পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ প্রতিভা সরকার-এর ‘নির্বাচিত পঁচিশ’
বই: ‘নির্বাচিত পঁচিশ’
লেখিকা: প্রতিভা সরকার
প্রকাশক: সৃষ্টিসুখ
মূল্য: ২৯৯ টাকা
আমরা কেন বই পড়ি? সাহিত্যরস আস্বাদনের আশায়? বিনোদনের জন্য? নাকি নিছক সময় কাটানোই উদ্দেশ্য?
আর সেই বই যদি হাতে আসার পর মনটাকে আরাম না দেয়? যদি ক্ষতবিক্ষত করে আমাদের মনন— কঠিন, কঠোর বাস্তব যদি আমাদের শান্ত, সুনিশ্চিত জীবনের অলীক ছবিকে ছিঁড়েখুঁড়ে দেয়, বিবেক যদি একটানে আমাদের আয়নার সামনে এনে দাঁড় করায়? রেখে দেব কি সেই বই নামিয়ে?
আর যদি নামিয়ে রাখা সম্ভব না হয়? গল্পের পর গল্প যদি কাঁদায়, ভাবায়, তোলপাড় করে দেয় অন্তর?
নিজের সৃষ্টি নিয়ে লেখিকা বলছেন, “তাদের সর্বাঙ্গে সেই একই প্রহারের চিহ্ন। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া অন্যায় আর পাপের ঘা দগদগে হয়ে ফুটে আছে তাদের ত্বকে।”
পড়ছি প্রতিভা সরকারের ছোটগল্প সংকলন, ‘নির্বাচিত পঁচিশ,’ প্রকাশক সৃষ্টিসুখ। ঝকঝকে ছাপা, তকতকে শ্রী বইটির।
প্রথম গল্প ‘ভ্রমন।’ জঙ্গলে গিয়ে মধু সংগ্রহ, হরিণ মারা, কাঠের চোরাচালান করা হতদরিদ্র মানুষের ঘরদোরের কথা। এক মায়ের কথা, যার ফুটফুটে কিশোরী মেয়ে নিখোঁজ; কানাঘুষো শোনা যায় মেয়ের বাপই নাকি তাকে বেচে দিয়েছে। নিরুপায় মা চোখের জল ফেলে আড়ালে, আবার ঘর করে সেই ‘সোয়ামি’রই, শুধু মেয়েকে মনে করে করে পাগল পাগল তার মন—পোষা মিনির মধ্যেই ভ্রম করে দেখে, খোঁজে তার হারানো বুল্টিকে।
মানুষের নিষ্ঠুরতা, জাতিবিদ্বেষ, ক্ষমতার আস্ফালন, দুই জনগোষ্ঠীর লড়াইতে চরম হিংস্রতা—এইসবের কথা পড়ি ‘মৈলান’ গল্পে। তবু বাল্যবন্ধুর নাম মনে জাগায় সহানুভূতি, ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক স্নেহমায়া। শেষ মুহূর্তে দানবীয় নিষ্ঠুরতার ঊর্ধ্বে জিতে যায় মানবিকতা।
এই দুই জগতের থেকে একেবারে আলাদা, আমাদের সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি ঘরের কথা পাই ‘ভাই বোন’ গল্পে। কিন্তু সত্যিই সাধারণ কি? মায়া, স্নেহ, কর্তব্য আর বাৎসল্যের সঙ্গে সঙ্গে স্বার্থ ও স্বার্থপরতার চোরাস্রোত কি সাধারণ পরিবারেও বয়ে চলে না?
মাতৃত্ব। অসংখ্য সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে এই মাতৃত্ব নিয়ে; তার মহত্ব, তার মোহ, তার মমতা জন্ম দিয়েছে অনেক অনেক গল্প-কাহিনির। এই মাতৃত্ব এক অনন্য রূপে ধরা পড়ে লেখিকার ‘শিয়াল-মারা’ গল্পে, যেখানে পশু মা আর মানুষ মা একে অপরের গর্ভাবস্থা ও জন্মদানের সমব্যথী ও সহমর্মী হয়ে ওঠে। আবার একই সংসারে নারী মানুষ ও নারী পশুর একে অপরের সঙ্গে জড়ানো মাতৃত্বের এক অনন্য গল্প ‘মালা-ডি।’ নারী মানুষের মা হতে চেয়েও না পারার করুণ অপারগতা, আর ব্যবসার কারণে নারী পশুর বারবার গর্ভধারণ করানো এবং বারবার তার সেই শাবকগুলিকে এই নিঃসন্তান নারীই দেখভাল করবে সেই প্রত্যাশা… কী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে সেই নারীকে?
আচ্ছা, মাতৃত্বের কথাই যদি উঠল, আর উঠল পোষ্যদের কথা, তাহলে এই বইয়ের ‘বেড়াল কুকুরের মা’ গল্পটির কথা তো বলতেই হয়। মরণাপন্ন নায়িকা, বেঁচে থাকার প্রবল আগ্রহের থেকেও বেশি আগ্রহ জানতে, তার জীবন-মৃত্যুর সম্ভাবনা নিয়ে কী ভাবছে তার সন্তান, কারণ স্বামী যে খুব সদর্থক কিছু ভাবছে না— সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত। কিন্তু মানুষ সন্তান, দূরে থাকা নিজের সেই মানুষ সন্তানের কথা ভালো করে শুনতে না পেলেও, তার আধা-অচেতন মনে তার আশেপাশে এসে দাঁড়ায় তার পোষ্য। যারা ইহজগতের মায়া কাটিয়েছে অনেক আগেই, কিন্তু কোনো অজানা কারণে তাদের মায়ায় নায়িকা অদম্য মনের জোরে ফিরে আসে এই জীবন-মরণের প্রান্ত থেকে। গায়ে কাঁটা দেয়।
আর গা শিরশির করে, নাকি বলব, গা ঘিনঘিন করে এই বইয়ের ‘পশ্বাচার’ গল্পটি পড়ে। বিকৃত যৌনতা, বিকৃত সমাজের এক তীব্র অস্বস্তিকর অথচ অনন্য দলিল এই গল্পটি।
কিশোরীর প্রথম জৈবিক চেতনার জাগরণের, বোঝা না-বোঝার মাঝে দোলাচলের, এবং আবারও, মানুষের হৃদয়হীনতার কথা আসে ‘কুয়াশার পাখি’ গল্পে।
আসলে, বাদ দেওয়া যায় না কোনো গল্পই। ‘চড়ুই পাখির মাংস’— কিছু লৌকিক-অলৌকিক গল্পকথার মধ্যে যেতে যেতে বাঁক নেয় এক নারীর দীর্ঘদিনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে অবশেষে রুখে দাঁড়ানোর কাহিনিতে। ‘সত্যবতী’ গল্পে উঠে আসে এক খেটে খাওয়া মেয়ের প্রেম-অপ্রেমের কথা। আবার ‘পুত্রার্থে’ গল্পে— মরা মা ফিরে আসে, আর সেঁধিয়ে যায় পুত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
লেখিকা বলছেন, “চারপাশে যা ঘটে তার দ্বারা তীব্রভাবে আলোড়িত হই, ন্যায়-অন্যায়ের নিজস্ব বোধ প্রবল বলেই হয়তো পক্ষ নিয়ে ফেলি।”
কিন্তু শুধু ন্যায়-অন্যায় বিচারের জন্যই লেখেন কি উনি?
না, প্রতিভা সরকার বলছেন, “যা অশান্ত করে তোলে, শেষে তা-ই আবার শান্তিজল ছেটায়।”
সেই শান্তিজল পাঠক মাথা পেতে নেয়।
