ভিয়েতনাম যুদ্ধ-ফেরত অজি পেসারের কথা এবং PTSD-র সামাজিক মূল্য

ভিয়েতনাম যুদ্ধ-ফেরত অজি পেসারের কথা এবং PTSD-র সামাজিক মূল্য

বইয়ের প্রচ্ছদ, ২০২১ সালে প্রথম প্রকাশিত

সম্প্রতি পড়লাম “And Bring the Darkness Home” নামক একটা বই, লেখক Greg Milam।

অনেক বইই তো পড়ি, কিন্তু এর কাহিনিটা মনে একটা বড় ছাপ রেখে দিয়েছে। কেন? জানতে হ’লে ষাট-সত্তর দশকে ফিরে যেতে হবে।

টনি ডেল হলেন একমাত্র জীবিত অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার যিনি টেস্ট ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রেও (অ্যাক্টিভ কমব্যাট) দায়িত্ব পালন করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার ২৫৫তম টেস্ট-ক্রিকেটার হিসেবে নির্বাচিত ডেল – যিনি একজন দীর্ঘদেহী বাঁ-হাতি ফাস্ট-বোলার ছিলেন — খ্যাতনামা অজি-অধিনায়ক ইয়ান চ্যাপেল-এর অধিনায়কত্বে দু’টো মাত্র টেস্ট-ম্যাচ খেলেছিলেন।

টনি ডেল, ১৯৭০ সালে নেট প্র্যাকটিসে

জন্ম ও ক্রিকেট-কর্ম

তাঁর জন্মের দিনটা (৬ই অগাস্ট, ১৯৪৫) মানব-সভ্যতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ? সেদিনই জাপানের হিরোশিমা শহরে পারমাণবিক বোমা হামলার ঘটনাটা ঘটেছিল। তাঁর নামের দ্বিতীয় অংশ হিসেবে ‘হিরোশিমা’ (Hiroshima) নামটা রাখা হয়েছিল, যদিও তাঁর জন্ম-সনদে কেবলমাত্র ‘H’ অক্ষরটাই লিপিবদ্ধ ছিল। সেই ঘটনার স্মারক হিসেবেই তাঁর বাবা-মা এই নামটা রেখেছিলেন। স্কুলে পড়ার সময় ডেল আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম থেকে সেই ‘H’ অক্ষরটা বাদ দিয়ে দেন। পরিবারের সঙ্গে, বাবার নতুন চাকরির সূত্রে, অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর সময় তাঁর বয়স ছিল ১৫ বছর।

ইংল্যান্ডের হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির লাইমিংটন-এ জন্মগ্রহণ করা বাঁ-হাতি পেসার ডেল অস্ট্রেলিয়ার হয়ে দু’টো টেস্ট ম্যাচ খেলেছিলেন। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিডনিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের শেষ টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টনি ডেলের অভিষেক নানা কারণেই ছিল উল্লেখযোগ্য।

১৯৭০-৭১ মরশুমে সিডনিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সপ্তম-তথা-শেষ টেস্টে তাঁর অভিষেক হয়; সেখানে ডেনিস লিলি-র সঙ্গে বোলিংয়ের সূচনা করে তিনি ম্যাচে মোট পাঁচটা উইকেট নিয়েছিলেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই অবসর নেওয়ার আগে ডেল ২৬.৬৬ গড়ে ছ’টা টেস্ট-উইকেট এবং ২৬.৭০ গড়ে ৪১টা প্রথম-শ্রেণীর উইকেট (ইনিংস-সেরা বোলিং ৬/১৭) দখল করেছিলেন।

১৯৭১: সিডনিতে অভিষেক টেস্ট-ম্যাচে রে ইলিংওয়ার্থের মুখোমুখি

জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার আগে তিনি মাত্র কয়েকটা প্রথম-শ্রেণীর ম্যাচ খেলেছিলেন এবং খুব কমসংখ্যক উইকেটই দখল করেছিলেন। এছাড়া, জন্ম ও বেড়ে ওঠা ইংল্যান্ডে হওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি তখনও একজন ‘Pommie’ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। অ্যাশেজ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত টেস্ট ছিল এই সিডনি-টেস্ট; বিপক্ষকে ভয় পাওয়ানো বোলিং (intimidatory bowling) নিয়ে আম্পায়ারদের সঙ্গে মতবিরোধ এবং মাঠের দর্শকদের একাংশের তুমুল বিক্ষোভের জেরে ইংরেজ অধিনায়ক রে ইলিংওয়ার্থ কিছুক্ষণের জন্য তাঁর খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে তুলে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।

কিন্তু সেই অভিষেক-ম্যাচ নিয়ে টনি ডেল আজ খুব একটা কিছু আর বলতে পারেন না। তাঁর স্মৃতিশক্তি এমন সব অভিজ্ঞতার ভারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা ক্রিকেট মাঠের বাইরেও তাঁর জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছিল – এমন এক জীবন যা খেলাধুলো, যুদ্ধ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলোকে ছুঁয়ে আছে।

বাধ্যতামূলক যুদ্ধযাত্রা

ডেল-ই একমাত্র টেস্ট-ক্রিকেটার যিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। কোনও বড় যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি লড়াইয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকা জীবিত টেস্ট-ক্রিকেটারদের মধ্যেও তিনিই একমাত্র ব্যক্তি।

১৯৬৫ সালে, অর্থাৎ টেস্ট-ক্রিকেট ও কুইন্সল্যান্ডের হয়ে শেফিল্ড-শিল্ডে তাঁর ক্রিকেট-জীবন শুরুর অনেক আগেই, অস্ট্রেলিয়ার ‘ন্যাশনাল সার্ভিস লটারি’-তে নাম ওঠার পর তরুণ টনি ডেল-কে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক কাজের (ন্যাশনাল মিলিটারি সার্ভিস) জন্য তলব করা হয়। এরপর তিনি ১৯৬৭-৬৮ সালে ভিয়েতনামে ২আরএআর (2RAR, দ্বিতীয় ব্যাটালিয়ন, রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান রেজিমেন্ট)-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সৈনিক জীবন, ভিয়েতনামে

১৯৬৭-৬৮ সালে ভিয়েতনামে দায়িত্ব পালন শেষে দেশে ফিরে আসেন। তিনি ভেবেছিলেন যেখানে কাজ থামিয়েছিলেন সেখান থেকেই আবার শুরু করবেন – অর্থাৎ বিজ্ঞাপনের জগতে নিজের চাকরি এবং ব্রিসবেনের ‘ইস্টার্ন সাবার্বস’ দলের হয়ে ক্রিকেট-জীবন আবার চালিয়ে যাবেন।

সেইমতন আবার তাঁর ক্রিকেট-জীবনের সেই জায়গা থেকেই শুরু করেন, যেখানে তিনি বিরতি নিয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতিময় বাঁ-হাতি স্যুইং বোলার হিসেবে তিনি আবার খেলা শুরু করেন। তরুণদের নিয়ে গড়া অজি-দলে তাঁর টেস্ট অভিষেকটা ছিল এমন এক মুহূর্ত যখন তিনি নিজেকে সফল ও প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করেছিলেন।

মাত্র কয়েকটা প্রথম-শ্রেণীর ম্যাচ খেলার পরই, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিজের জন্মভূমির বিপক্ষে অ্যাশেজ সিরিজের একটা টেস্ট-ম্যাচের জন্য তিনি নির্বাচিত হন। ডেল বলেছিলেন,  “আমার মনে হয়েছিল আমি যেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে গেছি।” কিন্তু নতুন কিছুর শুরুর পরিবর্তে, এটা আসলে তাঁর জীবনে যেন সমাপ্তির সূচনা হয়ে দাঁড়ায়।

তাঁর ক্রিকেট ও ব্যক্তিগত জীবন বিপর্যস্ত হতে শুরু করে – এ ছিল তাঁর নিজের এবং বিশেষ করে তাঁর পরিবারের জন্য এক অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক সময়। পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁর ক্রিকেট-জীবন, ব্যবসা এবং পারিবারিক-জীবন – সবই ভেঙে পড়ে। শেষ পর্যন্ত স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাঁকে তাঁর মায়ের বাড়ির গ্যারেজে বসবাস করতে হয়।

যুদ্ধক্ষেত্রের যাতনার কাহিনি

ডেল জানান, অনেক প্রাক্তন সেনাসদস্যের মতোই তিনিও যুদ্ধের ময়দানে কাটানো সময় নিয়ে কথা বলা এড়িয়ে চলতেন। এমনকি তাঁর সহ-খেলোয়াড়, অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তি গ্রেগ চ্যাপেল-এরও জানা ছিল না যে ডেল কখনও ভিয়েতনামে ছিলেন। তিনি ডেল-এর রাজ্যদলের, কুইন্সল্যান্ডের, প্রাক্তন অধিনায়ক ছিলেন, বেশ কয়েক বছর একসঙ্গে খেলেছেন, অথচ জানতেনই না যে ডেল ভিয়েতনাম-যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। চ্যাপেলের বিশ্বাস, সত্তরের দশকের সেই দুর্দান্ত অস্ট্রেলীয় দলে নিয়মিত খেলবার সুযোগ পেলে ডেল হয়তো এক উজ্জ্বল ক্রিকেট-জীবনের অধিকারী হতে পারতেন।

১৯৭৪: কুইন্সল্যান্ড রাজ্য দলের সদস্য, পাশে বসে অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল

ভিয়েতনাম থেকে ফেরবার ৪০ বছর পর, ষাটোর্ধ্ব বয়সে এসে, স্ত্রী ও সন্তানদের থেকে বিচ্ছিন্ন এবং নিজের মায়ের গ্যারেজে বসবাসরত অবস্থায় টনি ডেল উপলব্ধি করেন যে তাঁর জীবন একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। যে মানুষটা দেশের হয়ে টেস্ট-ক্রিকেট খেলেছেন এবং সফল বিজ্ঞাপন ব্যবসার সঙ্গে একদা জড়িত ছিলেন তাঁর কাছে এ ছিল এক বিস্ময়কর ও নাটকীয় পতন।

আকস্মিক এক সাক্ষাৎকার ডেল-কে এক নতুন উপলব্ধির পথে নিয়ে যায় এবং নিজের ও অন্যদের সহায়তার এক অসাধারণ যাত্রার সূচনা ঘটায়। কেমনভাবে? সে কথা জানা দরকার, এই কাহিনীর প্রেক্ষিতে। অনেকের মতনই, ডেল নিজেও অবাক হয়েছিলেন যখন জানতে পারলেন যে তিনি ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ (Post Traumatic Stress Disorder, PTSD) নামক মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।

২০০৭ সালের এক ঘটনার মাধ্যমে বিষয়টা প্রথম সামনে আসে; সে সময় বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের জন্য আয়োজিত এক ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অতিথি হিসেবে ডেল-কে আমন্ত্রণ জানানো হয়। অবসরপ্রাপ্ত ডিফেন্স ফোর্স চিফ অ্যাঙ্গাস হিউস্টন-এর সঙ্গে সেখানে তাঁর প্রথম দেখা।

আর সেখানেই এক অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ডেল-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তাঁর কাছে পুরনো সব যুদ্ধপদকগুলো এখনও আছে কি না। ডেল-এর কাছে সেগুলো ছিল না। তাই সেই কর্নেল তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যেন তিনি পদকগুলো নতুন ক’রে সংগ্রহ করেন।

কয়েক মাস পরে নতুন পদকগুলো পাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে যখন দপ্তর থেকে তাঁকে ফোন করা হ’ল, তখন ডেল রাজি হয়ে গেলেন। তিনি মারুচিডোর-এর স্থানীয় ‘ভিয়েতনাম ভেটেরেনস ড্রপ-ইন সেন্টার’-এ গেলেন। সেখানে কফি-পান ও আলাপচারিতার সময়ে এক চমকপ্রদ বিষয় উঠে এল।

ডেল বলেন,”তারা বলল, ‘আপনার PTSD আছে।’ আমি বললাম, ‘বাজে কথা।’ তারা বলল, ‘না, নিশ্চিতভাবেই আছে।‘”

অবশেষে চিকিৎসকরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর PTSD শনাক্ত করলেন এবং তিনি পেনশন পেতে শুরু করলেন; তাঁকে এ-ও জানানো হলো যে, তাঁর মতন আরও হাজার হাজার ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রাক্তন সৈনিক রয়েছেন যাঁরা এই PTSD মানসিক সমস্যায়  ভুগছেন।

যাতনা-লাঘবের যাত্রা শুরু

২০০৯ সালে, ডেল সেই একই আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ক্রিকেট ইভেন্টে নৈশভোজ-পরবর্তী বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হলেন –

“আমি ক্রিকেট, ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং PTSD-জনিত অভিজ্ঞতার কথা বললাম। বক্তব্য শেষ করার পর সবাই দাঁড়িয়ে  উঠে আমাকে সম্মান জানালেন, যা আমাকে অবাক করেছিল। মনে হয় যেন  মিনিট-পাঁচেক ধরে সেই করতালি চলেছিল। অ্যাঙ্গাস (হিউস্টন) আমাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং সেনাবাহিনীর প্রধান আমাকে অভিনন্দন জানালেন; কারণ এই প্রথম কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার করল যে তার PTSD আছে এবং এটি তার জীবনে কী প্রভাব ফেলেছে।“

নভেম্বর, ২০১৪: ক্যানবেরায় এক ম্যাচের আগে (বাঁ দিক থেকে) অজি-প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবট, গ্রুপ-ক্যাপ্টেন কেট ম্যাকগ্রেগর, ডেল ও মাইক হাসি

তাঁর মতোই যারা ভুক্তভোগী, তাদের জন্য কিছু করবার দৃঢ় সংকল্প ডেল-কে এক নতুন যাত্রাপথে নিয়ে যায়। এভাবেই “Stand Tall For PTS” উদ্যোগটার বীজ রোপিত হয়েছিল। সেই বীজ এখন একটা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে পরিণত হয়েছে (https://standtall4pts.org/) – এর লক্ষ্য হ’ল এমন কিছু কার্যকর কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা যা সত্যিই ফলপ্রসূ। এই অলাভজনক সংস্থা এখন প্রাক্তন সেনাসদস্য, জরুরি সেবাকর্মী এবং অন্যান্য ভুক্তভোগীদের জন্য সচেতনতা ও সহায়তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ডেল ও হিউস্টন অস্ট্রেলিয়াতে জাতীয়-স্তরে নিয়মিত পিটিএসডি ফোরাম আয়োজন করেন। ডেল-এর আশা যে আন্তর্জাতিক অতিথিদের অংশগ্রহণে এই ধরণের অনুষ্ঠান PTSD-বিষয়ক বিশিষ্টজনদের মিলনমেলায় পরিণত হতে থাকবে।

ভিয়েতনাম থেকে ফিরে আসার ৪০ বছর পর, ষাটোর্ধ্ব বয়সে ঘটে-যাওয়া সেই আকস্মিক সাক্ষাৎকারই শেষ পর্যন্ত তাঁর PTSD মানসিক বিকার শনাক্ত করতে সহায়তা করে। হঠাৎ করেই তাঁর সমস্ত যন্ত্রণা, ভোগান্তি, উদ্বেগ এবং জীবনের ‘অসঙ্গতিগুলোর কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন যে, যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মোকাবিলা তিনি কখনওই করেননি; বরং অতীতের ও বর্তমানের আরও অনেকের মতোই তিনি সেই ভয়াবহ পরিণতির ভার নীরবে বয়ে বেড়িয়েছেন।

ডেল আশা করেন, একদিন কোনও একটা টেস্ট-ম্যাচকে মানসিক স্বাস্থ্য ও PTSD-বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির আয়োজনে উৎসর্গ করা হবে। এক্ষেত্রে তিনি গ্রেগ চ্যাপেল ও মাইক হাসি এঁদের মতন ক্রিকেট-তারকাদের জোরালো সমর্থন পাচ্ছেন, সঙ্গে রয়েছেন অস্ট্রেলীয় বিমানবাহিনীর প্রধান হিউস্টন, অস্ট্রেলিয়ার গভর্নর-জেনারেল ডেভিড হার্লে, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া রাজ্যের রাজ্যপাল কিম বিয়েজলি এবং কিছু নামী মনোবিদ ও সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কর্তা।

অন্যরকম পরিসংখ্যান

ক্রিকেট খেলাটাা নানা পরিসংখ্যানে ঠাসা, যার বেশিরভাগই জীবনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে খুব একটা অর্থবহ নয়। ডেল-এর কাছে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান রয়েছে, যার মানবিক গুরুত্ব অনেক বেশি। কেমন সেই পরিসংখ্যান? একঝলক দেখা যাক।

অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি বছরের প্রতিটি দিন গড়ে একজন করে প্রাক্তন সৈনিক আত্মহত্যা করেন, আর আমেরিকায় এই ঘটনা ঘটে বছরের প্রতিটা দিনের প্রতি ঘণ্টায়। গত দশ বছরে যুদ্ধক্ষেত্রে যত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি মানুষ আত্মহত্যায় প্রাণ হারিয়েছেন।

ডেল-এর মতে:

“এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই, তবে ধারণা করা হয় যে প্রায় ১৫ লাখ অস্ট্রেলীয় কোনও না কোনও মাত্রায় এতে আক্রান্ত। আর এটা কখনওই পুরোপুরি সারেনা। স্মৃতি যদি মুছে ফেলা বা ঠিক করা যেত, তবে হয়ত এটা চলে যেত। কিন্তু এ নিয়েই বাঁচতে শিখতে হয়। অপরাধ, দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার ব্যক্তিরাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন; অথচ সরকারিভাবে এটাই সবচেয়ে কম আলোচিত এবং এর পেছনে সবচেয়ে কম সরকারি অর্থ বরাদ্দ করা হয়।“

এর জন্য সমাজকে যে মূল্য দিতে হচ্ছে, তা এমন সব পরিসংখ্যানের মাধ্যমে ফুটে ওঠে: যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন ২২ জন প্রাক্তন সেনাসদস্য আত্মহত্যা করেন। এইসব মানুষকে সাহায্য করবার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাই ডেল-কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধক্ষেত্রের সৈনিক, ভিয়েতনামে

সচিন না বিরাট কে ‘মহান চেজমাস্টার’, রুট-এর তেন্ডুলকর-কে ছাপিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা, সূর্যবংশী-র জয়সওয়াল-এর দ্রুততম অর্ধশতক ছুঁতে না পারবার খেদ, এইসব পরিসংখ্যান যে তুলনায় নেহাতই তুচ্ছ – ‘সমাজমাধ্যম-কাঁপানো’ ক্রিকেট-ভক্ত মানুষজন এটা যে কবে বুঝবেন, কে জানে!

ডেল-এর উপলব্ধি

ভিয়েতনাম যুদ্ধের একমাত্র প্রাক্তন সৈনিক হিসেবে টেস্ট-ক্রিকেট খেলার অনন্য নজির গড়া ডেল নিজের অভিজ্ঞতার আলোকেই এসব কথা বলেন। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি যুদ্ধের স্মৃতি ও ভয়াবহতার বিরুদ্ধে নিজের মতন ক’রে লড়াই করেছেন। অসামরিক জীবনে ফিরে আসার পর চার দশক কেটে যাওয়ার পরই তাঁর PTSD সমস্যা ধরা পড়ে।

পেছনের দিকে তাকালে অনেক কিছুই এখন তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। যেমন — কেন কোনও ঘরে ঢোকার সময় তিনি সবসময় দেয়ালের দিকে পেছন ফিরে বসতেন; কেন তিনি কাজের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং অল্প বয়সেই ক্রিকেট-জীবন ছেড়ে দিয়েছিলেন; কেনই বা তাঁর সংসার ভেঙে গিয়েছিল এবং সন্তানদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।

নিজের অবস্থাকে তিনি ‘মাঝারি মানের’ বলে বর্ণনা করেন এবং জানেন যে অন্যদের পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। রোগটা শনাক্ত হওয়ার আগে তিনি জানতেনই না যে PTSD-র মতো কোনও সমস্যা আদৌ আছে। তাঁর সহযোদ্ধাদের অনেকেরই মদ্যপানের অভ্যেস বা মাদকাসক্তি – Returned and Services League (RSL), যা প্রাক্তন সেনাসদস্যদের একটা ক্লাব, সেখানে গিয়ে সপ্তাহের প্রায় সব রাতেই তাঁরা মদে ডুবে থাকতেন। “তোমরা দুর্বলচিত্ত সব লোক,” তিনি মনে মনে ভাবতেন।

কিন্তু এখন তিনি বিষয়টা খানিকটা বোঝেন:

“সবকিছুর শুরুটা হয় কোনো এক ভয়াবহ মানসিক আঘাত বা ট্রমা থেকে – আমার ক্ষেত্রে ভিয়েতনামে ঘটে-যাওয়া কয়েকটা ঘটনা ছিল এর কারণ। তখন আপনি জীবনটা কোনওমতে চালু রাখবার চেষ্টা করেন। সেনাবাহিনীতে থাকার সময় অহেতুক সময় নষ্ট করবার সুযোগ থাকে না। তখন মনে হয় – ঠিক আছে, যা হওয়ার  তা হয়েছে; সেটা মেনে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আবার কখনও কখনও তা চরম ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়; আমার ক্ষেত্রে এমন একটা পরিস্থিতি এসেছিল যখন টানা দু’তিন ঘণ্টা আমি ভয়ে কাঁপছিলাম। … আপনি এগিয়ে যান এবং সেই স্মৃতি অবচেতন মনে চাপা দিয়ে রাখেন, যেখানে তা ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে থাকে। একসময় তা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমার মনে হয় না আমার জীবনে সত্তরের দশকের শুরুর আগে খুব বেশি  এমন ঘটনা ঘটেছিল। এর লক্ষণ হ’তে পারে দুঃস্বপ্ন, ফ্ল্যাশ-ব্যাক, ঘুমের মধ্যে ঘাম হওয়া, দাঁত কিড়মিড় করা কিংবা ভিড়ের মধ্যে যেতে ভয়-পাওয়া।  দু’-তিন দশক যাবৎ আমি যখনই কোনও ঘর বা রেস্তোরাঁয় যেতাম, তখন দেয়ালের দিকে পিঠ দিয়ে এমনভাবে বসতাম যাতে বাইরের দৃশ্য বা প্রবেশপথের দিকে নজর রাখা যায়। “

এই সমস্যা থেকে ‘মুক্ত’ হওয়ার জন্য:

“মানুষ তখন কাজের নেশায় মত্ত হয়ে পড়তে পারে। নিজের কথাই বলি – আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে কাজে চলে যেতাম এবং গভীর রাতে বাড়ি ফিরতাম। কারণ অবচেতনভাবেই আমি নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চাইতাম, যাতে একা বসে ভাববার মতন সময় না পাই। অনেকেই এই পরিস্থিতি সামলাতে পারে না এবং মদ্যপান বা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে; শেষ পর্যন্ত অনেকের জন্যই পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। … মানুষ তখন খুব সমাজবিমুখ হয়ে পড়ে। আমার সংসার ভেঙে গিয়েছিল এবং সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। আমার শ্যালিকা আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্য মানুষ মনে করতেন। এখন যখন তিনি আসল ঘটনা জানেন, তখন আমাদের মধ্যে আবার কথাবার্তা শুরু হয়েছে। আসলে মূল বিষয়টা তো এটাই। এ বিষয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে।“

এখন পেছনের দিকে তাকালে ডেল বুঝতে পারেন যে, PTSD তাঁর ক্রিকেট-জীবনেও বড় প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর দ্বিতীয় টেস্ট-ম্যাচ খেলার পরই তিনি জাতীয় নির্বাচক স্যাম লকস্টনকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি আর খেলতে চান না। কুইন্সল্যান্ডের অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল তাঁকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আরও একটা মরশুম (তাঁর পঞ্চম মরশুম) রাজ্য-স্তরের ক্রিকেট খেলিয়েছিলেন, কিন্তু  সেই ছিল শেষ।

ডেল-এর কথায়:

“আমার সহকর্মীরা যখন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে অর্থ উপার্জন করত, তখন আমি ক্রিকেট খেলতে চলে যেতাম, অথচ বেতনও পেতাম – এই বিষয়টা আমাকে সবসময় অপরাধবোধে ভোগাত। আমি স্যামি লকস্টনকে বলেই ফেললাম, ‘আমি দুঃখিত, কিন্তু আমি আর খেলতে চাই না।’ আমার ক্রিকেট খেলার ওপর PTSD-র বড় ধরনের প্রভাব পড়েছিল। …  আমাদের সবসময়ই শেখানো হয় যে, একটা দলের শক্তি নির্ভর করে তার সবচেয়ে দুর্বল সদস্যের শক্তির ওপর। কর্মক্ষেত্রে ফেরার পরও আমি সেই শিক্ষাটা মনে রেখেছিলাম। সহকর্মীরা যখন কাজে গাফিলতি করত, তখন আমি প্রতিবাদ করে বিপাকে পড়তাম; এমনকি এ কারণে আমাকে চাকরিও হারাতে হয়েছিল।“

তিনি বলেন,

“সেনাবাহিনীতে আপনাকে মানুষ হত্যা করতে শেখানো হয়, কিন্তু সেই শিক্ষা বা মানসিকতা কেমনভাবে ঝেড়ে ফেলতে হয়, তা শেখানো হয় না। … আমি সবেমাত্র আমার সামরিক টুপি ও বেল্ট জমা দিয়েছি; তারা বলল, ‘পরে দেখা হবে’’, আর পরের সপ্তাহেই আমি কাজে ফিরে গেলাম।“

– এ এক আজব ‘অসমাপিকা’ শিক্ষা, তাই না!

ফিরে দেখা?

তবে আজ ডেল নিজে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিচয়ের প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন,

“আমি এ বিষয়ে যত বেশি কথা বলব , মানুষ যত বেশি বুঝতে পারবে যে কেবল তারাই একা এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না –  বরং আরও অনেকে আছে, তত বেশি তারা কথা বলতে উৎসাহিত হবে; আর তখন মনে হবে আমি সত্যিই অর্থবহ কিছু করতে পেরেছি। … এটা আমার নিজের জন্যও এক ধরনের থেরাপি। দেখা যাক, অন্যদের সাহায্য করার জন্য আমরা কী করতে পারি।“

একেকজনের ক্ষেত্রে একেক ধরনের চিকিৎসা কার্যকর হয়। ওষুধ হয়তো PTSD- তে’আক্রান্ত কারও কারও উপকারে আসে, কিন্তু ডেল নিজে কখনওই সেই পদ্ধতি বেছে নেননি। বরং তিনি অনুভব করেন যে “Stand Tal for PTS”-এর প্রধান মুখ বা উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করাই তাঁর জন্য সেরা চিকিৎসা।

ডেল বলেন,

“আমি এখন দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই এই কাজ করি; বলা যায়, আমার সেই অতিরিক্ত কাজপাগল স্বভাবেরই যেন এ এক ধারাবাহিকতা। অবসরগ্রস্ত পেনশনভোগী হয়ে পড়বার পর সবচেয়ে খারাপ ব্যাপারগুলোর মধ্যে একটা হ’ল ,আপনাকে বলে দেওয়া হয় যে আপনি সপ্তাহে মাত্র আট ঘণ্টা কাজ করতে পারবেন – এ এক ফাঁদ। তখন মানুষ কী করবে? কেবল বসে বসে চিন্তা করবে। অথচ নিজেকে ব্যস্ত রাখা জরুরি। তাই এই কাজটাই আমার থেরাপির অংশ।“

স্মারক সংগ্রহ - ব্যাগি গ্রীন ক্যাপটা আর যুদ্ধপদকগুলো
জন্ম কলকাতায়, ১৯৫৯ সালে, কর্মজীবনের বেশির ভাগও সেখানেই অতিবাহিত। স্কুল-জীবন কাটে দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্ক অঞ্চলের তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনে। পাড়ার ক্লাবে ও স্কুলের ক্রিকেট দলে নিয়মিত খেলবার অভ্যাসটা ছিল। কলেজ-জীবনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র – ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে স্নাতক, কম্প্যুটার সায়েন্স নিয়ে স্নাতকোত্তর। তিন দশক তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মসূত্রে দেশে-বিদেশে প্রচুর ঝাঁকিদর্শন করে, তারপর সপ্তবর্ষব্যাপী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অধ্যাপনা অন্তে ২০১৯ সালে স্বেচ্ছাবসর গ্রহণ। পাঁচ বছর বয়স থেকেই ‘ক্রিকেট-প্রেমিক’। বর্তমানে ‘নন-ফিকশন’ বইয়ের প্রতিই বেশি আকর্ষণ, যদিও সবচেয়ে প্রিয় তিন বাংলা কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিবরাম চক্রবর্তী। ক্রিকেট-বিষয়ক বইয়ের একনিষ্ঠ পাঠক, সংগ্রাহকও বটে। প্রিয় ক্রিকেট-লেখকদের মধ্যে আছেন শঙ্করীপ্রসাদ বসু, রে রবিনসন, টনি কোজিয়ার, ডেভিড ফ্রিথ, গিডিওন হেগ, জ্যারড কিম্বার প্রমুখ। ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল লেখকের প্রথম বই "ক্রিকেটের খেরোর খাতা"; ২০২৪ সালে এসেছিল “ক্রিকেটের খেরোর খাতা: ফলো-অন”, ও (ভাস্কর বসু-র সঙ্গে যুগ্মভাবে) “Our Cricketing Odyssey with Kapil”; ২০২৫ সালে এসেছে “ক্রিকেটের খেরোর খাতা”-র দু’খন্ডের দুই ই-বুক; এবং ২০২৬ সালে এল (ভাস্কর বসু-র সঙ্গে যুগ্মভাবে) “কপিল দেব: গতিদেবতার সঙ্গে ক্রিকেটের আশ্চর্য ভ্রমণ”” ও ই-বুক “ক্রিকেটের কুড়িটা ওভার”। “অবসর” ওয়েব-ম্যাগাজিনে নিয়মিতই লিখে থাকেন। কিছুদিন যাবৎ ক্রিকেট-সম্বন্ধীয় বাংলা YouTube ভিডিও-চ্যানেল “উইলোর উইল”-এর কথকের ভূমিকাও পালন করছেন। মাঝেমধ্যে লিখছেন “উত্তরবঙ্গ সংবাদ” পত্রিকায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *