজা। ধর্মমঙ্গল কাব্য অনুযায়ী, গৌড়ের সম্রাটের বিশাল বাহিনীকে বারবার পরাজিত করেছিলেন তিনি; শেষ পর্যন্ত অবশ্য অজয় নদের তীরে এক প্রচণ্ড যুদ্ধে লাউসেনের হাতে নিহত হন। তাঁর কেল্লা আজও গড় জঙ্গলে ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে আছে, আর তাঁর স্মৃতি ধরে রেখেছে এই দেউল।
ইছাই ঘোষ বনাম লাউসেন — গোপ রাজা বনাম ধর্মরাজের যোদ্ধা
এই কাহিনি পাওয়া যায় বাংলার মধ্যযুগের মহাকাব্য ধর্মমঙ্গল কাব্যে। ধর্মমঙ্গল কাব্যের নায়ক হলেন লাউসেন, আর খলনায়ক বা প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন ইছাই ঘোষ।
ইছাই ঘোষ ও লাউসেন
১. বাংলায় তখন গৌড়ের সম্রাট। তাঁর অনেক সামন্ত রাজা ছিল। ইছাই ঘোষ ছিলেন গড় জঙ্গলের গোপরাজা। তিনি এত শক্তিশালী ছিলেন যে গৌড়ের সম্রাটের পাঠানো বিশাল সৈন্যবাহিনীকে বারবার পরাস্ত করতেন। সম্রাট তাঁকে বশে আনতে পারছিলেন না।
২. সেই সময় গৌড়ের আরেক সামন্ত ছিলেন কর্ণসেন – তাঁরই ছেলে লাউসেন। লাউসেন ছিলেন ধর্মঠাকুরের বরপুত্র, অত্যন্ত বীর ও সাহসী। সম্রাট ঠিক করলেন, ইছাই ঘোষকে দমন করতে লাউসেনকে পাঠাবেন।
৩. অজয় নদের তীরে ‘ঢেকুরগড়ে’ ইছাই ঘোষের কেল্লা ছিল। সেখানে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হয়। ধর্মমঙ্গল কাব্যের ইংরেজি সারসংক্ষেপে দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেনঃ “Ichhai Ghosa, who had baffled all attempts of the Emperor to bring him to submission, by destroying the vast armies sent at various times for the purpose, was killed by Lau Sen in a pitched battle.”
অর্থাৎ, ইছাই ঘোষ—যিনি এতদিন সম্রাটের সব সেনাকে হারিয়ে দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত লাউসেনের সঙ্গে সামনাসামনি যুদ্ধে মারা যান।
লোককথায় কী বলে?
গড় জঙ্গলের মানুষ এখনও বলে, ইছাই ঘোষ মারা যাননি, তিনি জঙ্গলের ভেতরে অন্তর্ধান করেছিলেন। তাঁর পূজিতা দেবী শ্যামরূপা কালী—যাঁকে কেউ কেউ ভগবতী বলেছেন—সেই মন্দির আজও আছে। লোকে বলে, যুদ্ধের আগের রাতে ইছাই ঘোষ সেই কালীমন্দিরে শেষ পূজা করেছিলেন।
লাউসেনের রাজধানী ছিল ময়নাগড়, তমলুকে। সেখানে এখনও লাউসেনের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত ধর্মঠাকুরের কচ্ছপ মূর্তির মন্দির আছে। তবে তাঁর রাজত্বকাল নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। কেউ বলেন তাঁর রাজত্বকাল সপ্তম শতকে, কেউ বলেন একাদশ শতকে। সময়কাল যাই হোক না কেন, তাঁর নামে যে দেউল, তা কিন্তু আজও তাঁর বীরত্বের সাক্ষ্য দেয়।


দেউল কোথায় এবং কেমন?
ইছাই ঘোষের দেউল পশ্চিম বর্ধমান জেলার গৌরাঙ্গপুর মৌজায়, অজয় নদের দক্ষিণ তীরে। কোঅর্ডিনেট ২৩.৬০৯৭° উত্তর, ৮৭.৪৫২৩° পূর্ব। দুর্গাপুর থেকে বাসে করে বনকাটি, সেখান থেকে টোটোতে দেউল পার্ক। বর্তমানে এখানে একটি ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র তথা ইকোপার্ক, হরিণ পার্ক, ও বাসযোগ্য রিসর্ট গড়ে তোলা হয়েছে।
স্থাপত্যের ভাষায় এটি একটি ‘রেখ-দেউল।’ বাংলায় মন্দির প্রধানত দুই রকম—চালা ও রেখ। বিষ্ণুপুরে চালা মন্দির দেখা যায়। রেখ-দেউল ওড়িশার মন্দিরের মতো লম্বা ও বাঁকা শিখরযুক্ত। বাংলায় হাতে গোনা ৬-৭টি রেখ-দেউল আছে—বহুলাড়া, বান্দা, পাড়া, জটার দেউল, বরাকরের পঞ্চানন মন্দির এবং ইছাই ঘোষের দেউল।

ডেভিড ম্যাককাচিয়ন (David John McCutchion) তাঁর বিখ্যাত বই ‘Late Mediaeval Temples of Bengal’-এ লিখেছেনঃ “Gourangapur’s Ichhai Ghoser Deul is a large smooth curvilinear rekha deul, having a base of 20 feet square. It is a plain brick structure but for niches and images on tower.”
দেউলের বিবরণ
উচ্চতা: ১৮ মিটার বা প্রায় ৫৫-৬০ ফুট; কোথাও ৮০ ফুটও বলা হয় প্ল্যাটফর্মসহ।
ভিত্তি: ৯.১০ মিটার × ৯.০০ মিটার বর্গাকার, ইটের তৈরি।
গর্ভগৃহ: জানালাবিহীন, অন্ধকার, ২.৫০ মিটার × ২.৫০ মিটার, উচ্চতা ৪.৫০ মিটার।
উপাদান: পাতলা, শক্ত ইট, চুন-সুরকির গাঁথনি। বাইরে একসময় চুনের পলেস্তারা ছিল, এখনও তার দাগ আছে।
শিখর: বক্ররেখা, উপরে আমলক ও কলসের ছত্রী।
মন্দিরের অলংকরণ
ইছাই ঘোষের দেউলের অলংকরণ খুব জাঁকজমকপূর্ণ নয়, বরং বাংলার প্রাচীন ‘রেখ-দেউল’ রীতির একদম সাদামাটা ও গম্ভীর রূপ— বলতে পারেন কারুকার্যহীন ঋজু ও শান্ত রূপ।
১. মূল কাঠামো — সাদামাটা ইটের গাঁথনি
বিখ্যাত স্থাপত্য-গবেষক ডেভিড ম্যাককাচিয়ন বলেছেন, “গৌরাঙ্গপুরের ইছাই ঘোষের দেউলটি একটি বৃহৎ, মসৃণ ও বক্ররৈখিক রেখ-দেউল, যার ভিত্তি ২০ ফুট বর্গাকার। এর শিখরের অংশটিতে কিছু কুলুঙ্গি (niches) এবং মূর্তি ছাড়া পুরোটিই একটি সাধারণ ইটের তৈরি কাঠামো।” পোড়ামাটির ইটের তৈরি পুরো দেউলটি নীচের দিকটা প্রায় সম্পূর্ণ অলংকরণহীন হওয়ায় একে একটা সামরিক দুর্গের মতো কঠিন চেহারা দিয়েছে। বর্তমানে এটি দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৯.১০ × ৯.০০ মিটার বর্গাকার ভিত্তির ওপর।
২. শিখরের অলংকরণ — আসল সৌন্দর্য
এর অলংকরণের আসল কাজটা কিন্তু শিখর বা চূড়ার দিকে।
বক্র শিখর: ১৮ মিটার উঁচু শিখরটি ধীরে ধীরে ওপরে সরু হয়ে গেছে, ওপরে একটি ছত্রী আছে।
চিত্র-সম্বলিত ইট: শিখর অংশটি অলংকরণ ও চিত্র-সম্বলিত। এখানে টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ছোট ছোট ফলকে লতা-পাতা, জ্যামিতিক নকশা ও দেবদেবীর মোটিফ খোদাই করা ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটাই ক্ষয়ে গেছে, কিন্তু কাছ থেকে দেখলে এখনও ইটের ওপর সূক্ষ্ম কারুকাজ বোঝা যায়।
কোনো জটিল মূর্তি নেই: বিষ্ণুপুর বা কান্তজীর মতো রামায়ণ-মহাভারতের প্যানেল এখানে নেই। এটি ওড়িশা-বাংলা সীমান্তের প্রাচীন রেখ-দেউল ঘরানার মতো—যেখানে জোর দেওয়া হয়েছে উচ্চতা ও আকারের গাম্ভীর্যে, অতিরিক্ত সাজসজ্জায় নয়।
৩. গর্ভগৃহ ও সামনের মূর্তি
ভেতরে একটি জানালাবিহীন, অন্ধকার গর্ভগৃহ আছে (প্রায় ৪.৫ মিটার উঁচু, মেঝের মাপ ২.৫ × ২.৫ মিটার)। দেউলের ভেতরে কোনো বিগ্রহ নেই, তবে সামনের দিকে তিনটি প্রাচীন পাথরের মূর্তি এখনও অক্ষত অবস্থায় আছে। মনে করা হয়, এগুলো পরবর্তীকালে স্থাপিত।
তাই বলা যায়, ইছাই ঘোষের দেউলের অলংকরণ আড়ম্বরহীন— কিন্তু তার ৮০ ফুট উচ্চতা ও নির্জন অজয় নদের তীরে দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিই তার সবচেয়ে বড়ো অলংকার।
মন্দিরের মুখ সত্যিই উলটো কেন?
এটাই এই মন্দিরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়।
ভারতের প্রায় ৯০% হিন্দু মন্দির পূর্বমুখী। কারণ শাস্ত্রমতে পূর্বদিকে সূর্যোদয়, দেবতা পূর্বমুখী হলে ভক্তের মুখ পশ্চিমে থাকে না—তা শুভ। কারণ শাস্ত্র মতে, দেবতাকে সম্মুখে রেখে ভক্ত যদি পশ্চিমমুখী হয়ে বসেন, তবে তা অশুভ নয়, কারণ তিনি সরাসরি ঈশ্বরের মুখ দর্শন করছেন। কিন্তু ইছাই ঘোষের দেউলের প্রবেশদ্বার পশ্চিমমুখী। অর্থাৎ মন্দিরের পেছন পূর্বদিকে, মুখ পশ্চিমে—অজয় নদের উলটো দিকে। কিন্তু কেন?
প্রথম মত—লোককথা
ইছাই ঘোষ ছিলেন খুব জেদি। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর মন্দির যেন অন্য কারও মন্দিরের মতো না হয়। তাই তিনি ইচ্ছা করে শাস্ত্র ভেঙে উলটো করে মন্দির বানান। গ্রামের বৃদ্ধরা এখনও বলেন, “রাজার মন্দির রাজার মতোই উলটো।”
দ্বিতীয় মত—তান্ত্রিক মত
এটি কোনো সাধারণ বৈষ্ণব মন্দির নয়, এটি শাক্ত মন্দির। তন্ত্রসাধনায় পশ্চিমমুখী মন্দির বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম হল সাধনার দিক, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের দিক। ভগবতীর পূজা অনেক সময় পশ্চিমমুখী মন্দিরে করা হয়। আবার গর্ভগৃহ জানালাবিহীন ও অন্ধকার—এটাও তন্ত্রসাধনার লক্ষণ।
তৃতীয় মত—পরিবেশগত
গড় জঙ্গলের পূর্বদিকে ঘন শালগাছ। পূর্বমুখী দরজা হলে আলো ঢুকত না। আর অজয় নদে বর্ষায় বন্যা হয়। পূর্বদিকে দরজা থাকলে বন্যার জল সরাসরি গর্ভগৃহে ঢুকে যেত। তাই বুদ্ধি করে পশ্চিমে দরজা করা হয়েছে।
যে কারণেই হোক, এই উলটো মুখের জন্য সূর্যাস্তের সময় পশ্চিমের শেষ আলো সরাসরি গর্ভগৃহে প্রবেশ করে। এল কাস্টিলোতে যেমন বিষুবের দিন সাপ নামে, এখানে তেমনি প্রতিদিন সূর্য দেবীকে প্রণাম করে অস্ত যায়।
অনেকে মনে করেন, ভগবতী আলাদা দেবী। আসলে ভগবতী হলেন আদিশক্তি, দুর্গারই আরেক নাম। ‘ভগ’ শব্দের অর্থ—ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান, বৈরাগ্য। যাঁর মধ্যে এই ছয়টি গুণ আছে, তিনিই ভগবতী।
শ্রীশ্রীচণ্ডী অনুযায়ী, ভগবতী তিন রূপে প্রকাশিত—মহাকালী, মহালক্ষ্মী, মহাসরস্বতী।
ইছাই ঘোষের দেউলের সঙ্গে ভগবতীর যোগ কী?
ইছাই ঘোষের দেউলকে শুধু একটি সাধারণ মন্দির ভাবলে ভুল হবে। এটি শাক্তপীঠ গড় জঙ্গলের অংশ। এখানেই আসে গড় জঙ্গলের মহাগুরুত্ব। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, গড় জঙ্গলেই পৃথিবীর প্রথম দুর্গাপূজা হয়েছিল। এই জঙ্গলে রাজা সুরথ যে ভগবতী দেবীর পূজা করেছিলেন, সেই ভগবতীই হলেন বাংলার দুর্গা। ইছাই ঘোষ সেই আদিশক্তিকেই নিজের কুলদেবী হিসাবে পূজা করতেন। তাই এই দেউল বাংলার দুর্গাপূজার ইতিহাসের একটি নীরব সাক্ষী।
ঘটনাটি কি ছিল?
মন্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতায় যুদ্ধে হেরে, রাজা সুরথ রাজ্য হারিয়ে এই গড় জঙ্গলে চলে আসেন। এখানে তখন মেধস মুনির আশ্রম ছিল। সেখানে তাঁর দেখা হয় সমাধি বৈশ্য নামক এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে, যাঁকে তাঁর নিজের স্ত্রী ও সন্তানরা সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। মুনি রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যকে দেবী ভগবতীর মাহাত্ম্য শোনান—যা পরে ‘শ্রীশ্রীচণ্ডী’ বা ‘দেবী মাহাত্ম্যম’ নামে সংকলিত হয়।
তখন মেধস মুনির পরামর্শে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য বসন্তকালে নদীর তীরে মাটির মূর্তি (মৃন্ময়ী প্রতিমা) গড়ে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। এটাই ছিল পৃথিবীর প্রথম দুর্গাপূজা—বসন্তকালে বলে বাসন্তী পূজা। শরৎকালের দুর্গাপূজা তার অনেক পরে রামচন্দ্র শুরু করেন।
তাই গড় জঙ্গলকে বলা হয় দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল। আজও এখানে মেধস মুনির আশ্রম, গড় চণ্ডীধাম, শ্যামরূপা কালীমন্দির আছে—যেখানে অষ্টভুজা সিংহবাহিনী দেবী পূজিতা হন। সেই দেবীই ভগবতী।
অর্থাৎ, ইছাই ঘোষের দেউল শুধু একটি রাজার স্মৃতি নয়, এটি বাংলার দুর্গাপূজার আদি ঐতিহ্যের ধারক। ইছাই ঘোষ সেই আদি ভগবতীকেই নিজের দেউলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরে মূর্তি নষ্ট হয়ে গেলে বা লুট হয়ে গেলে এখন সেখানে শিবলিঙ্গ বসানো হয়েছে। কিন্তু সামনে এখনও তিনটি প্রাচীন মূর্তির অবশেষ দেখা যায়।
বর্তমান সংরক্ষণ
১৯৮০ সাল থেকে এটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI) দ্বারা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ (N-WB-51) হিসাবে সংরক্ষিত। ইছাই ঘোষের দেউলের সংরক্ষণ ও পর্যটন নিয়ে সরকারের দুটি স্তরে কাজ চলছে—কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ আর রাজ্য পর্যটন উন্নয়ন।
সরকারি তালিকা অনুযায়ী দেউলটি ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI) দ্বারা ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সৌধ’ (Monument of National Importance) হিসাবে তালিকাভুক্ত। তালিকা নম্বর: N-WB-51।
এর অর্থ হল:
- ১৯৫৮ সালের প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান আইন অনুযায়ী, এর মূল কাঠামোয় কোনো পরিবর্তন করা যাবে না।
- ASI-এর বোর্ড লাগানো আছে মানে এই সৌধের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ASI করে।
- কোনো নতুন নির্মাণ বা সংস্কার করতে হলে ASI-এর অনুমতি বাধ্যতামূলক।
পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত
সবচেয়ে বড়ো সিদ্ধান্তটি হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।
পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন দফতর এবং ASI একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করেছে হেরিটেজ পর্যটনকে জোরদার করতে।
এই MoU-এর লক্ষ্য:
- রাজ্যে ASI-এর অধীনে থাকা ১৩৫টি সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভকে পর্যটন সার্কিটের সঙ্গে যুক্ত করা। ইছাই ঘোষের দেউল এর মধ্যে অন্যতম।
- দেউল চত্বরে পর্যটক-বান্ধব পরিকাঠামো তৈরি করা—ল্যান্ডস্কেপিং, শৌচাগার, পানীয় জল, চলাচলের পথ, বসার জায়গা, পার্কিং, সিসিটিভি, অডিও গাইড এবং স্মারক সামগ্রীর দোকান।
- তবে শর্ত হল, ঐতিহাসিক স্থাপত্যের চরিত্র যাতে কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। রাজ্য সরকার প্রস্তাব তৈরি করবে, ASI নজরদারি করবে।
স্থানীয় স্তরে যা হয়েছে

এর আগেই স্থানীয় বনকাটি পঞ্চায়েত ও জেলা পরিষদের তরফে দেউলকে ঘিরে একটি ‘দেউল পার্ক’ গড়ে তোলা হয়েছে। পর্যটকদের সুবিধার্থে বর্তমানে আধুনিক থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থাও রয়েছে। শীতকালে অজয় নদের তীরবর্তী মনোরম এই অঞ্চলটি এখন একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পিকনিক স্পট এবং উইকএন্ড ডেস্টিনেশন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
বর্তমানে শ্যামরূপা কালীমন্দির থেকে ইছাই ঘোষের দেউল পর্যন্ত জঙ্গলের বুক চিরে একটি আধুনিক পেভার ব্লকের রাস্তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে পর্যটকদের জন্য এখন গড় জঙ্গল, শ্যামরূপা মন্দির এবং দেউল—এই পুরো ঐতিহাসিক সার্কিটটি একসাথে ভ্রমণ করা অত্যন্ত সহজ হয়ে উঠেছে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করলেও, মূল প্রাচীন সৌধটির বর্তমান দশা কিন্তু বেশ উদ্বেগজনক। সঠিক যত্নের অভাবে দেউলের গা থেকে পুরোনো ইট খসে পড়ছে এবং এর চূড়ায় ও দেওয়ালে গজিয়ে উঠেছে বট-অশ্বত্থের গাছ। স্থানীয় পঞ্চায়েত ও জেলা পরিষদ এই ঐতিহাসিক অঞ্চলটিকে ঘিরে বিনোদনমূলক পার্ক বানালেও, প্রাচীন এই রেখ-দেউলটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে প্রত্নতাত্ত্বিক নিয়মে আরও বেশি বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ ও সংস্কার একান্ত জরুরি।
উপসংহার
মেক্সিকোর এল কাস্টিলো ও বাংলার ইছাই ঘোষের দেউল—দুটি মন্দির দুই মহাদেশে, কিন্তু দুটিরই উদ্দেশ্য এক—সময়কে ধরে রাখা। এল কাস্টিলো সূর্যের ছায়ায় সময় বলে, ইছাই ঘোষের দেউল উলটো মুখ করে সূর্যাস্তের আলোয় সময় বলে। একটি কুকুলকান সাপের, অন্যটি ভগবতী দুর্গার।
আজ যখন আমরা গড় জঙ্গলে দাঁড়িয়ে এই উলটোমুখী দেউল দেখি, তখন বুঝি এই মন্দির ইতিহাস, বিশ্বাস আর প্রকৃতির মিলনস্থল। ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশার নয়, ইতিহাস গোপরাজা ইছাই ঘোষেরও, ইতিহাস সেই ভগবতীরও— যাঁকে প্রথম পূজা করেছিলেন রাজা সুরথ এই জঙ্গলেই।
ইছাই ঘোষের দেউল শুধু একটা পুরোনো ইটের মন্দির মাত্র নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গের মধ্যযুগের এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের জীবন্ত দলিল।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
এই দেউল বাংলার সেই অল্প কয়েকটি ‘রেখ-দেউল’ শৈলীর মন্দিরের মধ্যে একটি, যেখানে ওড়িশার স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট। এর নির্মাণকাল নিয়েও বিতর্ক আছে—কেউ বলেন সপ্তম থেকে একাদশ শতাব্দী, ASI বলে ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইছাই ঘোষের বংশধরেরা পূর্বপুরুষের স্মৃতিতে এটি বানিয়েছিলেন। যেটাই সত্যি হোক, এটি প্রমাণ করে যে, অজয় নদের তীরে গড় জঙ্গল একসময় এক শক্তিশালী রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল।
ধর্মীয় গুরুত্ব
দেউলের ভেতরে কোনো বিগ্রহ না থাকলেও, এর পাশেই আছে ইছাই ঘোষের কুলদেবী ‘মা শ্যামরূপা’ বা ‘ভগবতী’-র মন্দির। একদিকে শাক্ত তন্ত্রের নরবলির ইতিহাস, অন্যদিকে কবি জয়দেবের হাত ধরে বৈষ্ণব প্রেমের ছোঁয়া—এই দুইয়ের মিলনেই শ্যামরূপা হয়ে উঠেছেন কৃষ্ণ-কালীর অভেদ রূপ। স্থানীয়রা আজও বিশ্বাস করেন, মন্দিরের নীচে দিয়ে দেউল পর্যন্ত এক গোপন সুড়ঙ্গ ছিল।
স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য
২০ বর্গফুট ভিত্তির ওপর ১৮ মিটার উঁচু এই সাদামাটা ইটের ইমারতের আসল সৌন্দর্য তার উচ্চতা ও গাম্ভীর্যে। নীচের অংশ অনাড়ম্বর হলেও শিখরের সূক্ষ্ম টেরাকোটা অলংকরণ, জানালাবিহীন গর্ভগৃহ এবং সামনের তিনটি অক্ষত পাথরের মূর্তি একে রহস্যময় করে তুলেছে।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
ASI দ্বারা সংরক্ষিত (N-WB-51) হওয়ায় এর ঐতিহাসিক চরিত্র সুরক্ষিত। আর ২০২৬-এর নতুন MoU অনুযায়ী, পর্যটন দফতর একে বিষ্ণুপুর-মুর্শিদাবাদের মতো হেরিটেজ সার্কিটে যুক্ত করছে। দেউল পার্ক, পাকা রাস্তা, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হওয়ায় আগে যে গভীর জঙ্গলে দিনের বেলাতেও মানুষ যেতে ভয় পেত, সেখানে এখন লক্ষাধিক পর্যটক আসেন—বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময়।
সব মিলিয়ে, ইছাই ঘোষের দেউল আমাদের শেখায় কীভাবে একটি পরিত্যক্ত ইটের স্তূপও স্থানীয় অর্থনীতি, লোকগাথা এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। এটি শুধু দেখার জায়গা নয়, এটি অনুভব করার জায়গা—যেখানে অজয়ের হাওয়া, শালজঙ্গলের নিস্তব্ধতা আর হাজার বছরের গল্প এক সঙ্গে মিশে আছে।
———-
তথ্যসূত্র
Archaeological Survey of India (ASI). (n.d.). List of Ancient Monuments and Archaeological Sites and Remains of National Importance in West Bengal: Monument No. 51. New Delhi: ASI.
ঘোষ, বিনয়। (১৯৭৬)। পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি। কলকাতা: প্রকাশ ভবন।
মার্কণ্ডেয় পুরাণ ও শ্রীশ্রীচণ্ডী। (এন.ডি.)। “গড় জঙ্গলের প্রথম দুর্গাপূজা।”
McCutchion, D. J. (1972). Late Mediaeval Temples of Bengal. Calcutta: The Asiatic Society.
পশ্চিমবঙ্গ সরকার। (এন.ডি.)। “তথ্য ও বিবরণ।” পশ্চিম বর্ধমান জেলা সরকারি ওয়েবসাইট।
Sen, D. C. (1911). History of Bengali Language and Literature. Calcutta: University of Calcutta.
ছবিঃ অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
