পাঠ প্রতিক্রিয়া: সায়ন্তনী ভট্টাচার্য'র নীল অপরাজিতা ও অন্যান্য
বই: নীল অপরাজিতা ও অন্যান্য
লেখিকা: সায়ন্তনী ভট্টাচার্য
প্রকাশনা: অভিযান পাবলিশার্স
মূল্য: ২০০ টাকা
শব্দের মধ্যে গল্প থাকে না, দুটো শব্দের মাঝের যে অতলান্ত খাদ, যেখান থেকে পাঠকের মনন খুঁড়ে উঠে আসতে পারে অন্ধকারের চাঙর, আলো ঝিলমিল পরী অথবা জিওল গাছের আঠার মতন সর্বস্বহীনতা, গল্প থাকে ওই নিরুচ্চারিত ব্যবধানের মধ্যে। দ্বিধা—বড়ো দ্বিধা গল্পগুলোর গায়ে। একদিকে প্রগাঢ় নিষাদ, অপরদিকে চাঁদের মধ্যে থেকে কেউ চাঁদ চুরি করে নিয়েছে। পড়ে আছে ঘোলাটে চাঁদের কলসপত্রী খোলস। তবুও, তবুও জীবন অগাধ। বেঁচে থাকা, শুধু বেঁচে থাকার চেয়ে মহনীয় আর কিছুই নেই বলে মনে হয় গল্পগুলো পড়লে।
শৈশবে—তখন সদ্য পেনসিলের শিষ বাঁকিয়ে শেড দিতে শিখেছি। মনে হত ভারি পারদর্শিতা দেখাচ্ছি। স্যার আঁকার স্যার বলতেন, “পেনসিল বেঁকিয়ে আঁকা যায় না। আসলে পেনসিল সোজা রেখে আঁকতে হয়।” তারপর নিজে এঁকে দেখাতেন। দেখতাম শিষ বাঁকিয়ে শেড দেওয়ার মধ্যে একরকম চটক আছে, কিন্তু যেটা থাকে না— তার নাম ডিটেলিং, সততা। কথাগুলো বললাম কারণ ম্যাজিক রিয়েলিটি ভাবলেই প্রথমেই যে ফাঁদটা চলে আসে, সেটা ওই পেনসিল বেঁকিয়ে একটা আবছায়া তৈরি করার কথা। যে জগতের নিয়মকানুন বলে কিছু নেই। ‘ক’-এর পর সেখানে ‘ঘ’ অনায়াসে বসানো যায়। কিন্তু আসলে ওখানেই ‘ক’-এর পর ‘খ’ আসাটা বেশি প্রয়োজনীয়, কারণ নিয়ম ভাঙার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রীতির বালাই থাকে। নইলে ভাঙচুরের মধ্যে রূপময়তা আসে না— খাদের ভিতর অতল নয়, চালিয়াতি বাসা বাঁধে। ‘নীল অপরাজিতা ও অন্যান্য’-র প্রায় সব গল্পেই ম্যাজিক রিয়ালিজম আছে। কিন্তু লেখিকা পেনসিল সোজা করে ধরেছেন। কায়দা করতে গিয়ে ভাঙচুরকে মসিলিপ্ত করেননি। সেজন্য তাঁর সাধুবাদ প্রাপ্য।
সর্বমোট দশটি গল্প আছে একাত্তর পাতার বইটিতে। দশটি গল্পই বিষণ্ণতার, আরও নিখুঁতভাবে বলতে গেলে বিপন্নতার। যেখানে কথা বলে ওঠে প্রবাসী ইলিশ, প্রক্সিমা সেন্টাউরি থেকে নেমে আসে নক্ষত্রমানব, অন্ধ গায়ক অমাবস্যার রাতে চাঁদের জ্যোৎস্না মাখে নদীর ধারে বসে অথবা মাঝবয়সী নারীর ভরন্ত সংসার থেকে চাঁদ চুরি হয়ে যায়। মায়া—বড়ো মায়া লেখিকার কলমে। এবং বড্ড নির্দয়ভাবে তিনি আর্তনাদ এঁকেছেন। যেখানে তিনি মৃত্যু এঁকেছেন জীবন দিয়ে, প্রাচুর্য দেখিয়েছেন সর্বস্বহরণ দিয়ে, প্রাত্যহিক গ্লানি দেখিয়েছেন দিনলিপি লিখে আর দারিদ্র্য চিত্রণ করেছেন ফোকলা দাঁতের হাসি দিয়ে, লটপটির চচ্চড়ি দিয়ে। যেটুকু আছে, সেটুকু দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন থাকার মধ্যে কী অতল না থাকা বাস করে।
‘তারপর সন্ধে হল’ গল্পটি দিয়ে বইটির শুরু। অমৃতরূপা নামে একজন নারীর জীবন। তাঁর যাপন, তাঁর শূন্যতা। সাকুল্যে সাড়ে পাঁচ পাতার গল্প। কিন্তু গল্পটা এককথায় ক্লাসিক। কারণ লেখিকা বলেননি কী নেই অমৃতরূপার জীবনে। বলেছেন কী আছে। শব্দের ফাঁকের ভেতরে আঙুল ঢুকে যায় এমন গল্পের। ‘আসছে বছর আবার হবে’ বইটির অন্যতম সেরা গল্প। শেষে জার্ক আছে। মনে রাখার মতো গল্পটি। ‘উজিরপুরের ইলিশ’ তো একেবারেই ক্লাসিক্যাল ধাঁচের গল্প। উদ্বাস্তু যন্ত্রণার গল্প। শেষে এসে মনটা অম্লমধুর হয়ে যায়। ‘হাবিনিয়ার’ তুলনায় দুর্বল মনে হয়েছে। কারণ অত্যধিক দারিদ্র্যের বর্ণনা। শেষে এসে মনে হবে ওই ধাক্কাটুকু দেওয়ার জন্যই এত আয়োজন। পরের গল্প ‘নীল অপরাজিতা।’ খুব সম্ভবত বইটির সবচেয়ে দুর্বল গল্প। আঁকায় কখনও সরাসরি কালো আর লাল নাকি দিতে নেই। কারণ, তাহলে প্রথমেই ওইদিকে নজর চলে যাবে। গোটা ছবির সামগ্রিকতা নষ্ট হয় তাতে। ‘নীল অপরাজিতা’ গল্পে আদ্যন্ত লাল আর কালোর ব্যবহার ভালো লাগেনি। ‘যারা টানটান শুয়ে থাকে’ ভালো গল্প। সহজ চলন, দৈনন্দিনতার মাঝেও একরকম উত্তরণ থাকে, লেখিকা তেমন করেই সাজিয়েছেন গল্পটিকে। ‘পথের ধার ভিখিরি সমিতির সদস্যরা’ আরেকটা অদ্ভুত সুন্দর গল্প। ভিখিরিরা রোজ ভাবে আজ জলে ডুবে মরব… কিন্তু মরা কী অতই সোজা! মরব বললেই মরা যায় না। একটা জায়গায় লেখিকা বলছেন কাল জীবন খারাপ হতে পারে, তবু ওই খারাপটুকু দেখার জন্যেও তো বেঁচে থাকতে হবে। গল্পের শেষটায় এসে গায়ে কাঁটা দেবে। সত্যি কথা বলতে গল্পটা পড়ার পর পরের গল্পে যেতে সময় লেগেছে। এতটাই অভিঘাত এই গল্পের। ‘পুঁটির গামছা’-ও এক গোত্রের গল্প। পুঁটি তেরোবার চৌদ্দবার মরেছে। তবুও সে বেঁচে থাকে— আরেকবার মরবে বলে। ছোট ছোট তীক্ষ্ণ বাক্য। ধারে কেটে যায় এমন। শেষ বাক্য ইঙ্গিতপূর্ণ। সদর্থক। তবু অনন্ত জাগে। ‘যারা হাঁ করে থাকে’ আর ‘দেখা আটকে যায়’ গল্পদুটো এক ঘরানার। ধনতন্ত্রের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত বিবমিষা। সত্যি বলতে এমন গল্প আগেও লেখা হয়েছে, পরেও হবে। কিন্তু এভাবে আকাশ থেকে নক্ষত্রমানব এনে অথবা শ্যামল স্নিগ্ধ পরিপূর্ণতার পাশে শপিং মলের নিখাগী ‘আমাকে দেখ’ ম্যানিকুইনকে কতজনই বা রাখতে পারেন!
‘নীল অপরাজিতা’ সকলের পড়ার বই নয়। সাহিত্যের ছাত্র-ছাত্রীর পড়া উচিত কারণ— এটা একটা ধারা; ভাঙচুর গদ্য। ঠিক তার গা ঘেঁষাঘেঁষি করে পাশে রূপকথা রাখা। আর পড়া উচিত বিপন্নতার থেকে যাঁরা ত্রাণ প্রার্থনা করেন তাঁদের। আমি বিপন্ন—এই বোধটুকু সহজলভ্য নয়। তার জন্য নিজেকে খুঁড়তে হয়। যেমন অমৃতরূপা, যেমন পুঁটি, যেমন গার্গী, যেমন টুলটুলি। আমি এটা চাই, এর পাশে আমি যেটা করছি ঠিক করছি তো? এই প্রশ্ন সবাই রাখতে পারেন না, সবাই রাখতে চান না। তাঁরা উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত, শ্রান্ত এবং সুখী। সুখের খোলস ছেড়ে নগ্ন সত্যের মুখোমুখি হওয়ার জন্য চালিয়াতি লাগে না, মগ্নতা লাগে। ‘নীল অপরাজিতা ও অন্যান্য’ সেইসব পাঠকদের জন্য। যাঁরা প্রশ্ন করতে পারেন, উত্তর শোনার ধক রাখেন। শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেন, “চাঁদ চুরি গেলে বেঁচে থেকে কী করব?” অন্ধ গায়ক তখন অনুচ্ছিষ্ট খাদের ধারে পিছন ফিরে দাঁড়ান। উচ্চারণ করেন, “কিছু নেইয়ের মধ্যেও যে কত কিছু থাকে!”
বইটির প্রচ্ছদ যথাযথ। অনুযোগ—সবকটি গল্পই বিষণ্ণতার রাঙতায় মোড়া, জ্যোৎস্নার অভিশাপে অভিশপ্ত। হালকা স্বাদের গল্প নেই। তাই পরপর পড়তে পড়তে একটা ক্লান্তি আসে। আর একাত্তর পাতায় এই বই শেষ হওয়া অনেকটা পাঠক হিসেবে অর্ধভুক্ত থেকে উঠে আসার মতো। আরও পাঁচটা ছ-টা গল্প ঢোকানোই যেত। লেখিকার জন্য শুভেচ্ছা রইল।
