আমাদের ও হেনরি, আমাদের আন্তন চেখভ

উইলিয়াম সিডনি পোর্টার, যাঁকে গোটা দুনিয়া চেনে ‘ও হেনরি’ নামে, তাঁকে আজ নতুন করে চেনানোর অপেক্ষা রাখে না। কিংবা আন্তন চেখভ? বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে যাওয়া এই বিস্ময়-লেখকেরা আজও আলো দেখান সাহিত্যমনস্কতায়। কিন্তু স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যাঁকে ও হেনরি ও আন্তন চেখভের সঙ্গে তুলনা করেছেন, তিনি যে সাধারণ কেউ নন, এ ধরে নেওয়ায় কোনো বাহুল্য নেই, নিঃসন্দেহে বলা যায়। তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রথিতযশা লেখক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, যিনি ‘বনফুল’ নামে সমধিক বিখ্যাত। তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার প্রাজ্ঞ বিশ্লেষণ, যথাযথ মূল্যায়ন, যৌক্তিক অবতারণা, শ্রমসাধ্য গবেষণা ইত্যাদি বহু হয়েছে। এই প্রবন্ধ সেই গতানুগতিকে আরেকটি নিতান্ত সংযোজন হতে চায় না, বরং তাঁর কয়েকটি অসম্ভব, অলীক, অলৌকিক গল্পের অভূতপূর্বে আলো ফেলার চেষ্টা করা যাক।

১৯৩৮ সাল। দীর্ঘ অসুস্থতার পর আরোগ্য লাভ করে রবীন্দ্রনাথের ‘প্রান্তিক’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে এই বছরই। দীর্ঘ আয়ু-বিধ্বস্ত কবির জীবন, অভিজ্ঞতা, মৃত্যুচেতনায় দীর্ণ এই কাব্যগ্রন্থ চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল জীবনানন্দ দাশের ‘আকাশলীনা’ ও ‘আট বছর আগের একদিন’ নামক কবিতাদুটি। এই বছরেই জানুয়ারি মাসে প্রয়াত হবেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এছাড়া বিশ্বসাহিত্যেও ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটাবে থর্নটন ওয়াইল্ডার-এর নাটক ‘আওয়ার টাউন’— পুলিৎজার পুরস্কার জিতে। মার্কিন লেখিকা পার্ল এস. বাক সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করবেন। অজস্র কালজয়ী সৃষ্টিসম্ভারে বিশ্বসাহিত্য অলঙ্কৃত হয়ে উঠবে, যেমন—জঁ পল সার্ত্র-র ‘লা নোসিয়া,’ জর্জ অরওয়েল-এর ‘হোমেজ টু ক্যাটালোনিয়া,’ গ্রাহাম গ্রিন-এর ‘ব্রাইটন রক,’ প্রভৃতি। আর এই বছরই একটি অসামান্য ছোটগল্প লিখলেন তিনি—‘পাঠকের মৃত্যু।’ বাংলা ছোটগল্প নড়েচড়ে বসল। এই গল্প আন্তর্জাতিকতার মাপেও অনিবার্য আলোচিত হওয়ার কথা ছিল। স্বল্প পরিসরেই তিনি উপস্থাপনা করলেন এক শাশ্বত সত্যের চিরন্তন স্বরূপ।

কী রয়েছে এই গল্পে? যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা অবশ্যই জানেন, এক গ্রীষ্মের দুপুরে আসানসোল স্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষমান গল্পের কথকের সঙ্গে ঘটনাসূত্রে একজন ভদ্রলোকের দেখা হয়ে যায়, যিনি স্টেশনের টিনের ছাউনির দুর্বিষহ গরম উপেক্ষা করেও গভীর একাগ্রতায় একটি বই পড়ছিলেন। কথক তাঁর পাশে গিয়ে বসাতেও তাঁর মনোনিবেশ বিন্দুমাত্র বিঘ্নিত হয় না। একজন সিরিয়াস পাঠক হিসেবে তিনি সাহিত্যের স্বাদ উপভোগ করতে থাকেন তারিয়ে তারিয়ে। কথকের ভেতরে এক তীব্র কৌতূহল সৃষ্টি হয়। তিনি বইটি সম্পর্কে জানতে চান। ভদ্রলোক উত্তর দেন এবং বইটি দেখার জন্য এগিয়েও দেন কথকের দিকে। গল্পে এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে, ভদ্রলোককে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে দীর্ঘ সময়, কিন্তু কথককে মাত্র তিন ঘণ্টা। কথক বইটি নিয়ে পড়তে শুরু করেন এবং অচিরেই পাঠসুখে নিমজ্জিত হয়ে পড়েন পুরোপুরি। বেশ কিছুক্ষণ পর তাঁর ট্রেনের ঘোষণা হয়, ভদ্রলোক তাঁকে মনেও করিয়ে দেন। কিন্তু বইটি না পড়ে ছাড়বেন না, প্রয়োজনে পরের ট্রেনে যাবেন—এমন জানিয়ে দিয়ে পাঠ জারি রাখেন কথক। তাঁর ট্রেন চলে যায়, বেশ কিছুক্ষণ পর কথক যখন বইটির প্রায় শেষ অবধি এসে পৌঁছলেন, দেখা গেল শেষের দিকে কয়েকটি পৃষ্ঠা ছেঁড়া, তাঁর আর বইটি শেষ করা হল না। এক অতৃপ্তি নিয়েই বইটির সিংহভাগ পড়ে ফেলার মৌতাতে বিভোর হয়ে থাকেন কথক।
বহু বছর পর সেই বইটিকেই কথক দেখতে পান এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে। তাঁর মনে পড়ে যায়, এর আগেরবার অনিবার্য কারণে বইটি শেষ করা হয়ে ওঠেনি। যথারীতি আত্মীয়ের বাড়িতে একরাত থেকে যেতে চান, শুধু বইটি শেষ করবেন বলে। কিন্তু শুধু শেষটুকুই না পড়ে, আরও একবার প্রথম থেকেই শুরু করেন তিনি। কিন্তু এবার কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পরই তিনি অনুভব করেন যে, বইটি থেকে সেই অসমাপ্ত আনন্দের রেশ আর পাওয়া যাচ্ছে না তো! বহুদিন আগে প্রতিকূল পরিস্থিতি, অনিশ্চয়তা ইত্যাদিতেও যে পাঠসুখ পেতে তাঁর সামান্য অসুবিধে হয়নি, আজ অনুকূল পরিস্থিতিতেও যেন সেই তৃপ্তির বিন্দুমাত্র পাওয়া হয়ে উঠল না তাঁর। এমনকি বিরক্তি এতটাই উপচে উঠল যে, তিনি যাচ্ছেতাই বইটিকে শেষই করতে পারলেন না। পাঠ-অসমাপ্তিই বইটির অমোঘ নিয়তি হয়ে রইল।
কী আশ্চর্য এক গল্প! কী অনবদ্য গল্প বলার ভঙ্গি! একটি সাহিত্যসৃষ্টি কীভাবে অমরত্ব লাভ করে, তার সার্থক নিদান হয়ে থাকে গল্পটি। পাঠকের রুচি, অনুভূতি, বিশ্বাস, ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি, চারপাশ থেকে প্রাপ্ত স্পন্দন, প্রভাব ইত্যাদি সবকিছুই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। ব্যাপকভাবে বদলে গিয়ে প্রমাণিত হয়, এ পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থবির নয়। কোনো সৃষ্টির মধ্যে চিরকালীন হওয়ার উপাদান থাকলে, তা স্বাভাবিকভাবেই রয়ে যাবে, কাল-যুগ-ব্যক্তি-নিরপেক্ষ হয়েই থেকে যাবে অম্লান হয়ে। অন্য কোনো বিকল্প হয় না। যে সৃষ্টিরা শত বিবর্তনের পরও মানবসভ্যতা, সমাজ, মানসিকতাকে একইভাবে ছুঁয়ে রয়েছে, তাদের আবেদন অমৃতকুম্ভ। সারা পৃথিবী জুড়ে যত শব্দই লিখিত হোক না কেন, কোনো সৃষ্টি অনশ্বর হবে, তার মাপকাঠি কিন্তু একমাত্র পাঠকের চেতনা দ্বারাই নির্ধারিত। অথচ এই সারসত্যে পৌঁছনোর জন্য তাঁকে বিরাট কিছু প্লট বা ভাষার জাদু দেখাতে হয়নি, নিজস্ব সহজিয়া সুরেই তিনি সৃষ্টি করে গেলেন আন্তর্জাতিক মানের এই ছোটগল্পটি; যাকে ভিড়ের মধ্যে ঠাহর না হতেই পারে, কিন্তু একবার দেখা হওয়ার পর উপেক্ষা করার সাধ্য নেই পাঠকের। বনফুল এভাবেই তাঁর জাদুছোঁয়া রেখে গেছেন গল্প থেকে গল্পে।
আরেকটি গল্পের কথা ধরা যাক—‘ক্যানভাসার।’ মাত্র তিনটি চরিত্র—ভৈরব, কাত্যায়নী এবং হীরালাল। ভৈরব এক ব্যর্থ স্বামী, বেকার এবং সংসার প্রতিপালনে অক্ষম। তাঁর শক্তিসামর্থ্য নেই এমন নয়, কিন্তু মাথায় বুদ্ধির ভাগ কম, বুদ্ধি প্রয়োগের ইচ্ছে আরও কম। কাত্যায়নীর শখ একটি দামি শাড়ির। ভৈরব সেই শখ পূরণ করতে পারে না, কিন্তু নিজের অপারগতাকে সে যুক্তি দিয়ে ঢাকতে চায়। যথারীতি ভৈরবের শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে না পারার অযোগ্যতা কাত্যায়নীর রোষের সামনে উড়ে যায়। ক্ষমতা না থেকেও বিয়ে করার প্রয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলে কাত্যায়নী খুঁচিয়ে তোলে ভৈরবের পৌরুষকে। এই দগদগে ক্ষত নিয়ে অসহায় ভৈরব সাময়িক দূরে সরে যেতে চায় কাত্যায়নীর কাছ থেকে। রাস্তায় বেরিয়ে সবেমাত্র নিমদাঁতন দিয়ে দাঁত মাজতে শুরু করবে, এমন সময় ক্যানভাসার হীরালাল মাজনের বিজ্ঞাপন করতে সামনে এসে দাঁড়ায়। অহেতুক ক্রয়প্রবণতা বাড়িয়ে তোলার অসদুদ্দেশ্য নিয়ে উপস্থিত অচেনা লোকটির ওপর ভৈরবের যাবতীয় রাগ গিয়ে পড়ে। ভৈরবের ক্রমাগত বাজে কথার তোপের সামনে দাঁড়িয়েও হীরালাল স্বভাবগত সৌম্যে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ভৈরবকে, যা করাই হীরালালের কাজ। কিন্তু ভৈরব ক্রমশ হিংস্র হয়ে উঠতে থাকে; আচমকাই সম্পূর্ণ অকারণে সে হীরালালের গালে সপাটে একটি থাপ্পড় কষিয়ে দেয়। হীরালাল এই অপ্রত্যাশিতের জন্য প্রস্তুত ছিল না। তাঁর বাঁধানো দাঁত খুলে আসে মুখের ভেতর থেকে। ভৈরব নিজের আচরণ এবং তার ফলশ্রুতিতে বিস্মিত হয়ে হীরালালের দিকে তাকালে হীরালাল তাঁকে আরও অবাক করে নিজের নকল গোঁফজোড়াও খুলে দেখায়। গল্পটি এই ক্লাইম্যাক্স থেকে আশ্চর্যজনকভাবে অন্যদিকে বাঁক নেয়। জানা যায়, একমাত্র উপার্জনক্ষম পুত্রের অকালমৃত্যু ঘটেছে বলে অসহায় পিতাকে এভাবে সং সেজে রাস্তায় নামতে হয়েছে ন্যূনতম রোজগারের আশায়। এই কাহিনি জানার পর ভৈরবের মতো অমন নির্ভেজাল নির্বোধেরও এক ভাবান্তর ঘটে যায়। কাত্যায়নীর মুখঝামটা খেয়েও যার মধ্যে রোজগার করার ইচ্ছে এবং সেই রোজগারে স্ত্রীর শখ পূরণের উদ্যম ঘনিয়ে ওঠে না, অহেতুক অর্থের অপচয় নিয়ে যে সদা সতর্ক থাকাকেই যথাযথ মনে করে, সেই ভৈরবও হীরালালের কাছ থেকে মাজন কিনে ফেলতে চায়। এ কি হীরালালের সফল ক্যানভাসিং? এত সহজ ভাবনার খোরাক অপেক্ষা আরও বৃহত্তর কোনো বোধে কি জারিত করে না ‘ক্যানভাসার?’ যে সত্তা হাজার অপমানে ধিক্কৃত হয়েও জেগে ওঠে না, তা আচমকা উন্মোচিত হয়ে ওঠে এক অসহায় মানুষের অনন্যোপায়ে। থাপ্পড়টি এখানে কারকমাত্র— যা আত্মোন্মেষ ঘটায়, প্রয়োজনীয় অনুঘটকের কাজ করে।
মাত্র কয়েকটি আঁচড়ে কী নিখুঁত প্রতিমার মুখশ্রী এঁকে ফেলতে পারার অবিসংবাদিত দক্ষতা ছিল বনফুল-সাহিত্যের শিরদাঁড়ায়— যা কখনও বেঁকে যায়নি। বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে বনফুলের সাহিত্যকে বিচার করতে গিয়ে পণ্ডিতরা দেখেছেন, এ এক অভূতপূর্ব শিল্প-সাফল্য—মৌলিকতায় অনন্য। একজন সফল চিকিৎসক হিসেবে যেভাবে রোগীদের আরোগ্যের দিকে নিয়ে যেতেন, ঠিক সেভাবেই বাংলা সাহিত্যকে সুস্থ রাখার পথ্য হিসেবে সৃষ্টি করে গেছেন বিভিন্ন হাস্যরসাত্মক কাহিনি আর তার মধ্যেই লুকিয়ে রেখেছেন কয়েকটি পেরেক; যা আমাদের ব্যথার মহৌষধ হবে যেমন, তেমন আবার ভাবিয়ে তুলবে সমাজ, জনতা, গণপ্রতিক্রিয়ার অবনমন নিয়ে। এজন্য কিন্তু তাঁকে আরোপিত কোনো কাহিনির আদলে অশ্লীলতা, হিংসা ইত্যাদির উপাদান অবলম্বন করতে হয়নি। সাধারণ ভাষায়, সহজ ভঙ্গিতেই ভাসিয়ে দিয়েছেন অমর্ত্য তরণী। বাংলা সাহিত্যে বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনের অন্যতম প্রধান হোতা হিসেবে তাঁকে অস্বীকার করবে, এমন সাধ্য বোধহয় সময়েরও নেই।
আচার্য সুকুমার সেন তাঁর ‘বনফুলের ফুলবন’ গ্রন্থে এই বিস্ময়কর সাহিত্যপ্রতিভাকে নিয়ে যে বীক্ষা আর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, তারপর সম্ভবত বনফুলকে নিয়ে আর বলার কিছুই থাকে না। এছাড়াও তিনি চর্চিত হয়েছেন আরও অজস্র মেধাবী কলমে। তবুও সাধারণ মননেও তো বলার মতো কিছু থাকে। একটি গল্পের পাঠ-প্রতিক্রিয়া কীভাবে একজন পণ্ডিত ও একজন সাধারণ পাঠককেও ছুঁয়ে দিতে পারে, তারই খতিয়ান রাখতে চাওয়ার ধৃষ্টতা ছাড়া এ লেখা কিছুই নয়। ‘নিমগাছ’ গল্পটির কথাই ধরা যাক। বহুচর্চিত এই গল্পটি যেন এক টুকরো স্ফুলিঙ্গের মতো বিচ্ছুরণে অধীর। যে কল্পনাবিলাসী মানুষটি শুধুমাত্র নিমগাছের রূপে মোহিত হয়ে গেছে, প্রয়োজনের খাতিরে তাকে কাছের করে নিতে চায়নি, তাকে ভালো লেগে যায় নিমগাছটির। হ্যাঁ, নিমগাছটিরও যে ভালো লাগার মতো একটা মন রয়েছে— এইখানে কি জাদুবাস্তবের হিরণ্যস্পর্শে আলো জ্বেলে দিচ্ছে না গল্পটি? কী আশ্চর্য এক ভাবনার অবতলে একটি আলোকবিন্দু রাখলেন তিনি! অবশেষে এক অভাবিত অপরূপে গল্পটি সম্পূর্ণ অন্যদিকে বাঁক নিতে চাইল—“ওদের বাড়ির গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্মী বউটার ঠিক এই দশা।” আহা! পাঠকের জন্য ছেড়ে রাখা হল এক অনন্ত কল্পনার অমিত পরিসর। নিঃশব্দে নিজেকে বিলিয়ে দিতে দিতেও আশার দীপ জ্বলে ওঠে, হোক না সে আলো স্তিমিত, তবু তার উদ্ভাস উপেক্ষণীয় তো নয়ই, বরং সংবেদী উদ্ভাসে তা যেন গভীরভাবে স্পর্শ করে। স্পষ্ট করে তোলে এক সামাজিক অমোঘকে, প্রশ্ন তুলে দিয়ে যায় নিপীড়িত শ্রেণির সামাজিক অবস্থান নিয়েও, যা অবহেলিত হতে পারে, কিন্তু একটা সময়ের পর কৈফিয়ত দাবি করে। সেই কৈফিয়ত দিতে চাওয়ার মধ্যে ঘনিয়ে ওঠা দ্বিধা থেকে দায়বদ্ধতার দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়।
তিনি নিজেকে নিজে ‘এক্সপ্লোর’ করেছেন বারেবারে। নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন আরও উঁচু ‘হার্ডলস’-এর সামনে। পার হতে চেষ্টা করেছেন সাবলীল প্রয়াসে। সেটা পার হওয়ার পর আবার নতুনের খোঁজ—আবার—বারবার। বাংলা সাহিত্য যে সময় ধ্রুপদী আঙ্গিকের খোঁজে বিপুলায়তনের পূজারি, তিনি সেই গতানুগতিকতা থেকে অনেকটা দূরে—নুড়িপাথর জমিয়েই উত্তুঙ্গ শীর্ষের ধারণা দিয়ে চলেছেন। সংযম, মিতভাষ, সীমারেখা—কোনোটিই অতিক্রম করে যাওয়ার অমিতব্যয়িতা দেখাননি তিনি। যেমন—‘চোখ গেল’ গল্পটির কথাই ধরা যাক। প্রথম লাইন: “সাধারণের চোখে হয়ত সে সুশ্রী ছিল না।” এখানে ‘সাধারণের’ শব্দটি যে কী সাঙ্ঘাতিক তাৎপর্যবাহী, তা পরে বোঝা যাবে। মিনির চোখ দুটিই ছিল কথকের কাছে প্রধান আকর্ষণ। দুজনের একান্ত সময়ে আবেগপ্রবণ কথক মিনির চোখ দুটি কেড়ে নিতেও ইচ্ছে করতেন। মিনির একদিন অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেল। জীবনের সব অঙ্ক মেলে না। দীর্ঘদিন পর মিনি যখন বাপের বাড়ি ফেরত এল, দেখা গেল তার দুটি চোখই কোনো এক ভুল ওষুধ প্রয়োগে অন্ধ হয়ে গেছে। কথক যখন চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য সমবেদনা প্রকাশ করছেন: “অসাবধানতার জন্য অমন দুটি চোখ গেল।” উত্তরে মিনি বলছে: “কেন যে গেল তা যদি না বুঝতে পেরে থাক, তাহলে না জানাই ভালো।” স্তব্ধ হয়ে থাকতে হয়। এখানে ‘সাধারণের’ শব্দটি কি অন্য এক দ্যোতনা নিয়ে এল না? রূপ কী? এ কি শুধুই দৃশ্যের আঁধার? কথক মিনিকে কতটা ভালোবাসতেন, মিনির অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাওয়া তাকে কতটা ব্যথিত করেছিল—এই সমস্ত কিছু এক লহমায় কম পড়ে গেল শুধু মিনির শেষ অভিমানে, যা আগে কখনও প্রকাশিত হতে দেখা যায়নি। অথচ এজন্য বিরাট কোনো দর্শনের কচকচি নেই, গুরুগাম্ভীর্য নেই, তাত্ত্বিক প্রসঙ্গের অবতারণাও নেই। শুধু পাঠকের জন্য বিছিয়ে রাখা এক অনন্ত প্রান্তর, সেখান দিয়ে হেঁটে যেতে হবে, অবধারিত মননবিন্দুতে সমাপতিত হবে অভিজ্ঞতার জারণ এবং দেখা পাওয়া যেতেই পারে অনিন্দ্যকান্তি আলোর। ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হতে আমরা ক্রমশ তলিয়ে যাব ঐশী গহনে। এমনটাই কি চেয়েছিলেন তিনি?
কেন বা কী জন্য বা কীভাবে তিনি নিজের লেখাকে এই কৃশতনু আঙ্গিকেই সাবলীল করেছেন—এই প্রশ্ন উঠলে তাঁর সুবিস্তীর্ণ সৃষ্টিসম্ভারের প্রতি নিরপেক্ষতা বা সুবিচার করা হয় না। তাঁর অগ্রজ বাংলা সাহিত্যের দিকপালবর্গ, যাঁদের সৃষ্টিতে বাঙালির বোধ আকার পেয়েছে, ভাবনার মাত্রা তৈরি হয়েছে, উপলব্ধির কাঠামো নির্মাণেও উপমেয় হিসেবে এই সম্পদের ভাণ্ডারই। এই আলোর আকরিক থাকা সত্ত্বেও এই যে তিনি মনে করেছিলেন, ‘চোখ-এড়ানো সামগ্রী নিয়েও’ গড়ে তোলা যায় তুলনামূলক অনালোকিত অমেয় ভুবন, এজন্য বাংলা সাহিত্যের পাঠক হিসেবে আপনাকে চিরকৃতজ্ঞ থাকতেই হবে। এই যে তাঁর মনে হয়েছে ‘নানারূপ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে মানব চরিত্রের যাচাই’ করা জরুরি, এজন্য নিজের মাতৃভাষাকে অলংকৃত করার একজন খেয়ালি শিল্পী হিসেবে তাঁর প্রতি আপনার মুগ্ধতা অক্ষয় হয়ে থাকবে। বাংলা সাহিত্যকে জীবনের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা আশু প্রয়োজন, এই অনুভূতি যদি তাঁর না হত, তাহলে কি ‘তিলোত্তমা’-র মতো এমন বিস্ময়কর গল্প পাওয়া যেত?
তিলোত্তমা কৃষ্ণাঙ্গী, স্থূলাঙ্গী— অর্থাৎ বিয়ের বাজারে একেবারেই অচল এক পাত্রী। তার বাবা দরিদ্র ও ধড়িবাজ। কীভাবে যেন মুহূর্তের ভুলে নকুল নন্দী তাঁর ছেলে গোকুলের সঙ্গে তিলোত্তমার সম্বন্ধ ঠিক করে ফেলেন। পাত্রীর কারণে নয়, তাকে পাত্রী হিসেবে পাওয়ার বদলে দানসামগ্রী, পণ ইত্যাদি প্রদানের প্রতিশ্রুতির মোহে। কিন্তু তিলোত্তমার পিতা প্রতিশ্রুত দানসামগ্রী সবটা দিয়ে উঠতে পারেন না, কথা দেন আস্তে আস্তে সবই মিটিয়ে দেবেন। যথারীতি এমন পাত্রী যে শ্বশুরবাড়িতে কোনো সম্মান বা মর্যাদা পাবে না, এর মধ্যে তো কোনো অতিরেক নেই। স্বাভাবিকভাবেই পুত্রবধূ থেকে পরিবারের দাসীতে পরিণত হয় সে। তার বাবাকে যাচ্ছেতাই অপমান করা হয়, যার রেশ তাকেও বিঁধতে ছাড়ে না। অথচ এত কিছুর সাক্ষী হয়েও তিলোত্তমা চুপ করে থাকে। অস্বাভাবিক সে নৈঃশব্দ্য।
গোকুল স্ত্রীকে প্রথম থেকেই পছন্দ করে উঠতে পারেনি, কিন্তু তাই বলে মা বা বাবার মতো কটু কথাও বলেনি সেভাবে। কারণ তিলোত্তমার সঙ্গে তার কথোপকথনই হত কম, প্রায় না হওয়ারই মতো। কোনো বিষয়েই তিলোত্তমা উচ্ছ্বাস বা উৎসাহ বা কৌতূহল দেখায়নি কখনও। এমনকি গোকুলের মা যখন ছেলের আবার বিয়ে দিতে চাইলেন, গোকুল কেন জানে না, তিলোত্তমাকে নিজের মুখে সে কথা জানায়। এমন সাঙ্ঘাতিক বিপদের সামনে দাঁড়িয়েও তিলোত্তমার কোনো তাপ-উত্তাপ নেই, গোকুল অবাক হয়ে যায়। রূপ নয়, গুণও নয়, তিলোত্তমার এই নিস্পৃহাই যেন গোকুলের মধ্যে দাম্পত্য প্রসারিত না করার কারণ ও উদ্যম হয়ে দাঁড়ায়। না হলে বাবাকে যেখানে জানিয়ে ওঠা যায়নি, মাকেও পুরোপুরি সমর্থন করতে কোথায় যেন বাধো-বাধো ঠেকছে, সেই দ্বিধা কাটিয়ে উঠে গোকুল যেন আত্মসম্মতি পেয়ে যায়, দ্বিতীয় বিবাহ করার। নতুন সৃষ্টি হওয়া পরিস্থিতিও তাকে প্রণোদনা জোগায়।
কিন্তু আশীর্বাদের দিন যখন শাঁখ বাজানোর কাউকে না পেয়ে তিলোত্তমাকেই শাশুড়ি সেই দায়িত্ব দেন এবং নির্বিবাদী তিলোত্তমা সেই দায়িত্ব বিনা বাক্যব্যয়ে সম্পন্ন করে, মুচড়ে ওঠে গোকুলের বুকের ভেতরটা। সে আশীর্বাদের জন্য আসনে বসেও গলায় ঝোলানো মালা ছিঁড়ে ফেলে সবাইকে অবাক করে উঠে দাঁড়ায়, তার মনে হয় তিলোত্তমাকে স্ত্রীর মর্যাদা না দিয়ে সে মস্ত বড়ো অপরাধ করে ফেলেছে। কোনো দাবি নেই, জোরাজুরি নেই, শুধু অব্যক্তে বাঙ্ময় হয়ে ওঠার এই অনুভূতির গোধূলিতে যে অচেনা আলোর দেখা পাওয়া যায়, তা গোকুল কোনো দিনও উপলব্ধি করবে, ভাবেনি। অনুতাপের কী ঐশ্বরিক অভিক্ষেপ! নৈঃশব্দ্যেরও কী সবাক ভাষ্য!
সূক্ষ্ম, অতিসূক্ষ্মতার আশ্চর্য জরির কাজে যে নিপুণ বয়নশৈলী তিনি উপস্থাপিত করেছেন, তৎকালীন সময়ে এবং এখনও তার যথার্থ বিকল্প সেভাবে পাওয়া গেল কই? যুগ অনুসারে বাংলা সাহিত্যিকদের সময়তালিকা প্রস্তুত করলে— তাঁকে অবশ্যই রাখতে হয় শুধু নয়, স্বতন্ত্র হিসেবেই রাখতে হয়। কারণ বনফুল একমাত্র বনফুলের সঙ্গেই তুলনীয়। আরেকটি গল্পের কথা মনে পড়ে গেল—‘খেঁদিন।’ ‘আসন্ন সন্তান কন্যা হবে’—জ্যোতিষীর এই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে আত্মউল্লসিত সন্তানসম্ভবা মালতী ও তার স্বামী। ভাবা যায়! যে যুগে এই গল্প লেখা হচ্ছে, সে সময়ের সমাজ এই গল্পের আধুনিকতা কীভাবে হজম করেছিল জানি না, কিন্তু এই উদারচিন্তার পরিসর কি আজকের সাপেক্ষেও যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক নয়? গল্পেই তিনি এই দ্বন্দ্বের খোরাক জুগিয়ে গেছেন। মালতী ও তার স্বামী দুজনেই তাদের সাধের কন্যাসন্তানটিকে অনাথ করে রেখে মারা গেলে, অনাদৃত শিশুটির স্থান জোটে তার মামার বাড়িতে। তার নাম হয় ‘খেঁদি।’ এক দুর্বিষহকে রেখে তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, এ সমাজ আজও মানসিকতা বদলাতে শেখেনি। একজন চিকিৎসক ও লেখক হয়ে প্রাগৈতিহাসিক ধারণা ত্যাগ করানোর জন্য আর কী করতে পারেন একজন প্রকৃত সমাজসংস্কারক? আমরা নিজেদের বদলাতে পেরেছি কি না—তা অন্য প্রসঙ্গ; তবে আয়না কিন্তু ছিলই। আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালে ‘নার্সিসিস্ট’-ই হতে হয়, এমনটা নয়—নিজেকে চেনাও তো হয়।
যদিও তাঁর ‘গল্প সমগ্র’-এর দ্বিতীয় খণ্ডটিতে তুলনামূলক বড়ো গল্প পাওয়া যায়— সে গল্পগুলিও তাঁর নিজস্ব ধরনের স্বাক্ষর বহনকারী। কোথাও মনে হয় না, অকারণে বর্ধিত। প্রমথনাথ বিশী যে বলেছেন: “রেলগাড়িতে, স্টেশনে, ওয়েটিং রুমের আড্ডায়, বাসরঘরে, উৎসবে, ব্যসনে, শ্মশানে নিরন্তর যে জীবনতরঙ্গ উঠিতেছে, পড়িতেছে, তিনি সুনিপুণ কলমে তাহার ছবি আঁকিয়াছেন, কোথাও মন্তব্য করেন নাই।” এর আগে রবীন্দ্রনাথও বলেছেন: “তাঁর গঠনশৈলীতে আত্মসংবরণের বিজ্ঞানীজনোচিত সন্তর্পণ প্রয়াস। কারণ তিনি ছিলেন মিতবাক শিল্পী।” ড. সোহানা বিলকিস যখন তাঁর বনফুলের ছোটগল্প বিষয়ক আলোচনা গ্রন্থটির নামকরণ করেন ‘বনফুলের ছোটগল্প—একটি নিমেষ ও বহতা জীবন’ কিংবা সেই গ্রন্থেই বলছেন: “বনফুলের কাছে লেখালেখি করাটা ছিল নিশ্বাস নেওয়ার মতোই অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।” আমরা অবাক হয়ে যাই এই সাঙ্ঘাতিক সত্যর উচ্চারণে।
বনফুলের লেখা নিয়ে বলতে গেলে পার হয়ে যায় সম্পাদক নির্ধারিত শব্দের সীমা; খেয়াল থাকে না সহজ প্রতিবর্তে থাকার কথাও নয়। মাত্র কয়েকটি লেখায় তাঁকে বুঝতে চাওয়ার চেষ্টা এক বালখিল্য ধৃষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়। এরপরও কোনো তন্বিষ্ট পাঠক বা গবেষক তাঁর আরও অজস্র লেখায় নতুন জ্যোতিষ্কের খোঁজ পাবেন। পেতেই হবে। বাংলা ভাষায় ‘বনফুল চর্চা’ এভাবেই নিশ্চিতভাবে স্বাস্থ্যকর হয়ে উঠবে।
তিনি বেশ কিছু নাটকও লিখেছেন। ‘সন্দেশ’ নামক একটি ছোট্ট নাটকের ভূমিকায় বলা হয়েছে: “না-টক নয়, খুব টক।” হাস্যরস বিনোদনের একটি আবশ্যিক উপাদান। চার্লি চ্যাপলিন হালকাচ্ছলে কত ভারী কথা বলে গেছেন। তিনিও এই সহজ মোড়ক ব্যবহার করেছেন আকছার, নিজেকে পরিচায়িত করেছেন এভাবেই। আর অন্তস্থ রয়ে গেছে বক্তব্যের বিদ্ধকারী ফলা। ‘অল্টারইগো’ বা দ্বৈতসত্তা সাহিত্যে বহুব্যবহৃত— কিন্তু তিনি ‘ভিক্ষুক’ গল্পে দেখিয়েছেন, কথকের ‘অল্টারইগো’ তাঁকে মনে মনে ভিক্ষে করে না বেড়ানোর প্রার্থনা জানিয়েছে। চমকে উঠতে হয়। সত্যিই তো! আমরা প্রত্যেকেই সর্বদা আকাঙ্ক্ষা করছি, আশা করছি, ইচ্ছে করছি—নাম, যশ, খ্যাতি, অর্থের। যে-কোনো কাজ করার পেছনে কি আমাদের গোপন বাসনা জাগ্রত থাকে না যে— সবাই আমার কথা বলুক, পাদপ্রদীপের আলোয় থাকি আমি, চর্চিত হই? নিজেদের বাঁচানোর জন্য আমরা তত্ত্বের অবতারণা করি—এ তো মানুষের প্রবৃত্তি! সেই ‘রাজার অসুখ’-এর ভিখারি হতে পারলাম কই! বলে উঠতে পারলাম কই: “চুপচাপ পড়ে থাকি আর এইসব তামাশা দেখি।” কিন্তু ১৩২৮ বঙ্গাব্দ নাগাদ যখন বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে আমাদের যাবতীয় ভণ্ডামি মেপে নেওয়ার এই লেখা ‘রাজার অসুখ’ প্রকাশিত হচ্ছে, তখনও কি সে জানত—প্রায় বছর ত্রিশ পরে একজন, যাঁর অজস্র গল্পের ম্যাজিকে ততদিনে মজে উঠেছে বাংলার তাবৎ পাঠককুল, তিনি হেলায় বলে উঠবেন—
আমার গল্প যাঁহারা ভালবাসেন তাঁহাদের কাছে আমার লেখা সম্বন্ধে ভূমিকা নিষ্প্রয়োজন। যাঁহারা ভালবাসেন না তাঁহাদের কাছে আরও নিষ্প্রয়োজন। যাঁহারা আমার লেখার সহিত পরিচিত নহেন তাঁহারা এই গল্পগুলি পড়িলেই আমার স্বরূপ জানিতে পারিবেন। তাঁহাদের উদ্দেশ্যে আমার বিশেষ কোন নিবেদন নাই।
বনফুল বনফুলই! তিনি বাংলা সাহিত্যের এক পৃথক পথের একলা পথিক।
———-
তথ্যসূত্র
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য সুকুমার সেন, প্রমথনাথ বিশী, ড. শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. সোহানা বিলকিস, এবং বেশ কিছু গবেষণাপত্র।
ছবি আন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
