গণনাট্য মঞ্চের নারীরা

গণনাট্য মঞ্চের নারীরা

গণনাট্য মঞ্চ

ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা Indian People’s Theatre Association, সংক্ষেপে IPTA, এমন এক সময়ে গড়ে উঠেছিল যে সময়টায় ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ঔপনিবেশিক শাসন, স্বাধীনতার আন্দোলন এবং ১৯৪৩–এর বাংলার দুর্ভিক্ষ সেইসময় মানুষের জীবনকে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছিল। ১৯৪৩ সালের ২৫শে মে বোম্বেতে সর্বভারতীয় নাট্যকর্মীদের এক সম্মেলনে IPTA-র আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয়। এর আগে প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন, কলকাতার ‘Youth Cultural Institute’ এবং বেঙ্গালুরুর ‘People’s Theatre’–র মতো উদ্যোগ একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভিত তৈরি করেছিল। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের জীবন ও শিল্পচর্চার মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এই সংগঠনটি নাটক, সঙ্গীত ও নৃত্যের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজ ও রাজনীতির বাস্তব ছবি ফুটিয়ে তুলত।

এই সংস্থার গঠন ছিল মূলত একটি সর্বভারতীয় সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্কের মতো। বিভিন্ন অঞ্চলের নাট্যদল ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। বাংলা, হিন্দি, গুজরাতি, মারাঠি, মালয়ালমসহ নানা ভাষার শিল্পীরা এই আন্দোলনের অংশ হন। নাটকের পাশাপাশি গান, লোকনৃত্য, ব্যালে, এবং পথনাটকের মতো মাধ্যমও ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৪৪ সালে ‘Central Cultural Troupe’ গঠিত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় IPTA-র সাংস্কৃতিক দলগুলি ঘুরে অনুষ্ঠান করতে শুরু করে। কৃষকসভা ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ ছিল। স্বাভাবিকভাবেই গণনাট্যের পরিবেশনা শুধু শহরের নাট্যশালায় আসা দর্শকদের মাঝেই আটকে থাকেনি। গ্রামগঞ্জ, কারখানা, শ্রমিক বস্তি, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশকেও তারা তাদের সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র বানিয়ে তুলেছিলেন।

মঞ্চের এই রূপান্তরের সমান্তরালেই আবর্তিত হয়েছে নারীর অধিকার ও উপস্থিতির ইতিহাস। ভারতীয় নাট্যজগতে গণনাট্য আন্দোলনের পূর্বেই নারীচরিত্রের অভিনয় শুরু হলেও সামাজিক স্বীকৃতি তখনও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। উনিশ শতকের বাংলার রঙ্গমঞ্চে যেসব প্রথম সারির অভিনেত্রীর আবির্ভাব ঘটেছিল, তাঁদের বড়ো অংশই ছিলেন সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির প্রতিনিধি। প্রতিভা এবং সংগীতের গুণ থাকা সত্ত্বেও কেবল actress পরিচয়ের কারণে সমাজ তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা দেয়নি। কালক্রমে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ঘরের নারীরা যখন অভিনয়ে এগিয়ে এলেন, তখন সমাজমানসে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করা গেল। কিন্তু তাঁদেরও প্রতিনিয়ত লড়তে হত পারিবারিক প্রতিরোধ, সামাজিক অনুশাসন এবং নারীর প্রকাশ্য বিচরণ নিয়ে তৈরি হওয়া রক্ষণশীল মানসিকতার বিরুদ্ধে। একজন নারী ঘরের বাইরে গিয়ে অভিনয় করবেন, পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করবেন, দলের প্রয়োজনে দূর–দূরান্তে সফর করবেন কিংবা রাজনৈতিক মঞ্চে উপস্থিত থাকবেন, এমন দৃশ্য তৎকালীন সমাজে সহজে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করা হত না।

কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়

সেই বিশেষ পরিস্থিতিতে নারীদের স্বাবলম্বী ও বিকশিত হওয়ার এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছিল এই সংস্থা। তবে এই নতুন পরিসরকে শুধু মুক্তির একটি সরল আখ্যান হিসেবে দেখলে নাট্য সংঘতে নারীদের অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিকতা আড়ালে থেকে যায়। নারীর দৃশ্যমানতা যেমন বেড়েছিল, তেমনই সংগঠনের ভিতরে তাঁদের ভূমিকা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নও নতুনভাবে সামনে এসেছিল। শুরু থেকেই এই সংগঠনের কর্মকাণ্ডে নারীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষণীয় ছিল। অনিল দে সিলভা থেকে শুরু করে শীলা ভাটিয়া, দিনা গান্ধী, রশীদ জাহান, রেখা জৈন, কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়, এবং রেবা রায়চৌধুরী— সকলেই বিভিন্ন পর্বে IPTA-র ছাতার তলায় এসেছিলেন। তবে তাঁদের সবার ভূমিকা এক ছিল না। কেউ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে মঞ্চে নিজের ছাপ রেখেছেন, কেউ গান ও নৃত্যে নাট্যপ্রযোজনাকে সমৃদ্ধ করেছেন, আবার কেউ যুক্ত ছিলেন সাংগঠনিক কাজের সঙ্গে। এই প্রসঙ্গে বোম্বে শাখার শান্তা গান্ধী, তারলা মেহতা (বা তরলা মেহতা) এবং দিনা মেহতার কথা উল্লেখযোগ্য। লোকনাট্যের বিভিন্ন উপাদান নিয়ে তাঁরা নতুনভাবে কাজ করেছিলেন। কলকাতার IPTA-র নাট্যআন্দোলনে তৃপ্তি মিত্রের অভিনয়ও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।

জোহরা সেহগাল

সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাবে উক্ত সংস্থায় নারীদের অবদানের গুরুত্ব বোঝানো সম্ভব নয়। এই সংঘের সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁদের ঘরের বেঁধে দেওয়া গণ্ডি পেরিয়ে বহির্জগতের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পথ দেখিয়েছিল। মঞ্চের অভিনয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁরা শামিল হয়েছিলেন রাজনৈতিক সভায়, অংশ নিয়েছিলেন সাংস্কৃতিক সফরে ও ত্রাণ সংগ্রহে, গড়ে তুলেছিলেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। গবেষক প্রার্থনা পুরকায়স্থের লেখায় এই অভিজ্ঞতার এক অনন্য দিক উন্মোচিত হয়েছে। তিনি মনে করেন, IPTA-র নারী শিল্পীদের অবদানকে কেবল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মোড়কে বন্দি করা যায় না। তাঁদের দৈহিক শ্রম, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে লড়াইকেও এই ইতিহাসের পাতায় জায়গা দিতে হবে। একজন নারী যখন সমাজ ও সংসারের প্রথা ভেঙে জনসমক্ষে অভিনয় কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন, তখন তাঁর সেই পদচারণাই এক নতুন সামাজিক বার্তা বহন করে।

IPTA-র নাট্যচর্চায় বাংলার দুর্ভিক্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল। তারই উল্লেখযোগ্য প্রকাশ ঘটল বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটকে। দুর্ভিক্ষপীড়িত এক কৃষক পরিবারের জীবনসংকটকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই নাটক গ্রামীণ মানুষের যন্ত্রণা শহুরে দর্শকের সামনে প্রত্যক্ষভাবে তুলে ধরেছিল। ১৯৪৪ সালে কলকাতায় মঞ্চস্থ হওয়ার পর থেকেই ‘নবান্ন’ IPTA-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনা হয়ে ওঠে। তৃপ্তি মিত্র ও শোভা সেনের অভিনয়ও নাটকটির প্রভাবকে আরও গভীর করেছিল।

তৃপ্তি মিত্র

নারীর এই বহুমাত্রিক অংশগ্রহণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণগুলোর একটি তৃপ্তি মিত্রের নাট্যজীবন। তৃপ্তি মিত্রের নাট্যজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব শুরু হয় ১৯৪৩ সালে বিজন ভট্টাচার্যের ‘আগুন’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। পরে ‘জবানবন্দি’ ও ‘নবান্ন’–তে তাঁর অভিনয় তাঁকে ভারতীয় গণনাট্যের অন্যতম পরিচিত মুখ করে তোলে। ‘নবান্ন’–র অভিনয়রীতিতে প্রচলিত মঞ্চের কৃত্রিমতার বদলে জীবনের কাছাকাছি অভিনয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। তৃপ্তি মিত্র সেই নতুন ধারার অন্যতম উল্লেখযোগ্য শিল্পী। তাঁর অভিনয়ে দুর্ভিক্ষের বাস্তবতা দর্শকের কাছে আরও প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে খাজা আহমেদ আব্বাসের ‘ধর্তি কে লাল’ ছবিতেও তিনি অভিনয় করেন। ১৯৪৮ সালে শম্ভু মিত্রের সঙ্গে ‘বহুরূপী’ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তাঁর নাট্যজীবন নতুন পর্বে প্রবেশ করে। তবে তাঁর অভিনয়শৈলী ও গণমুখী নাট্যচেতনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়েছিল IPTA-র সময়েই।

রেখা জৈন

গণনাট্য সংঘের নারী শিল্পীদের বহুমাত্রিক ভূমিকা অনুধাবনের ক্ষেত্রে রেখা জৈনের জীবন একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। ১৯৪০–এর দশকে তিনি IPTA-র ‘সেন্ট্রাল কালচারাল ট্রুপ’–এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক সফরে অংশ নেন। বোম্বের ‘সেন্ট্রাল ব্যালে ট্রুপ’–এ শান্তিবর্ধনের অধীনে নৃত্যনাট্যের নিয়মতান্ত্রিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তিনি দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রযোজনায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। এই সফরগুলো শিল্পতত্ত্বের সমান্তরালে রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচার এবং মানবিক ত্রাণ সংগ্রহের এক মেলবন্ধন ছিল। বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে বোম্বেতে আয়োজিত সংস্থার একটি প্রদর্শনীর শেষে তিনি দর্শকদের কাছে অর্থ সাহায্যের আবেদন জানান। মঞ্চে উপস্থাপিত প্রান্তিক মানুষের সংকটের সঙ্গে বাস্তব জীবনকে যুক্ত করে দর্শকদের কাছ থেকে এই তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগটি সংস্থার সমাজভাবনার পরিচয় দেয়।

রেখা জৈনের উত্তরকালীন অবদানও ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭৯ সালে তিনি ‘উমং’ নামের একটি নাট্যদল প্রতিষ্ঠা করে শিশু–কিশোরদের সাংস্কৃতিক বিকাশে আত্মনিয়োগ করেন। বৈচিত্র্যময় সামাজিক পটভূমি থেকে আসা শিশুদের মঞ্চের আঙিনায় নিয়ে আসার এই উদ্যোগের মধ্যে IPTA-র গণমুখী দর্শনের সুদূরপ্রসারী প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। স্পষ্টতই, এই প্রগতিশীল সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা কেবল তারুণ্যের একটি পর্বে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেই সময় গড়ে ওঠা চেতনা ও মূল্যবোধ, বিশেষ করে শিল্পকে গণমানুষের সম্পদে পরিণত করার ভাবনা, পরবর্তী জীবনেও তাঁর কাজের মধ্যে নতুন আঙ্গিকে প্রতিফলিত হয়েছে।

IPTA-র নারী–ইতিহাসের মানচিত্রটি কেবল কলকাতা বা বাংলা কেন্দ্রিক ছিল না। ১৯৪৫ সালে এই প্রগতিশীল ভাবধারায় যুক্ত হন জোহরা সেহগল, যিনি পরবর্তী বছরই ঐতিহাসিক ‘ধরতি কে লাল’ চলচ্চিত্রে অবতীর্ণ হন। সমান্তরালভাবে তিনি ‘পৃথিবী থিয়েটার্স’–এর সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন এবং দলগতভাবে দেশব্যাপী নানামুখী সফরে অংশ নেন। নৃত্য, নাট্যকলা ও মঞ্চায়নের বিবিধ ধারায় তাঁর সমান পারদর্শিতা ছিল। তাঁর সুদীর্ঘ কর্মজীবন গণনাট্যের সাংস্কৃতিক বলয়ে আঞ্চলিক ও ভাষাগত সীমানার অতীত বিস্তারকে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করে। তৎকালীন রক্ষণশীল সামাজিক পরিসরে একজন নারী শিল্পীর এই সর্বভারতীয় পরিভ্রমণ পেশাগত উৎকর্ষের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর সামাজিক তাৎপর্য বহন করেছিল। দীর্ঘদিন গৃহের বাইরে থাকা, পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করা এবং বিভিন্ন জনপদে গিয়ে শিল্প পরিবেশন করা ছিল প্রচলিত সামাজিক বিধিনিষেধ অতিক্রমের এক সাহসী প্রয়াস।

গণনাট্যের ইতিহাসে শওকত কাইফি এক অনন্য নাম। কমিউনিস্ট রাজনীতির সক্রিয় কর্মী শওকত, IPTA এবং ‘প্রগতিশীল লেখক সংঘ’–এর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মূল স্রোতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কবি কাইফি আজমির সঙ্গে তাঁর প্রেম ও বৈবাহিক বন্ধনও এই অভিন্ন মঞ্চেই গড়ে ওঠে। অভিনয়, কবিতা, রাজনীতি ও সংসার— সবকিছুই সেখানে এক সুতোয় গাঁথা ছিল। শওকত কাইফির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্বাস, শিল্পচর্চা ও ব্যক্তিগত জীবন পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠেছিল। IPTA-র মতো প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক পরিসর তাই তাঁর কাছে  শুধু রাজনৈতিক কাজের ক্ষেত্র ছিল না, ব্যক্তিজীবন ও শিল্পীসত্তা নির্মাণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হয়ে উঠেছিল। বরং দুটি দিকই একে অন্যকে প্রভাবিত করেছিল, তা এই ঘটনা থেকে অনুধাবন করা যায়। এই প্রগতিশীল চেতনাকে মনেপ্রাণে ধারণ করার অর্থই ছিল, তৎকালীন সামাজিক রক্ষণশীলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জীবনকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানো।

পূর্বোক্ত নারী শিল্পীদের জীবনচর্যা পর্যালোচনা করলে আরেকটি বাস্তব সত্য উন্মোচিত হয়। IPTA যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছিল, তা শতভাগ প্রতিবন্ধকতাহীন ছিল না। পারিবারিক মনস্তাপ, সামাজিক বিধিনিষেধ এবং নারীর গতিশীলতার ওপর নিয়ন্ত্রণ তাঁদের অবদমিত করত। কোনো পুরুষ কর্মী প্রগতিশীল সংগঠনে যুক্ত হলে যে সামাজিক জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতেন, একজন নারীর ক্ষেত্রে তার সঙ্গে যুক্ত হত লিঙ্গভিত্তিক নানাবিধ জটিলতা। নৈশকালীন প্রত্যাবর্তন, দলের সঙ্গে দূরবর্তী অঞ্চলে সফর, পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করা কিংবা নাট্যচর্চাকে জীবিকা হিসেবে বেছে নেওয়া, নারীর জীবনে এমন প্রতিটি পদক্ষেপই ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে সামাজিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠত। ব্যক্তিস্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তাই বারবার মুখোমুখি হত প্রচলিত পারিবারিক মূল্যবোধের। এই টানাপোড়েন থেকে জন্ম নেওয়া সামাজিক ও মানসিক সংগ্রামকে IPTA-র সামগ্রিক ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

তবে এই সংঘের প্রগতিশীল আদর্শের মধ্যেও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রভাব রয়ে গিয়েছিল। নারীরা মঞ্চে অভিনয় করেছেন, গান গেয়েছেন, নৃত্য পরিবেশন করেছেন, দেশজুড়ে সফর করেছেন এবং ত্রাণ সংগ্রহেও সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তাঁরা সমানভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার পাননি। বিশেষ করে নাট্যনির্মাণ, কোরিওগ্রাফি এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীতি নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পুরুষদের প্রাধান্য অনেক সময়ই বজায় ছিল।

বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে IPTA-র সেই ঐতিহাসিক অধ্যায়টি মূল্যায়ন করতে গেলে প্রধান অন্বেষণটি কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক উপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং মূল অনুসন্ধানের বিষয় হলো, নারী শিল্পীরা তাঁদের নিজস্ব এজেন্সী বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য কতটা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। যে মঞ্চটি আপামর জনসাধারণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে নির্মিত হয়েছিল, সেখানে নারীর ব্যক্তিগত উপলব্ধি, দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিনির্ধারণী কর্তৃত্বের জায়গা কতটুকু সংরক্ষিত ছিল; তা নিরূপণ করা ইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ কাজ। তৃপ্তি মিত্র থেকে রেখা জৈন, জোহরা সেহগল থেকে শওকত কাইফি, এই অগ্রগামী নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে অর্জিত সুযোগ তাঁদের শিল্পীসত্তা, সৃজনশীলতা ও সামাজিক ভূমিকার নতুন পরিসর তৈরি করেছিল। গন-নাট্যের নারীর গতিশীলতার পথ প্রশস্ত করেছিল, যার সুবাদে তাঁরা নাট্যজগতে অবতীর্ণ হয়ে নিজেদের সৃজনশীল সত্তা বিকশিত করেন এবং উত্তরসূরিদের জন্য একটি প্রগতিশীল পথ তৈরি করে যান। তাঁদের ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা এখানেই নিহিত। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নারীর এই অবস্থান শুধু একটি বদলে যাওয়া সময়ের স্মৃতি বহন করে না; এর মধ্যে ধরা পড়ে সমাজের দীর্ঘ ও চলমান রূপান্তরেরও চিহ্ন।

———–

তথ্যসূত্র

চৌধুরী, দর্শন। (২০১৬)। গণনাট্য আন্দোলন। কলকাতা: অনুষ্টুপ প্রকাশনী।

দাশগুপ্ত, বাবলু, এবং শর্মা, শিব (সম্পাঃ)। (১৯৯৩)। গণনাট্য: পঞ্চাশ বছর। কলকাতা: গণনাট্য প্রকাশনী, ভারতীয় গণনাট্য সংঘ।

ভট্টাচার্য, অমিত্রসূদন। (২০১১)। তৃপ্তি মিত্র। কলকাতা: প্রতিভাস।

মিত্র, শাঁওলী। (২০০৫)। গণনাট্য নবনাট্য সৎনাট্য ও শম্ভু মিত্র। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।

ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত। 

অগ্নীশ্বর সরকার ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বর্ধমান জেলার কালনায় জন্মগ্রহণ করেন। ইন্সট্রুমেন্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে কালনা মহারাজা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি গভীর আগ্রহ থাকায় ‘আনন্দমেলা’, ‘সাপ্তাহিক বর্তমান’, ‘বিচিত্রপত্র’, ‘জলফড়িং’, ‘সর্বভূতেষু’, ‘কচিপাতা’, ‘ইলশেগুঁড়ি’, ‘কালি কলম মনন’, ‘মেঘমুলুক’, ‘অক্ষরের রূপকথা’ সহ বহু পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। তাঁর একক গ্রন্থ ‘তোমার জন্য’ ও ‘পৌষালী’ পাঠকমহলে বিশেষ প্রশংসিত হয়েছে। সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘মাতৃ অর্ঘ্য সম্মাননা’ (২০১৮), ‘সারা ভারত স্কুল রাইটিং প্রতিযোগিতা’য় দ্বিতীয় স্থান (২০১৯), এবং ‘রেনেসাঁস সাহিত্যসম্মান’ (২০২৪) অর্জন করেন। তিনি ‘আনন্দকানন’ পত্রিকার সম্পাদক এবং নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *