পৃথিবীর আধুনিক কবিতায় বারোক (Baroque) স্টাইলের প্রত্যাবর্তন – ২

পৃথিবীর আধুনিক কবিতায় বারোক (Baroque) স্টাইলের প্রত্যাবর্তন

দ্বিতীয় পর্ব – আধুনিক আমেরিকান কবিতা

এই ধারাবাহিক প্রবন্ধের প্রথম পর্বে আমি লিখেছিলাম যে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক স্টেফানি বার্ট ২০১৪ সালে বস্টন রিভিউয়ের এক প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন আমেরিকান কবিতায় সপ্তদশ শতাব্দীর বারোক স্টাইল ফেরত আসছে ‘প্রায় বারোক’ বা ‘নয়া বারোক’ (আমার দেওয়া নাম) রূপে। সেই প্রসঙ্গে আমি প্রবন্ধের প্রথম পর্বে আলোচনা করেছিলাম শিল্প, স্থাপত্য, সংগীত, এবং কবিতায় আদি বা মূল বারোক স্টাইল নিয়ে। 

এবারের দ্বিতীয় পর্বে আমি আলোচনা করব আধুনিক আমেরিকান কবিতায় বারোক স্টাইলের প্রত্যাবর্তন নিয়ে। তিনজন সমসাময়িক অথচ প্রতিষ্ঠিত কবির কবিতা থেকে উদাহরণ দেব। এই কবিরা স্বচ্ছতা ও উপযোগিতার চেয়ে বর্ণাঢ্য অলঙ্করণ, বিস্তারিত বর্ণনা, এবং শৈল্পিক কারুকাজ বা কৃত্রিমতাকে অধিক গুরুত্ব দেন। এদের মধ্যে অ্যাঞ্জি এস্টেস (Angie Estes) এবং রবিন শিফের (Robyn Schiff) কথা স্টেফানি বার্ট বলেছেন। আমার উদাহরণগুলির মধ্যে কিছু হবে স্টেফানি বার্টের প্রবন্ধের থেকে উদ্ধৃত, কিছু হবে নতুন এবং  বিস্তারিত, আর কার্ল ফিলিপসের কবিতার কথা এই প্রসঙ্গে হবে একেবারে নতুন।

কিন্তু তার আগে শিল্প, স্থাপত্য, সংগীত, এবং কবিতায় আদি বারোক স্টাইলের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি আমাদের আর একবার ঝালিয়ে নেওয়া দরকার।

  • বারোক চিত্রশিল্পের সবচেয়ে চেনা বৈশিষ্ট্য হলো আলো ও ছায়ার তীব্র প্রতিতুলনা (contrast)।
  • চরম নাটকীয়তা, তীব্র আবেগ, বিস্তৃত অলংকরণ, এবং প্রাণবন্ত, বৈপরীত্যপূর্ণ আলোকসজ্জা নিয়ে এই শিল্পধারা ছিল সাহসী, নাটকীয় এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে ইন্দ্রিয়গ্রাহী।
  • বারোক স্থাপত্য শিল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য তাদের বিশাল আকার ও প্রচুর অলঙ্করণ।
  • বারোক সঙ্গীত ছিল তার যুগের দৃশ্যশিল্পের মতোই শক্তিশালী, আবেগময় এবং অলঙ্কৃত। বারোক সঙ্গীতের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, কোনো একটা সঙ্গীতাংশ শুধু একটিই অনুভব জাগাবে শ্রোতার মনে – সে আনন্দ হলে শুধুই আনন্দ, বিষাদ হলে শুধুই বিষাদ।
  • ইংরেজি সাহিত্যে বারোক শৈলী বলতে আমরা মোটামুটি ভাবে সপ্তদশ শতাব্দীর মেটাফিজিক্যাল (metaphysical) বা অধিবিদ্যা-বিষয়ক কবিদের উদাহরণ দিই। বারোক শিল্প এবং সঙ্গীতের মতই বারোক কবিতার বিষয়বস্তু হিসেবে দেখা যায় পবিত্র ও অপবিত্রের সংঘর্ষ, এবং তার সঙ্গে অতিশয়োক্তি, বৈপরীত্য ও নাটকীয় সম্বোধন। আর তার সঙ্গে টেকনিক হিসেবে দেখা যায় এক স্বতন্ত্র কাব্যকৌশল, যার দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো-

১) মেটাফিজিকাল কনসিট (Metaphysical Conceit): সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী দুটি বিষয়ের মধ্যে বিস্তারিত, যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্য স্থাপন — কেবল সংক্ষিপ্ত রূপক নয়, বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী তার্কিক কাঠামো বা বর্ধিত রূপক (conceit)।

২) কথ্য অথচ জটিল বাক্যগঠন: এই কবিতার ভাষা বাইরে সরল মনে হলেও ভেতরে অত্যন্ত জটিল। বাক্য মাঝপথে শুরু হয়, বাধা পড়ে, আবার শুরু করে, যুক্তি দেয়।

অ্যাঞ্জি এস্টেস (Angie Estes)

আমেরিকান কবিতার আলোচনা শুরু করব অ্যাঞ্জি এস্টেস (Angie Estes) কে দিয়ে। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম বই The Uses of Passion Peregrine Smith Poetry প্রাইজ পায়। Tryst ২০১০ সালের পুলিৎজার পুরস্কারের জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের দুই প্রতিযোগীর একজন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। এছাড়া Enchantée ২০১৫ সালে Kingsley Tufts Poetry এবং Audre Lorde Prize for Poetry পুরস্কার পেয়েছিল। স্টেফানি বার্টের ভাষায় অ্যাঞ্জি এস্টেস  “has created some of the most beautiful verbal objects in the world.”

২০০৪ সালে প্রকাশিত Chez Nous এর একটি কবিতা ‘Sans Serif’. পাঠকের হয়তো জানা আছে যে ‘স্যান্স-সেরিফ’ হলো এমন এক ধরনের অক্ষরশৈলী বা টাইপফেস, যার অক্ষরগুলোর প্রান্তভাগে ‘সেরিফ’ (serif) নামে পরিচিত কোনো ছোট আলংকারিক রেখা থাকে না। ‘স্যান্স’ (sans) শব্দটি ফরাসি ভাষা থেকে এসেছে এবং এর অর্থ হলো ‘বিহীন’ বা ‘ছাড়া’। এই কবিতায়

অ্যাঞ্জি এস্টেস লিখছেন –

It’s the opposite of
Baroque, so I want
none of it— clean
and spare, like Cassius
it has that lean
and hungry look, Mercury’s
clipped heels, the rag
of the body without
breath.

অর্থাৎ তিনি কবিতায় চান এমন এক ‘নয়াবারোক’ শিল্প যা কেবল ঐশ্বর্যমণ্ডিতই নয়, বরং প্রাচুর্যময়, যা আইডিয়ার এবং অলংকরণের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। এই কথাগুলিরই প্রতিধ্বনি শুনুন ওই কবিতারই পরের লাইনগুলোতে-

A chorus of
alleluias, on the other
hand, is not only opulent
but copious, a cornucopia
of opinion which concludes
that opera is work, the haute gold
opus of the soprano, which does not
oppress yet presses against
her chest like the green glass flacon
de l’opéra held between
her breasts to keep the cognac
warm.

পাঠক লক্ষ্য করতে ভুলবেন না এই কবিতার বিশিষ্ট চলন – শব্দের এই নানাবিধ খেলার মধ্যে এস্টেস কিভাবে এক স্বর্গীয় সুর তৈরী করেছেন, কিভাবে সেই সুর দিয়ে পুরো কবিতাটিকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

Chez Nous এর আর একটি কবিতা True Confessions। কবিতাটি শুরু হয় এই লাইনগুলির উদ্ধৃতি দিয়ে –

I can never get a zipper
to close. Maybe that stands
for something, what do you think?

পাঠকের হয়তো জানা আছে এই উক্তিটি নেওয়া হয়েছে ১৯৪৬ সালে Rita Hayworth অভিনীত চলচ্চিত্র Gilda থেকে, যেখানে উনি নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন। সিনেমার শুরুর দিকে Rita Hayworth কথাগুলি বলেন তাঁর সিনেমার স্বামী এবং স্বামীর বন্ধুকে। এই মোহময়ী ও দ্ব্যর্থবোধক মন্তব্য থেকে শুরু করে এস্টেস পুরো কবিতাটিতেই ‘গ্ল্যামার’ বা চাকচিক্যের এক বাহুল্য গড়ে তুলেছেন, এবং তীব্র গতি ও সুরেলা সঞ্চারের মাধ্যমে জটিল বাক্যরচনা থাকা সত্ত্বেও পাঠককে মনভোলানো আকর্ষণে বেঁধে রেখেছেন।

পড়ুন এই কবিতারই পরের কয়েকটা লাইন –

And the true
home of glamour, by which
I mean of course the grammar
of glamour, is Scotland
because glamour is a Scottish variant
of grammar with its rustle of moods
and desires. Which brings us back to
the zipper and why we want it
to close, each hook climbing another
the way words ascend a sentence, trying on
its silver suture like clothes.

এরপর আসুন আমরা পড়ি Tryst-এর একটি কবিতা Gloss । এ কবিতা শুরু হয় এইভাবে –

My mother said that Uncle Fred had a purple
heart, the right side of his body
blown off in Italy in World War II,
and I saw reddish blue figs
dropping from the hole
in his chest, the violet litter
of the jacaranda, heard the sentence
buckle, unbuckle like a belt
before opening the way
a feed sack opens all
at once when the string is pulled
in just the right place:
the water in the corn pot
boils, someone is slapped, and summer
rain splatters as you go out
to slop the hogs.

১৬ ছত্র বা লাইন জুড়ে একটিই চরণ অথচ কী মধুর তার চলন। এস্টেসের কবিতায় পাবেন ফরাসি, ল্যাটিন ও ইতালীয় শব্দ নিয়ে ভাষার নানাবিধ খেলা এবং ইতিহাস এবং সংস্কৃতির নানান বিষয় নিয়ে অনুষঙ্গ। এ কবিতার গভীরতা বুঝতে আপনাকে সময় কাটাতে হবে কবিতাগুলি নিয়ে, প্রশ্ন করতে শিখতে হবে। স্টেফানি বার্টের ভাষায়, “The arts — from Cimabue’s painting to haute cuisine — are for Estes never mere luxuries; rather, the arts, and our pride in them, give us the only effective countermeasures to loneliness, helplessness and serious pain.”

রবিন শিফ (Robyn Schiff)

 রবিন শিফের প্রথম কবিতার বই Worth প্রকাশ পায় ২০০২ সালে। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে এই বইটি কোনো বড় পুরস্কার পায়নি। তাঁর পরের বইগুলি সমালোচক মহলে আদৃত হয় বেশি – Revolver (2008) PEN Award এর ফাইনালিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে, আর

Information Desk: An Epic (2023) পেয়েছে ২০২৪ সালের Four Quartets Prize এবং ওই একই বছরে Pulitzer Prize এর জন্য ফাইনালিস্ট হয়। শিফ এখন শিকাগো ইউনিভার্সিটির ইংরেজির অধ্যাপক।

আসুন আমরা শুরু করি Worth এর একটি কবিতা House of Dior দিয়ে। ‘হাউস অফ ডিওর’ হলো একটি ফরাসি বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউস, যা ডিজাইনার Christian Dior ১৯৪৬ সালে প্যারিসের 30 Avenue Montaigne-এ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। Worth পুরো বইটাই ফ্যাশনের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ এবং এমন সব বিষয় নিয়ে রচিত যা সচরাচর কবিতায় দেখা যায় না—যেমন Chanel No. 5, Tifanny & Co., এবং আরো নানা ধরনের রত্ন ও বিখ্যাত জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান নিয়ে কবিতা।

House of Dior শুরু হয় এইভাবে –

Now we are on the chapter of pleats.
The impatience to fold, the joys of having folded,
The pleasure of folding them again.

বার্টের মতে, শিফের “হাউস অফ ডিওর”-এর পোশাকের কুঁচি বা ‘প্লিটের’ যে নিখুঁত বিন্যাস রয়েছে, তাকে কাব্যিক সৃষ্টিরই এক রূপক হিসেবে দেখা যায়। Pleat একই সাথে কাপড়ের একটি ভাঁজ এবং কোনো যুক্তি বা বইয়ের “অধ্যায়”। সরাসরি মনে পড়িয়ে দেয় আদি বারোক যুগের কবি John Donne-এর The Flea বা Goerge Herbert-এর The Collar.

রবিন শিফের এই কবিতাটি আমাকে বেশ কিছুদিন আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। উদ্ধার পাই এই কবিতাটি লিখে –

কামোফ্লাজ
অমিত চক্রবর্তী

অরিগামি সিনট্যাক্স ভীষণ প্রিয় ছিল তার
ভাঁজের ভেতরে ভাঁজ
মাড় দেওয়া শাড়ির বিস্তারিত প্লিট, গুছোনো আঁচল
যেন দখিন দুয়ার সাঁটা। সাদামাটা ভাষায় আমি
অনুবাদ করি তাকে, ঢেউ মন্থর হয় ক্রমশ,
ক্রমশ প্রকাশ পায় এক নির্বাক শ্রুতিনাটক,
কামোফ্লাজ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে
সভ্যতার খাঁ খাঁ প্রান্তর, তার যন্ত্রণার সমতল।

এবার আমরা আসি শিফের Woman of Property বইয়ের Gate কবিতাটিতে।

I’ll never get out of here.
The gate was pure folly, without
fencing on either side,

Greek tragedy
staged around a doorway
the imagination strains to enter.

Once you see them nose
out of the interior at your bidding
what stops you from sounding

every single day? All day? The shrill
imagined rabbit’s
canned terror. You can do it
with a reed of grass. Cup your hands.
Everything alive
is listening.

পাঠক এখানে দেখতে পাবেন চলিত বা কথ্য শব্দের ব্যবহার – Low Baroque diction – আর তার সঙ্গে দীর্ঘায়িত, ছত্রের পর ছত্র নিয়ে গড়ে ওঠা চরণ। খণ্ডাংশ ও আদেশধর্মী ক্রিয়াপদের মাধ্যমে এ কবিতার বিস্তার যা আপনাকে মনে করিয়ে দেবে আদি বারোক যুগের কবি Richard Crashaw-এর “The flaming heart” এর কথা। শিফের ব্যারোক শৈলীকে বলা যেতে পারে স্থাপত্যধর্মী — তিনি জাদুঘরের ক্যাপশন বা ফ্যাশন হাউসের প্রোগ্রাম নোটের মধ্যে মহাকাব্যিক আহ্বান শোনেন এবং বিস্তৃত কাব্যিক অলঙ্কার ব্যবহার করে কবিতায় যেন একটা প্রদর্শনী গড়ে তোলেন।

এস্টেস এবং শিফের সিনট্যাক্স

এস্টেস এবং শিফের সিনট্যাক্স নিয়ে স্টেফানি বার্ট এই ‘প্রায়-বারোক’ রচনাশৈলীর পাশাপাশি মডার্নিস্ট যুগের বিশিষ্ট কবি Marianne Moore (মারিয়ান মুর) কে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একটা উদাহরণ দিলে পাঠকের বুঝতে সুবিধে হবে।

যেমন ধরুন অ্যাঞ্জি এস্টেস লিখছেন –

It’s the opposite of
Baroque, so I want
none of it

আর তার মধ্যে যেন আমরা মারিয়ান মুরের Poetry কবিতার (১৯৬৭ ভার্সন)) প্রতিধ্বনি শুনতে পাই –

I, too, dislike it.
Reading it, however, with a perfect contempt for it, one discovers in
it, after all, a place for the genuine.

মুর ইংরেজিতে এমন এক শৈলীর উদ্ভাবন করেছেন যা কাঠামোগতভাবে অত্যন্ত অলঙ্কৃত ও সমৃদ্ধ। কিন্তু তাঁর কবিতার বাক্যগঠন বা সিনট্যাক্স এগিয়ে চলে নানান শর্ত এবং সংশোধনের মধ্য দিয়ে – এর চলন একেবারেই linear নয়। তার সঙ্গে মুর একেবারেই প্রদর্শন-ইচ্ছুক নন, বরং সতর্কতার সাথে নিজেকে গুটিয়ে রাখার বা দ্বিধা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেই কবিতাকে দেখেন। তাঁর সিলেবল-ভিত্তিক স্তবক-বিন্যাস কবিতার ওপর যেন এক গাণিতিক, কঠোর সংযমের শাসন চাপিয়ে দেয়।

একদিকে আদি বারোক শৈলীর বাহুল্য বা আধিক্য আর অন্যদিকে তার সঙ্গে মারিয়ান মুরের আঁটোসাঁটো ও সুনির্দিষ্ট সিনট্যাক্সের প্রভাব, এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব নিয়েই গড়ে উঠেছে এস্টেস এবং শিফের ‘প্রায়-বারোক’বা নয়া-বারোক সিনট্যাক্স।

এস্টেস এবং শিফের সিনট্যাক্সের আরো একটা বৈশিষ্ট্যের কথা বলা দরকার। এস্টেস এবং শিফের কবিতায় আমরা ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় emblem (এমব্লেম, প্রতীকী চিত্র ও বাণীযুক্ত রচনা) রচয়িতাদের স্টাইলের প্রতিধ্বনি দেখতে পাই। এমব্লেম গ্রন্থে প্রতীকী ছবি, সংক্ষিপ্ত নীতিবাক্য এবং ব্যাখ্যামূলক কবিতা বা গদ্যের সমন্বয়ে নৈতিক, ধর্মীয় কিংবা রাজনৈতিক শিক্ষা তুলে ধরা হতো। রেনেসাঁ ও বারোক যুগে ইউরোপ জুড়ে এই ধারার ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। একটি এমব্লেমের গঠনবিন্যাস—নীতিবাক্য বা ‘মটো’ (inscriptio) হতো একটি সংক্ষিপ্ত বাক্যাংশ (প্রায়শই ল্যাটিন ভাষায়), যা মূল বিষয়বস্তু বা ভাব প্রকাশ করে। তার সঙ্গে থাকতো ছবি বা ‘পিকচুরা’ (pictura) দিয়ে একটি রূপকধর্মী চিত্র এবং একটি সংক্ষিপ্ত শ্লোক বা ‘এপিগ্রাম’ (subscriptio) যা নীতিবাক্য ও ছবির মধ্যকার নৈতিক যোগসূত্রটি ব্যাখ্যা করে।

এমব্লেমের এই ছাঁচকে এস্টেস বা শিফ অবশ্যই আক্ষরিকভাবে অনুসরণ করেননি। তার পরিবর্তে এস্টেসের কবিতায় ‘মটো’ বা inscription আসে হয় ঐতিহাসিক কোনো অনুষঙ্গ হিসেবে বা অন্য ভাষার কিছু শব্দ বা লাইন দিয়ে গড়া শ্লেষের মাধ্যমে। অন্যদিকে শিফের কবিতায় inscription হয়ে দাঁড়ায় কোনো ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের নাম বা কোনো ফলকের লেখনী। এস্টেসের কবিতায় pictura হলো ধ্রুপদী শিল্পকলা, মোজাইক, স্থাপত্য থেকে নেওয়া দৃশ্যমান ভিত্তি, আর শিফের কবিতায় pictura হলো বিভিন্ন প্রদর্শনীর যন্ত্র, অস্ত্র বা এমনকি পোকামাকড়েরও পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা। এস্টেসের কবিতায় subscription গড়ে ওঠে জীবনের নশ্বরতা এবং সৌন্দর্যের ঝরে যাওয়া স্মৃতি নিয়ে জাদুকরী রসায়ন বা অ্যালকেমি বানানোতে। অন্যদিকে শিফের কবিতায় subscription মানুষের হিংস্রতা, দখলদারি, এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যেকার অন্তর্নিহিত দিকগুলোকে উন্মোচন করে দেয়। দুজনের লেখাতেই এই এমব্লেম-ঘেঁষা স্টাইল মূল পাঠ্যটিকে এক অদ্ভুত নতুনভাবে উপস্থাপন করে এবং জটিল বাক্যগঠন এবং শব্দচাতুর্য পেরিয়ে পাঠককে মূল চিত্রলিপির পাঠোদ্ধার করতে হয়। এ যেন সেই ফিরে আসা ‘বোদলেয়ারীয় অনুষঙ্গ’ (Baudelairean correspondences) অর্থাৎ এমন সব গুপ্ত ঐশ্বরিক সংকেত যা পাঠোদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছে।

কার্ল ফিলিপস (Carl Philips)

জন মিল্টন (John Milton) যেমন নিজেই একটি বিশিষ্ট যুগ, আমেরিকান কবিতায় কার্ল ফিলিপসও প্রায় তাই। । মিল্টনের সাহিত্যকর্মকে প্রায়শই রেনেসাঁ ও বারোক— এই উভয় ধারার সংযোগস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যদিও তাঁর রচনার ভিত্তি ছিল মূলত ধ্রুপদী বা ক্লাসিক্যাল, তবুও মিল্টন বারোক শৈলীর জাঁকালো ও মহিমান্বিত নান্দনিকতাকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন। সেই একই কথা বলা যায় কার্ল ফিলিপসের কবিতা নিয়েও।

কার্ল ফিলিপসের প্রথম কবিতার বই প্রকাশ পায় ১৯৯২ সালে – In the Blood, আর সে বছরই এই বইটি Samuel French Morse পুরস্কার পায়। বহু, বহু সমালোচক প্রায় তিরিশ বছর ধরে মুখর ভাবে গুণগান করছেন কার্ল ফিলিপসের কবিতা নিয়ে। ২০২৩ সালে তিনি কবিতায় পুলিৎজার প্রাইজ পান তাঁর “Then the War” বইটির জন্যে। পুলিৎজার প্রাইজের জন্য দরখাস্ত করা যায় না, পুলিৎজার কমিটি নিজেরাই বই বেছে নেন। তার আগে তিনি চার বার আমেরিকার জাতীয় পুরস্কারের জন্য ফাইনালিস্ট হয়েছেন – ১৯৯৮, ২০০৪, ২০০৯ এবং ২০১১ সালে। সমসাময়িক ইংরেজি ভাষার কবিদের মধ্যে কার্ল ফিলিপসের স্থান একেবারে ওপরতলায় – তাঁর মত মৌলিক চিন্তাশীল, প্রভাবশালী, এবং সৃজনশীল কবি ইংরেজিতে এখন আর নেই বললেই চলে।

কার্ল ফিলিপসের কবিতার পুরো রস আস্বাদন করতে পশ্চিমী সংস্কৃতিতে প্রায় বিশেষজ্ঞ হতে হয় – এ ধরনের কবিতা লেখা সম্ভব হয় বহু বছরের সাধনা থেকে। বহু, বহু সম্মান পেয়েছেন কার্ল ফিলিপস, সমালোচকদের বহু, বহু সাদর পর্যালোচনায় ভরা তাঁর ঝুলি। তার মধ্যে New Yorker এর Dan Chiasson এর একটা মন্তব্য আমার মনে গেঁথে আছে –

I have a candidate for the author of the most interesting contemporary English sentences, and he is not primarily a prose writer: the American poet Carl Phillips.

কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি

Ghost Choir

What injures the hive injures the bee, says Marcus Aurelius. I say
not wanting to hurt another, this late, should maybe more than
count, still, as a form of love. Be wild. Bewilder. Not that they
hadn’t, of course, known unkindnesses, and been themselves
unkind. ….

এ কবিতার পূর্ণ রস গ্রহণ করতে আপনাকে Marcus Aurelius এবং তাঁর ক্লাসিক বই “Meditations” সম্বন্ধে জানতে হবে। Meditations একটা অংশ আমার ভীষণ প্রিয় – লেখা AD 171-175 নাগাদ অথচ আজ সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও কেমন প্রযোজ্য দেখুন, বইটির ২য় অধ্যায়ের এই লেখাটি

Say to yourself in the early morning:

I shall meet today inquisitive, ungrateful, violent, treacherous, envious, uncharitable men. All these things have come upon them through ignorance of real good and ill. But I, because I have seen that the nature of good is the right, and of ill the wrong, and that the nature of the man himself who does wrong is akin to my own (not of the same blood and seed, but partaking with me in mind, that is in a portion of divinity), I can neither be harmed by any of them, for no man will involve me in wrong, nor can I be angry with my kinsman or hate him; for we have come into the world to work together, like feet, like hands, like eyelids, like the rows of upper and lower teeth. To work against one another therefore is to oppose Nature, and to be vexed with another or to turn away from him is to tend to antagonism.

Roman Glass

Even in the latter, raveling days of the republic, the Romans clung
Archaically, naively
To a belief in equal rule : …
The boat-littered bay of Naples, suggest something, still, of a grand
History that is
Finally holy, there being always a holiness attached to that which is
Absolute – even
Should the subject prove, the entire time, to have been loss.

এখানে আপনাকে জানতে হবে রোমান কনসাল নির্বাচনের কথা, জুলিয়াস সিজারের কথা।

জুলিয়াস সিজার আবার আসেন নীচের এই কবিতাটায়, নাম Rubicon । মনে রাখতে হবে যে রুবিকন হচ্ছে সেই নদী যা পেরোনো নিষেধ ছিল জুলিয়াস সিজারের এবং সৈন্য নিয়ে সে নদী পেরোনোর জন্যেই ইতালিতে তারপর গৃহযুদ্ধ বাঁধে।

Rubicon

….                                                        That moment in intimacy
when sorrow, fear, and anger cross in unison the same face,
what at first can seem almost
a form of pleasure, a mistake as
easy, presumably, as it’s forgivable. I suspect forgetting will be
a very different thing: more rough, less blue, more lit, and patternless.

কার্ল ফিলিপস এমন সব বাক্য রচনা করেন যার গঠনশৈলী সপ্তদশ শতাব্দীর রীতির সাথে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ—যদিও স্টেফানি বার্টের প্রবন্ধে তাঁর নাম একবারও উল্লেখ করা হয়নি। উদাহরণ হিসেবে দেখুন ২০০০ সালে প্রকাশিত Pastoral বইয়ের A Kind of Meadow কবিতাটি। এ কবিতা শুরু হয় প্রায় তেরো লাইনের একটি দীর্ঘ বাক্য দিয়ে:

—shored
by trees at its far ending,
as is the way in moral tales:

whether trees as trees actually,
for their shadow and what
inside of it

hides, threatens, calls to;
or as ever-wavering conscience,
cloaked now, and called Chorus;

or, between these, whatever
falls upon the rippling and measurable,
but none to measure it, thin

fabric of this stands for.
A kind of meadow, and then
trees—many, assembled, a wood

therefore.

দ্বিধাজড়ানো এই লাইন বিন্যাস, যা কোলন (বা ড্যাশ) ও সেমিকোলনের মাধ্যমে মূল ক্রিয়াপদকে বারবার বিলম্বিত করে, তা যেন সঙ্গে সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় মূল বারোক সিনট্যাক্স – জন ডানের নয় লাইন ধরে যুক্তি সাজানো বা মিল্টনের একটি পুরো স্তবকের সমান দীর্ঘ বাক্য রচনা। ফিলিপসের এই থেমে থেমে চলা বাক্যাংশগুলো গিয়ে মেশে এক অস্পষ্টতায়—কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর এই প্রবণতা ডানের আত্মবিশ্বাসী সমাপ্তির চেয়ে বরং মারিয়ান মুরের সতর্ক ও শর্তযুক্ত বক্তব্যের অনুষঙ্গী।

Pastoral বইয়ের আর একটি কবিতা Hymn। এ কবিতা শুরু হয় এইভাবে –

Less the shadow
than you a stag, sudden, through it.
Less the stag breaking cover than

the antlers, with which
crowned.
Less the antlers as trees leafless,

to either side of the stag’s head, than—
between them—the vision that must
mean, surely, rescue.

Less the rescue.

পাঠক লক্ষ্য করবেন বারোক-শৈলীসুলভ অ্যানাফোরা (anaphora) ও আইসোকোলন (isocolon)-এর ব্যবহার, যার মাধ্যমে রিচার্ড ক্র্যাশ(-অ) (Richard Crashaw) তাঁর আবাহনমূলক পঙক্তিগুলো সাজাতেন। ফিলিপসের স্বর্গীয় আলঙ্কারিক শক্তি কিন্তু ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে নিবেদিত কোনো চূড়ান্ত আবেগে পৌঁছয় না, বরং সন্দেহের দোলায় দুলতে থাকে সে, পুরো ভারসাম্য না হারিয়ে ফেললেও।

এই ধরনের সংশয় ভরা non-linear সিনট্যাক্স বাঙলা কবিতায় প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। পাঠক পড়ে দেখতে পারেন আমার নিজের একটি কবিতার অংশ

“কোথায় যেন বলা হয়েছিল, বলা হয়েছিল কি, না এও একটা সহজাত ভাব আমাদের, সরল মনের গুমরে ওঠা কাকলি, বলা হয়েছিল শান দেওয়া নিরালার কথা … কিছুই কি পড়ে থাকে নিটোল কোথাও, আর যদি নিটোল না-ই চাই, যদি শুধুশুধু, এমনি এমনি আমরা মুখের ভাষাতে সুরের ভাষা গড়তে থাকি, মানুষের ব্যাকরণে বাঁধি তাকে, তাহলেও জেনেছি ফিরিয়ে দেওয়ার পরব ছিল সেদিন, বিদায় নেওয়ার মরশুম এই চেনা চেনা শেষবেলাকার রোদে, লুকোনো এবং প্রসারণশীল, আমি হাত বাড়াই আর একবার সন্ধের গলুই থেকে”।

এই কবিতাংশটি নেওয়া হয়েছে আমার “ফিরিয়ে দেওয়ার পরব ছিল সেদিন” কবিতা থেকে যেটা ২০২৬ সালের শেষের দিকে শব্দ কলকাতা থেকে প্রকাশিতব্য “সময় তুমি লাভারবয়, লাভারবয়” কবিতার বইয়ে গ্রন্থিত হবে।

উপসংহার

কবিতার সিনট্যাক্সে বা শব্দচয়নে অলঙ্করণ বা কারুকাজ তখনই একটি ‘যুক্তি’ বা ‘বক্তব্য’ হয়ে ওঠে, যখন প্রভাবশালী কোনো সংস্কৃতি এদের নির্মাতাদের বলে দেয়, তোমাদের প্রকাশভঙ্গী অতিরিক্ত শব্দে ভরা, বা অবাস্তব বিষয় নিয়ে গড়া, বা আজকের জীবনযাত্রায় একেবারে অপ্রাসঙ্গিক। স্টেফানি বার্ট আমেরিকান কবিতার ক্ষেত্রে যে ‘প্রায়-বারোক’ (nearly Baroque) ধারার কথা উল্লেখ করেছেন, তা মূলত একটি স্থানীয় ও সাম্প্রতিক প্রবণতা; এটি বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ও শেষভাগের প্রচলিত কাব্যরীতির বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া। আমেরিকান কবিতায় বারোক নন্দনতত্ত্বের পুনরুত্থান এসেছে দু’টি মূল কারণে – ১) আর্থ-সামাজিক কারণ – কবিতার যেহেতু কোনো ব্যাপক পাঠকগোষ্ঠী নেই এবং মুদ্রণ-বাজারে এর কোনো উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নেই, কবিরা এই ভোগবাদী ভাষ্যকে প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছেন এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের অনুসন্ধান শুরু করেছেন। ২) নারীবাদী অধিকার-পুনরুদ্ধার – প্রায়-বারোক শৈলীটি অনেকাংশেই হয়ে দাঁড়িয়েছে নারীদের নান্দনিকতা বা ‘ফেম এস্থেটিক’ (femme aesthetic)। এই দু’ ক্ষেত্রেই কঠোর বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি অর্থাৎ অর্থনৈতিক ব্যবহারিকতা এবং রাজনৈতিক উপযোগিতাকে বর্জন করা হয়েছে এবং অতি-অলঙ্করণ ও কাঠামোগতভাবে জটিল ভাষার মাধ্যমে নান্দনিকতা এবং সৌন্দর্যের ধারণাগুলিকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই প্রবন্ধের ৩য় পর্বে আমরা আলোচনা করব লাতিন আমেরিকার কবিতায় বারোক স্টাইলের প্রত্যাবর্তন – ‘নিওবারোকো’ বা নব্যবারোক। আমরা দেখব যে উত্তর আমেরিকা এবং লাতিন আমেরিকা এই দুই অঞ্চলের ‘বারোক পুনরুত্থান’ কিন্তু একই সময়কাল বা গতির সাথে তাল মিলিয়ে ঘটেনি।

অমিত চক্রবর্তীর জন্ম সোনারপুর অঞ্চলের কোদালিয়া গ্রামে। ছাত্রাবস্থায় অনেক লেখা এবং ছাপানো কলকাতার নানান পত্রপত্রিকায়। পড়াশোনার সূত্রে আমেরিকা আসা ১৯৮২ সালে। এখন ক্যানসাস স্টেট ইউনিভারসিটি তে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ও প্রাক্তন কলেজ অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সের ডিন (২০১৬-২০২২) । প্রকাশিত কবিতার বই ছয়টি – "অতসীর সংসারে এক সন্ধ্যাবেলা" (২০২১), "জলকে ছুঁয়ো না এখানে" (২০২২), "ভালো আছি স্তোত্র" (২০২৩), “ভুলটা ছিল উপপাদ্যে, প্রমাণেতে নয়” (ই-বুক ২০২৩), “প্যাপিরাসের লুকোনো আর্ট” (২০২৪), এবং “মিড় ভেজানো অক্ষরের তান” (২০২৫)। তার সঙ্গে ক্রিয়েটিভ রাইটিংএর বই “সৃজনী লেখার ক্লাসঃ কবিতা লেখা” (২০২৪), এবং কবিতা ও অন্যান্য সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে গদ্যের বই “কবি, তুমি গদ্যের সভায় যেতে চাও?” (২০২৫)। দু'টি পত্রিকার সম্পাদক - উত্তর আমেরিকার নিউ জার্সি অঞ্চলের পত্রিকা "অভিব্যক্তি" (সহ-সম্পাদক) এবং "উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা" অনলাইন কবিতা পত্রিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *