সত্যকাম
সত্যকাম – নামটা মনে পড়লে প্রথমেই যে দৃশ্যটা মনের পর্দায় ভেসে ওঠে সেটা হল বৃষ্টিভেজা বর্ধমানের জি.টি.রোডের উপর দিয়ে পড়ন্ত বিকেলে তীরবেগে ছুটে চলা একটা সাইকেল, যার ক্রসবারে আমি, আর চালকের আসনে সত্যকাম।
তারপর? তারপর মনে পড়ে গুলজার সাহাবের লেখা একটি গানের একটি ছত্র: “কিতাবোঁ সে কভি গুজরো তো য়্যুঁ কিরদার মিলতে হ্যাঁয়।”
পুরো নাম সত্যকাম দত্ত, সংক্ষেপে সত্য। সত্যকামের সাথে পরিচয় হওয়ার অনেক আগে থেকেই আমি তার সাথে পরিচিত। ব্যাপারটা এইরকম – উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর আমার সহপাঠী তথা বাল্যবন্ধু অরুণ বর্দ্ধমানে গেল রাজ কলেজে অঙ্কে অনার্স নিয়ে পড়তে। আগামী তিন বছরের জন্য তার ঠিকানা হল রূপমহল সিনেমাহল সংলগ্ন একটি মেস। আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষা জয়েন্ট এন্ট্রান্স দেবার উদ্দেশ্যে একবছর ঘরে থেকে প্রস্তুতি নেব বলে ঠিক করলাম। ওদিকে অরুণ বর্দ্ধমানে যে মেসে উঠল, সেখানে ওর রুমমেট ছিল সত্যকাম। দুজনের বিছানা ছিল পাশাপাশি। সত্যকাম রাজ কলেজে অ্যাকাউন্টেন্সি নিয়ে পড়তে এসেছিল। সপ্তাহান্তে বর্দ্ধমান থেকে বাড়ী ফিরে অরুণ সত্যকাম সম্বন্ধে ইতিউতি গল্প শোনাত। ও বলত, “সত্য হল কলিকালে জন্মানো সত্যযুগের লোক। ওকে দেখলে তুই নিজেকে আর ‘ভালো ছেলে’ বলতে সাহস পাবি না।”
জয়েন্টে চান্স অবশ্য পাইনি। ফলস্বরূপ এক শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে পড়ে পরের বছর সেই বর্দ্ধমানেই ভর্ত্তি হতে হল একটি টেকনিক্যাল কোর্সে। অরুণকে আগে থেকেই বলা ছিল, দুর্গাপুজোর ছুটি শেষ হয়ে ইনস্টিট্যুট খুলতেই সাড়ে চুয়াত্তরের তুলসী চক্কোত্তির ঢঙে হাতে একটা চামড়ার স্যুটকেস আর বগলদাবা করা শতরঞ্চি জড়ানো তোষক-বালিশ নিয়ে গিয়ে উঠলাম সেই মেসের সেই ঘরটিতেই, যেখানে গত এক বছর ধরে পাশাপাশি বিরাজমান অরুণ আর সত্যকাম।
আজও মনে আছে, সেদিন সত্যকাম মেসে উপস্থিত ছিল না, সে তখন গেছিল রামপুরহাটে তার বাড়ীতে। অরুণ বলল, ওর ফিরতে কদিন দেরী হবে। আর দেরী করে সত্যকাম যখন ফিরল, তখন ঘরে আমি একা, অরুণ বাড়ী গেছে। পরে, যখন বন্ধুত্ব গাঢ় হয়েছিল, তখন সত্যকাম বলেছিল, প্রথম দর্শনে আমাকে ওর মোটেই ভাল লাগেনি। মোটের উপর সুদর্শন এবং স্বাস্থ্যবান অরুণের বন্ধু যে এরকম একজন দুর্ভিক্ষপীড়িত খর্ব-কৃশকায় ছেলে হবে, সেটা সে একেবারেই আশা করেনি, তার উপর আমার নিষ্প্রভ চোখ দুটোও নাকি তাকে নিদারুণ হতাশ করেছিল। আমার নিরপেক্ষ বিচারে সত্যকাম ছিল সুদর্শন (আমার তুলনায় তো ঢের বেশী), আর কেকের উপর চেরীর মত ছিল তার সারল্যে ভরা দুটো চোখ। আমার চেয়ে বেশ খানিকটা লম্বা, বয়সেও প্রায় দেড় বছরের বড়, মেদবর্জিত ছিপছিপে শরীর, চুলগুলো প্রাক-যৌবনের শর্ত মেনে যথেষ্ট বড় বড়, সাইকেল চালালে সেগুলো ক্ষেতের পাকা ধানগাছের ডগার মত মাথা দোলাত। ক্রোধাবিষ্ট হলে তার শ্মশ্রুগুম্ফবিহীন গৌরবর্ণ মুখমণ্ডল রক্তবর্ণ ধারণ করত, লজ্জিত হলে সেই মুখমণ্ডলই নিমেষে হয়ে যেত পাণ্ডুর। মাসপাঁচেক পর একদিন সে আমায় বলেছিল, “প্রথমে তো ভেবেছিলাম তুমি বোধহয় টেকো, পরে বুঝলাম যে ওটা টাক নয়। চুলগুলো তুমি এতটাই বিচ্ছিরিরকমের ছোট ছোট করে কাটাও, যে এক্কেবারে টাক বেরিয়ে যায়। এত্ত ছোট করে চুল কাটাও কেন, দেখতে কি বিচ্ছিরি লাগে! মেয়েরা তো ফিরেও তাকাবে না তোমার দিকে।”
সৈয়দ মুজতবা আলীর লেখা থেকে একটা লাইন ধার করে বলেছিলাম, “টেকোর নেই উকুনের ভয়, তাই।”
এইভাবে দুই ময়ূরের মাঝে ময়ূরপুচ্ছধারী কাকের মত আমার মেসজীবন শুরু হল। ফারসী ভাষায় যেমন মাত্র দুটি সম্বোধন, ‘শোমা’ আর ‘তো’, তেমনি সত্যকামের বাঙলাতেও ছিল মাত্র দুটি সম্বোধন, ‘আপনি’ আর ‘তুমি’। ফারসীর ‘তো’ দিয়ে অবশ্য ‘তুমি’ আর ‘তুই’ দুটোই বোঝানো যায়, কিন্তু সত্যকামের বাঙলায় ‘তুই’-এর কোনও অস্তিত্বই ছিল না। অরুণ সত্যকামকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করত, সত্যকাম ওকে ‘তুমি’ বলে ডাকত। আমার সাথে প্রথম আলাপের মুহূর্ত থেকেই আমরা পরস্পরকে ‘তুমি’ বলেই ডেকেছি, কোনওদিন এর ব্যত্যয় হয়নি। জীবনে কোনওদিন ভুলেও সত্যকাম কোনও অশ্লীল শব্দ বা গালাগালি উচ্চারণ করেনি। ওর মুখে এমনকী ‘শালা’ শব্দটাও কোনওদিন শুনিনি।
সত্যকামের চিন্তাভাবনায় এক অন্য ধরনের স্বচ্ছতা ছিল, তার প্রমাণ পরিচয়ের প্রথম রাতেই পেয়েছিলাম। মেসে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা ছিল না, সব্বাই যে যার মত এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন হোটেলে খেত। সেদিন রাতে খেতে যাবার সময় সত্যকাম জিজ্ঞেস করল, “গ্র্যাজুয়েশন না করে টেকনিক্যাল পড়তে এলে কেন?” বললাম, উচ্চমাধ্যমিকে ভাল রেসাল্ট করতে পারিনি, তাই কোনও কলেজে গ্র্যাজুয়েশন পড়ার সুযোগ পাইনি। শুনে সত্যকাম জিজ্ঞেস করল, “কত পেয়েছিলে?”
“ওই, টেনেটুনে কোনওরকমে ফার্স্ট ডিভিশন আর কি।”
“টেনেটুনে লোকে থার্ড ডিভিশন পেতে পারে, ফার্স্ট ডিভিশন কেউ টেনেটুনে পায় না,” গম্ভীর স্বরে বলেছিল সত্যকাম।
অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে এত সহজ কথাটা তো কোনওদিন আমার মাথায় আসেনি। সত্যিই তো, ফার্স্ট ডিভিশন আবার কেউ ‘টেনেটুনে’ পায় নাকি! আমার নেতিয়ে পড়া আত্মবিশ্বাস ওর এই কথাটা শুনে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল।
লেখাপড়ার ব্যাপারে সত্যকাম ছিল আদ্যন্ত সচেতন। ওর পড়ার সময় ছিল দুপুরে ও রাতে। সত্যকামের অনেকগুলো লম্বা লম্বা সাদা খাতা ছিল। আর ছিল একগুচ্ছ পেন্সিল আর একটা ৩০ সেমি দৈর্ঘ্যের কাঠের স্কেল, যা বাজার ছেয়ে যাওয়া প্লাস্টিকের স্বচ্ছ স্কেলের দাপটে সেই সময় প্রায় অবলুপ্ত হওয়ার পথে। সারা রাত জেগে সত্যকাম সেই খাতাগুলোয় ওই কাঠের স্কেল দিয়ে লাইন টেনে টেনে হিসাবশাস্ত্রের ডেবিট-ক্রেডিট সংক্রান্ত জটিল অঙ্ক কষত। ওর যুক্তি ছিল, রাতে সব্বাই শুয়ে পড়লে পরিবেশ এক্কেবারে শান্ত হয়ে যায়; কোলাহলবিহীন এই সময়টাকে ঘুমিয়ে নষ্ট না করে পড়াশোনায় মনঃসংযোগ করার কাজে লাগানো উচিৎ। আমার মত রাতে পশ্চাদ্দেশে হাওয়া লাগিয়ে সুখনিদ্রা যাওয়া মাথামোটা ছেলে অবিশ্যি এই যুক্তি আর আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মধ্যে কোনও পার্থক্য খুঁজে পায়নি। তবে সত্যকাম পরের বছর আমার গুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এক বিরাট বিপদ থেকে আমাকে রক্ষা করেছিল। আমাদের টেকনিক্যাল কোর্সের দ্বিতীয় বর্ষে ১০০ নম্বরের একটি সাবজেক্ট ছিল “ইকনমিক্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেন্সি”। অ্যাকাউন্টেন্সির অংশের ৫০ নম্বরের বৈতরণী আমি সত্যকামের দয়াদাক্ষিণ্যেই পার হয়েছিলাম। ডেবিট-ক্রেডিটের অঙ্ক শেখানোর সময় একরাতে সে যে অমোঘ আপ্তবাক্য উচ্চারণ করেছিল, তা গুরুমন্ত্র হিসেবে আজীবন স্মৃতিধার্য করে রাখব। সত্যকাম সেই রাতে আমায় বলেছিল, “জেনে রেখো, মেধার অভাব হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম দিয়ে পূরণ করা যায়, কিন্তু পরিশ্রমের অভাব কখনও মেধা দিয়ে পূরণ করা যায় না।”
অরুণ আর সত্যকাম, দুজনেই তখন কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে। সেকেন্ড ইয়ারে কলেজে ম্যাথ অনার্সের বেশী ক্লাস থাকত না বলে অরুণ শুধুমাত্র টিউশনের দু-তিনটে দিন মেসে থেকে বাকী দিনগুলোয় বাড়ী চলে যেত। আমার ইনস্টিট্যুটে প্রতিদিন ক্লাস থাকত, আর সত্যকামেরও প্রায় প্রতিদিনই টিউশন থাকত, তাই আমরা একপ্রকার বাধ্য হয়েই মেসের মাটি কামড়ে পড়ে থাকতাম। অরুণের অনুপস্থিতিতে ধীরে ধীরে আমাদের পারস্পরিক নির্ভরতা ও বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। সত্যকাম ওর কলেজের একটি মেয়ের কথা প্রায়ই বলত আমাকে। মেয়েটি ছিল সুন্দরী, ক্লাসে সব ছেলেই মেয়েটির পাশে বসার জন্য, তার সাথে কথা বলার জন্য উতলা হয়ে থাকত। অন্যদিকে সত্যকাম মেয়ে দেখলেই বোবা হয়ে যেত, ইচ্ছে থাকলেও সেই সুন্দরী সহপাঠিনীর দিকে তাকাবার সাহস পেত না। আর ঠিক এই কারণেই বোধহয় মেয়েটি সত্যকামের প্রতি আকর্ষিত হয়েছিল। এইরকমই একদিন রাতে হেঁটে হেঁটে হোটেলে খেতে যাবার সময় সত্যকাম আমাকে প্যাঁক দিয়ে বলল, “প্রেম নিয়ে তো খুব জ্ঞান দিচ্ছ, এদিকে নিজে তো বর্ন-সিঙ্গল।”
আমি পাকামো করে জামার কলার তুলে বললাম, “ওহে সত্যকাম, আমি হলাম স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, আমি নিজে রাজা হব না কখনও, আমি রাজা তৈরী করি। আয়্যাম নট কিং, আয়্যাম কিং-মেকার।” সত্যকাম হতচকিত হয়ে একথার ‘গূঢ়’ অর্থ জানতে চাইলে বললাম, “আমার লিখে দেওয়া প্রেমপত্র দিয়ে আমার তিন বন্ধু তাদের প্রেমিকাদের পটিয়েছে, বুঝলে। আজকের বাজারে আমার সাকসেস্ রেট হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট।”
শুনেই সত্যকাম আমাকে খুব করে ধরল, “শোন না, আমার সাথে ও বারদুয়েক যেচে কথা বলেছে। সামনেই নিউ ইয়ার, ওকে একটা জম্পেশ কার্ড দেব। তুমি একটু কার্ডের ভেতরে ইংরেজিতে একটা বেশ ভালো দেখে অন্যরকম টাইপের মেসেজ লিখে দাও না।”
নৈশাহার সেরে ফেরার পথে বরদা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে দুটো ছানার জিলাপি আর দুটো গুড়ের কিংকং-সাইজ রসগোল্লা খাইয়ে সত্যকাম আমাকে তার হয়ে মেসেজ লিখে দেওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ করল।
২রা জানুয়ারী সত্যকাম তার সুন্দরী সহপাঠিনীকে সেই মহার্ঘ্য কার্ড দিল, আর ৬ই জানুয়ারী লাফাতে লাফাতে মেসে ফিরে জানালো যে সুন্দরী তার সাথে একদিন সন্ধ্যায় রেষ্টুরেন্টে খেতে যাবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে। “থ্যাঙ্ক্ য়্যু তোতন, যাবে নাকি আমার সাথে রেষ্টুরেন্টে?” আনন্দের আতিশয্যে জিজ্ঞেস করল সত্যকাম। আমি কাবাব-মে-হাড্ডি হতে চাই না বলে তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সত্যকাম আমাকে জড়িয়ে ধরে পারলে সেদিন একটা চুমুই খেয়ে ফেলত।
আমি অবশ্য আমার হাণ্ড্রেড পার্সেন্ট সাকসেস রেট ধরে রাখতে পারিনি, তা নেমে এসেছিল সেভেন্টি ফাইভ পার্সেন্টে। কারণ সত্যকামের সেই সুন্দরী সহপাঠিনী সেই সন্ধ্যায় শুধু সত্যকামের সাথে রেষ্টুরেন্টে ডিনারই করেনি, তার সঙ্গী তথা প্রেমিকের সাথে সত্যকামের পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছিল।
প্রেমের ব্যাপারে সত্যকামের চিন্তাভাবনার পরিচয় পেয়েছিলাম অন্য একটা ঘটনায়, ওই কার্ড-সংক্রান্ত ব্যাপারটা ঘটে যাবার বেশ কয়েকমাস পরে। বাড়ী গেলে টিভিতে ‘পার্ল হার্বার’ নামের একটা হলিউডি সিনেমার ট্রেলার দেখছিলাম বেশ কিছুদিন ধরে, আদ্যোপান্ত যুদ্ধের সিনেমা বলেই মনে হয়েছিল, বিষয়বস্তু ১৯৪১ সালের ৭ই ডিসেম্বর হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটি পার্ল হার্বারের উপর জাপানের অতর্কিতে করা ভয়াবহ হামলা এবং তার বদলা নিতে আমেরিকার প্রতিআক্রমণ। দেখার জন্য উতলা হয়ে ছিলাম। একদিন বিকেলে বৃষ্টিতে ইন্সটিট্যুটে আটকে পড়ায় মেসে ফিরতে দেরী হল। ফিরতেই দেখি কাচুমাচু মুখে সত্যকাম বিছানার উপর বসে আছে। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতে যা বলল, তা শুনে হাড় হিম হয়ে গেল। স্টার সিনেমায় ‘পার্ল হার্বার’ চলছে, কিন্তু আজই শেষ দিন। ঘড়িতে তখন বাজে বিকেল পাঁচটা চল্লিশ, লাস্ট শো শুরু হবে সন্ধ্যে ছটায়। আমাদের মেস থেকে সাইকেলে স্টার সিনেমাহলে পৌঁছতে লাগবে কমপক্ষে ২৫ মিনিট। আমি দাঁত কিড়মিড় করে বললাম, “তোমার মত একজন বন্ধু থাকলে আর শত্রুর কি দরকার! লোকে ফার্স্ট-ডে-ফার্স্ট-শোয়ের খবর আনে, আর তুমি কিনা আনলে লাস্ট-ডে-লাস্ট-শোর খবর?”
কথাটা শুনে সত্যকাম স্প্রিংয়ের মত বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে দেওয়ালের হুকে টাঙানো জামাটা নামিয়ে গায়ে চাপালো। বলল, “সিনেমা আমরা দেখবই, সে যেভাবেই হোক।”
অতঃপর? অতঃপর সেই দৃশ্যের অবতারণা যা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম — বৃষ্টিভেজা বর্ধমানের জি.টি.রোডের উপর দিয়ে টিপটিপ-ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি গায়ে মেখে পড়ন্ত বিকেলে তীরবেগে ছুটে চলা একটা সাইকেল, যার ক্রসবারে আমি, আর চালকের আসনে সত্যকাম।
কিন্তু সিনেমা দেখে আমি বেজায় হতাশ। যুবক পাইলটের চরিত্রে বেন অ্যাফ্লেকের তস্য বালকোচিত অভিনয়, রংচড়ানো হাস্যকর সংলাপ, সিনেমা জুড়ে তথ্যবিকৃতি আর অভিনয়ের বদলে করা পিছনপাকামো — সবের মিশ্রণে এমন জগাখিচুড়ি অখাদ্য জিনিস দেখতে হল যে ছেড়ে-দে-মা-পালিয়ে-বাঁচি অবস্থা। তবে সবচেয়ে ফালতু লাগল তিন কেন্দ্রীয় চরিত্রের ত্রিকোণ প্রেম। যুদ্ধের সিনেমায় খামোখা ত্রিকোণ প্রেম ঢোকানোর কি দরকার ছিল, তার উত্তর না পেয়ে মাথা গরম হয়ে গেল। সত্যি বলতে কি, এটা যুদ্ধের সিনেমা, নাকি বস্তাপচা বলিউডি ত্রিকোণ প্রেমের চর্বিতচর্বণ, তাই বুঝতে পারলাম না। মেসে ফিরে সত্যকামকে জিজ্ঞেস করলুম, “কেমন লাগল তোমার?”
উত্তর না দিয়ে সে প্রতিপ্রশ্ন করলে, “তোমার কেমন লাগল?”
আমি বললুম, “ফালতু! এই একজনের সাথে প্রেম করছে নায়িকা, সে পটল তুলতেই ধাঁই করে তার বন্ধুর প্রেমে পড়ে গেল। শুধু তাই নয়, নায়িকার গর্ভে তার প্রাক্তন প্রেমিকের বন্ধু, যে কিনা তার বর্তমান প্রেমিক, তার সন্তানও চলে এল? প্রেম জিনিসটা কি এতটাই খোলামকুচি নাকি?”
“শাট্ আপ!” আমাকে এক ধমক দিল সত্যকাম (কথায় কথায় শাট্ আপ বলার অভ্যেস ছিল সত্যকামের)। “প্রেমকে যে একটা ‘জিনিস’ ভাবে, সে তো এমন কথা বলবেই। প্রেম কোনও জিনিস নয় তোতন, প্রেম একটা অনুভূতি, আর তা সব সময়ই পবিত্র। তাই সেই অনুভূতি যেমনই হোক, যেরকমই হোক, তাকে শ্রদ্ধা ভরে গ্রহণ করতে শেখো।” বলে চুপ মেরে গেল সত্যকাম।
আমি ভর্ৎসিত হয়ে এক্কেবারে বেকুব-বোবা হয়ে গেলুম। সাথে এটাও বুঝলুম যে দুই প্রেমিকের মধ্যে একজনকে “অন্যের প্রেম সফল করিবার উদ্দেশ্যে আত্মবলিদান করিতে দেখিয়া সত্যকাম বেদনার সাগরে নিমজ্জিত হইয়াছে।”
সত্যকামের প্ররোচনায় এরপর বারকয়েক ওর সাথে প্রেম সংক্রান্ত আলোচনায় মাতলেও তর্ক করার সাহস কখনও হয়নি।
সত্যকামের একটা ব্যাপার আমার বেশ রহস্যজনক বলে মনে হত। প্রতি মাসে একবার কি দুবার সত্যকাম কোলকাতা যেত, জিজ্ঞেস করলে বলত, “কেন, বড়বাবার কাছে যাচ্ছি।” বলার ধরন দেখে মনে হয়েছিল যে সত্যকাম বোধ করি ধরেই নিয়েছে যে এই ‘বড়বাবা’ ব্যক্তিটি কে, তা আমি জানি। আমি লোককে তাদের জেঠিমাদের বড়-মা, কাকীমাদের ছোট-মা বলতে শুনেছি, কিন্তু বড়বাবা কথাটা খুব একটা শোনা যায় না। ভাবলাম, বড়বাবা মানে কি তাহলে সত্যকামের জ্যাঠামশায়? সত্যকামের অনুপস্থিতিতে অরুণকে একবার জিজ্ঞেস করলাম, অরুণ “ওই প্রসঙ্গটা থাক্” বলে ব্যাপারটা এড়িয়ে গেল। বুঝলাম যে অরুণ ব্যাপারটা জানে, আর যেহেতু ব্যাপারটা অরুণ জানে, তাই সত্যকাম ধরে নিয়েছে যে আমিও জানি।
অরুণ ব্যাপারটা আমাকে না জানালেও আমি আমার অন্য এক বন্ধু রঞ্জিতের কাছ থেকে ব্যাপারটা শেষমেষ জানতে পারি। রঞ্জিৎ প্রাইমারি ও হাইস্কুলে আমাদের সাথে পড়েছে, রামপুরহাটের নিকটস্থ যে গ্রামে সত্যকামের বাড়ী, তার অনতিদূরেই ছিল রঞ্জিতের মামারবাড়ী। সেই সূত্রেই রঞ্জিৎ আর সত্যকাম ছোটবেলার বন্ধু। বাড়ী গিয়ে রঞ্জিতের সাথে দেখা হতে ওকে এই বড়বাবার ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করতে ও যেটা বলল, তার নির্যাস এইরকম: আজ থেকে অনেক বছর আগে কোলকাতার এক খুব ধনীগৃহের সুদর্শন এক তরুণ এক পরম রূপসী বারাঙ্গনার প্রেমে পড়েছিলেন। প্রেম ছিল দ্বিপাক্ষিক। সেই প্রেমের সূত্র ধরে সেই বারাঙ্গনার গর্ভে আসে তাঁদের সন্তান। সেই সন্তানই সত্যকাম। ধনীগৃহের সেই সুদর্শন তরুণ চাইলেও সমাজ ও পরিবারের চাপে তাঁর প্রেমিকা সেই বারাঙ্গনাকে বিবাহ করতে পারেননি। কিন্তু তাই বলে তাঁর সন্তানকে এক্কেবারে ফেলে দিতেও পারেননি। কথায় বলে, অপত্যস্নেহ বড় বিষম বস্তু। তিনি তাঁর টাকাপয়সা অকাতরে তাঁর এই সন্তানের স্বার্থে ব্যয় করতেন। সত্যকাম যখন বেশ খানিকটা বড় হয়েছে, তখন এক সহৃদয় পুলিশকর্মী সেই বারাঙ্গনার প্রেমে পড়ে তাঁকে বিবাহ করে সমাজের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনেন এবং সত্যকামকে কাগজে-কলমে নিজের সন্তান বলে স্বীকৃতি দেন। সত্যকাম তার মায়ের আদেশ অনুযায়ী সেই পুলিশকর্মীকে বাবা বলে ডাকত, আর তার ক্ষেত্রজ পিতাকে ডাকত ‘বড়বাবা’ বলে।
কোনও বন্ধুত্বই ততক্ষণ অবধি খাঁটি সোনায় রুপান্তরিত হয় না, যতক্ষণ অবধি না তা কলহ ও মনোমালিন্যের আগুনে পোড়ে। এই অগ্নিপরীক্ষায় যদি বন্ধুত্ব উত্তীর্ণ হতে পারে, তবেই তা চিরস্থায়ী হয়। আমাদের মধ্যেও একবার তুমুল ঝগড়া হয়েছিল, প্রিন্সেস্ ডায়ানাকে নিয়ে। তার মানে অবশ্য এই নয় যে প্রিন্সেস ডায়ানাকে কে বিয়ে করবে, তাই নিয়ে দুই নাইটের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। সত্যকাম ছিল প্রিন্সেস্ ডায়ানার অন্ধ ভক্ত, তার বিছানার পাশের দেওয়ালে ডায়ানার একটি হাসিমুখের ছবি সে টাঙিয়ে রেখেছিল। ডায়ানাকে নিয়ে সত্যকাম কখনও কখনও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ফেলত। আমি চুপ করে শুনতাম, কিন্তু কোনওদিন এই ব্যাপারে কিছু বলতাম না। একদিন সত্যকাম সরাসরি জিজ্ঞেস করেই বসল, “তোতন, প্রিন্সেস্ ডায়ানা সম্বন্ধে তোমার কি মত?”
আমি বললাম, “কিছু না। ইংরেজরা হুজুগে জাতি, আর ওকে নিয়ে মাতামাতিটাও সেই হুজুগেরই পরিণাম। ওই রাজপরিবারটা না হোমে লাগে, না যজ্ঞে। খালি পাবলিসিটি স্টান্ট দেওয়া। আর স্বর্গীয় প্রিন্সেসও আমাকে কোনওভাবে প্রভাবিত করেন না।”
“তুমি সম্পূর্ণ ভুল বললে,” গলার পারদ কিছুটা চড়িয়ে বলল সত্যকাম, “ডায়ানার প্রভাব সারা বিশ্ব জুড়ে। শি ওয়াস্ এ রিয়েল ট্র্যাজেডি কুইন।”
“না, এক্কেবারেই নয়, ভুল তুমি করছ,” আমারও গলার স্বর উচ্চগ্রামে উঠল, “ট্র্যাজেডি কুইন! আর হাসিও না। কিসের ট্র্যাজেডি শুনি? ছত্রিশ বছরের জীবন ভোগবিলাসে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। স্বামীর ভালোবাসা পাননি তো কী, বিশ্বের তাবড় তাবড় সেলিব্রিটি হ্যান্ডসাম পুরুষদের সাথে প্রেম করেছেন, সবচেয়ে বিলাসবহুল রিসর্টে, ছুটি কাটানোর জায়গাগুলোতে নিজের পছন্দের পুরুষদের শয্যাসঙ্গী করেছেন। বিশ্বের সব দেশের পলিটিক্যাল লিডারদের সাথে ওঠাবসা করেছেন —- এগুলো বুঝি ট্র্যাজিক জীবনের লক্ষণ? ওনাকে ট্র্যাজেডি কুইন না বানালে মিডিয়া তো খবর বেচে খেতে পারবে না। ট্র্যাজেডি কাকে বলে জান? আফ্রিকাতে কোনও মহিলা সন্তানের জন্ম দিয়ে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে, হে ভগবান, ওকে তোমার কাছে ফিরিয়ে নাও। খাবার জলের আকাল, মা নিজেই জল না খেয়ে বেঁচে আছে, বুকে দুধ হবে কোথা থেকে? দুধ খেতে না পেয়ে বাচ্চাটা ছঠফঠ করতে করতে মায়ের কোলে মরে যায়। মা ধন্যবাদ জানায় ভগবানকে, আর চারদিক থেকে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে অজস্র শকুন। ট্র্যাজেডি একে বলে সত্য। কই, সেরকম কোনও আফ্রিকার মায়ের ছবি তো তুমি দেওয়ালে টাঙাও না। আর টাঙাবেই কেন? ওই জোসেফ স্ট্যালিন বলেছিল না, A single death is a tragedy, a million death is statistics.”
আমার যুক্তিতে পরাস্ত হয়ে সত্যকাম চুপ করে গেল বটে, কিন্তু এরপর পাক্কা তিন সপ্তাহ আমার সাথে কোনও কথা বলল না। আমি যেন কিছুই হয়নি, এমন ভাব করে একতরফা ভাবে কথা চালিয়ে ওর উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে চললাম। শেষ অবধি তিন সপ্তাহ পর ও নতজানু হতে বাধ্য হল। কথাবার্তা শুরু হল আবার আগের মত, ঘরের দমবন্ধ করা পরিবেশ কেটে গিয়ে খোলা জানালা দিয়ে ফুরফুরে বাতাস ঘরে ঢুকল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার যেটা হল, সেটা এই যে সত্যকাম দেওয়াল থেকে ডায়ানার ছবিটা সরিয়ে দিল। আমি বললাম, “সত্য, আমি তোমাকে আঘাত দিয়ে কথাগুলো বলতে চাইনি, তাই চুপ করে থাকতাম। সেদিন তুমি অত করে ধরলে, তাই বলে ফেলেছি। আয়্যাম সরি। তুমি ছবিটা সরিও না।”
সত্যকাম বলল, “না, সেরকম কিছু নয়। আসলে যে কোনও ব্যাপারকেই যে একাধিক অ্যাঙ্গেল থেকে দেখা যেতে পারে, সেটা সেদিন তুমি বলতে বুঝলাম।”
সত্যকাম অবশ্য এর বদলা নিয়েছিল। ওর কলেজের এক বন্ধু প্রায়ই আমাদের মেসে আসত সত্যকামের সাথে দেখা করতে। একদিন সে এসেই বলল, “একি তোতন, ডায়ানার ছবি যে উধাও দেখছি!”
সত্যকাম বলে উঠল, “সে আর বোলো না রাহুল, সে এক কাণ্ড। তোতন তো ডায়ানার অন্ধ ভক্ত, ওর খাটের মাথার দিকে দেওয়াল নেই বলে আমার খাটের পাশের দেওয়ালে তোতনই ডায়ানার ছবিটা লাগিয়েছিল আমায় বলে কয়ে। আর গত সপ্তাহে তো…..কি বলব তোমাকে, কোথা থেকে ডায়ানার একটা লাল রঙের বিকিনি পরা ছবি এনে আগের ছবিটার উপর আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিল। আমার তো চক্ষু চড়কগাছ, অনেক বোঝালাম, বললাম যে আমাদের মেসের মালিক দিনে পাঁচবার নামাজ পড়া মুসলমান, উনি এসব দেখলে আমাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করবেন। সে কে শোনে কার কথা, ডায়ানার প্রেমে তোতন তখন জান দিতেও প্রস্তুত, নিতেও প্রস্তুত। শেষমেষ অনেক বলে বুঝিয়ে রাজী করিয়ে ওই বিকিনির ফটোটা তুলে ফেললাম দেওয়াল থেকে, কিন্তু আঠা দিয়ে লাগিয়েছিল বলে ওটার সাথে তলায় লাগানো আগের ছবিটাও ছিঁড়ে উঠে এল। সেই রাগে তো তোতন আমার সাথে কথাই বলছে না। তুমি একটু বলে দ্যাখো, যদি তোমার কথা শুনে রাগ পড়ে।”
রাহুল আমার দিকে ফিরে বলেছিল, “বাব্বা, তোতন যে এমন ছেলে, তা তো জানতাম না!”
সত্যকামের জীবনে প্রকৃত প্রেম এসেছিল। মেয়েটি ওর গ্রামেরই, নাম পম্পা। এই চিরণ্টীর কথা সত্যকাম আমাকে কয়েকবার বলেছিল; পম্পা সত্যকামের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলত, সত্যকাম বাড়ী গিয়ে ওকে দেখা করতে বললে দেখাও করত। তথাপি সত্যকামের মনে সন্দেহ ছিল যে পম্পা ওকে ভালোবাসে কি না। ব্যাপারটা হয়েছিল এই যে ওরা পরস্পরকে ছোটবেলা থেকেই চিনত, কেউই কাউকে অপছন্দ করত না। তবে কিনা অপছন্দ না করা মানেই যে ‘পছন্দ করা’, তা তো নয়; তাই ব্যাপারটাকে সত্যকাম গ্রামে থাকাকালীন সেভাবে পাত্তা দেয়নি। কিন্তু গ্রাম ছেড়ে অচেনা বড় শহরে প্রথমবার আসার পর প্রাথমিক পর্যায়ে যখন একটা একাকীত্ববোধ আর অবসাদ সদ্যযুবকদের গ্রাস করে, সেই সময়টায় সত্যকাম প্রবলভাবে পম্পাকে স্মরণ করত। তখনই তার এই বোধোদয় হয় যে এই যুবতীকেই সে ভালোবাসে।
এইভাবে বছরখানেক কেটে গেল। একবার সত্যকাম বাড়ী গেল, যথারীতি দিনদশেক কাটিয়ে মেসে ফিরল। দেড়-দুমাস অন্তর একবার বাড়ী যেত, কয়েকটা দিন থেকে ফিরে আসার পর বেশ কিছুদিন বাড়ীর জন্য মন খারাপ থাকত ওর, এই সময়টায় চুপচাপ থাকত, বিশেষ কথা বলতে চাইত না। আমিও ওকে দরকার না পড়লে বিরক্ত করতাম না। কিন্তু এবার ফেরার পর সত্যকামের অন্য রূপ দেখলাম। ও দুপুরে যখন বাড়ী থেকে মেসে ফিরেছিল, তখন আমি ইন্সটিট্যুটে। বিকেলে আমি রুমে ঢুকতেই বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস নিয়ে দৌড়ে এসে আমাকে বলল, “কী হল, তোমার ফিরতে এত দেরী হল? কখন থেকে অপেক্ষা করছি তোমার জন্য!”
“ব্যাপার কী?” আমি ব্যাগটা খাটের উপর রেখে কপট গাম্ভীর্য্য দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“আমি ওর হাত ধরেছি। সে যে কী অনুভূতি, সে তোমাকে বোঝাই কেমন করে তোতন।”
আমি বললাম, “অত বোঝাতে হবে না, যা বোঝার সে আমি বুঝে নেব, তুমি বলে যাও। তা কোথায় হাত ধরলে, সিনেমা হলে নাকি?”
সত্যকাম বলল, “আরে নান্না, ওখানে সিনেমাহল আছে নাকি ছাই? সেচের জন্য ওই বড় খালটার উপরে যে সাঁকোটা আছে, সেখানে। ও কাঠের রেলিং-এর হাতলের উপর ওর হাতটা রেখে দাঁড়িয়েছিল।”
আমি বললাম, “সব খুলে বলবে, না কানের গোড়ায় একটা দেব?”
সত্যকাম বলল, “তোমাকে তো বলেইছি, গ্রামে যাবার আগে চিঠিতে ওকে জানিয়ে রাখি, ও সেইমত আমি স্টেশনে নামলেই দেখা করে। এবার স্টেশনে দেখা হতেই বিকেলে ওকে সাঁকোটার কাছে দেখা করতে বলেছিলাম। ও আসতেই দুজনে সাঁকোটায় উঠে মাঝবরাবর গিয়ে দাঁড়ালাম। দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রেলিংয়ের উপর ভর দিয়ে খালের উপর সুজ্জাস্ত দেখছি, ওর বাঁ হাত আমার ডান হাতের ঠিক পাশে। আমি সাহস করে আমার হাতটা ওর হাতের উপর রাখলাম।”
“তারপর?”
“আশ্চর্যের কথা কি জান তোতন, ও কিন্তু হাতটা সরিয়ে নিল না।”
“তারপর?”
“পাক্কা দু মিনিট ওর হাতটা ওইভাবে ধরে ছিলাম।”
“তারপর?”
“তারপর? তারপর না, আমার নিজেরই কেমন অস্বস্তি হল, ও কিছু বলছে না দেখে আমিই হাতটা সরিয়ে নিলাম। পম্পা জিজ্ঞেস করল, ‘কি হল?’ আমি কোনও উত্তর দিতে পারলাম না। ও হেসে আমার মাথায় একটা আলতো করে চাঁটি মারল।”
মুখে কিছু বললাম না, মনে মনে ভাবলাম, সেই বাঁধাগৎ পোসেনজিৎ-রিতুপণ্ণা টাইপ চিত্রনাট্য রিপিট করে দিল ছেলেটা। তাও ভাল যে ব্যাপারটা প্লেটোনিক লেভেল থেকে সোমাটিক লেভেলে পৌঁছেচে।
“তাহলে কি করা উচিৎ বল তো?” সত্যকাম আমায় জিজ্ঞেস করল।
আমি বললাম, “আজ থেকে অনেক বছর আগে কোনও এক মহাপুরুষ বলেছিলেন, প্রেম একটা অনুভূতি, আর তা সব সময়ই পবিত্র। তাই সেই অনুভূতি যদি সাঁকোর শুকনো কেঠো হাতল বেয়েও আসে, তাকে শ্রদ্ধা ভরে গ্রহণ করতে শেখো।”
সত্যকাম শুনে হেসে ফেলল।
এবার আর দেড়-দুমাস নয়, ঠিক তিনদিন পরই বাড়ী চলে গেল ও, ফিরল পাক্কা আটদিন পর। আর ফিরেই জানাল, পম্পা ওর সাথে প্রেম, বিয়ে সব করতে রাজী হয়েছে।
আমি মান্না দে’র গান প্যারোডি করে গেয়ে উঠলাম, “সাঁকোর উপর আমি, আমার পাশে তুমি/ নীচ দিয়ে খাল ওই বয়ে চলে যায়।”
আমরা তিনজন মেসের সেই ঘরে একসাথে ১ বছর ৭ মাস একসঙ্গে ছিলাম। অরুণ বেশীরভাগ সময়টা বাড়ীতে থেকে পড়াশোনা করত। ওর অনুপস্থিতিতে সত্যকামের সাথে বইমেলা ঘুরে, ১০৮-শিব-মন্দির দর্শন করে, খান দুই-তিন সিনেমা দেখে আর কথায়-হাসি-ঠাট্টায়-ইয়ার্কিতে দেখতে দেখতে এই ১ বছর ৭ মাস কেটে গেল। আমার আর অরুণের বাড়ী একই শহরে, অরুণের দিদির বিয়েতে এসে সত্যকাম আমাদের বাড়ী এসেছিল, আমার মার ওকে খুব পছন্দ হয়েছিল। তারপর থেকে আমি বাড়ী এলেই ও আমাকে আগাম বরাত দিয়ে রাখত, “তোতন, বাড়ী থেকে আসার সময় কাকীমার করা লুচি-আলুচচ্চড়ি নিয়ে আসবে কিন্তু, নইলে ঘরে ঢুকতে দেব না।”
আমি যেহেতু অরুণ আর সত্যকামের চেয়ে এক শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে ছিলাম, তাই আমার এক বছর আগেই কৃতিত্বের সাথে গ্র্যাজুয়েশনের পড়া শেষ করে সত্যকাম আর অরুণ মেস ছেড়ে চলে গেল। অরুণ গেল দুর্গাপুর এন-আই-টিতে এম-সি-এ পড়তে, আর সত্যকাম কোম্পানি সেক্রেটারিয়েটশিপ পড়ার জন্য বর্দ্ধমানেরই ভাতছালায় একটা গোটা রুম ভাড়া করে থাকতে চলে গেল। ওদিকে এই একই সময়ে মেসের মালিক মেস উঠিয়ে দিলেন এক কর্পোরেট সংস্থাকে পুরো জায়গাটা ভাড়া দেবেন বলে। তুলসী চক্কোত্তি আবার তার চামড়ার স্যুটকেশ আর শতরঞ্চি জড়ানো তোষক-বালিশ বগলদাবা করে গিয়ে নতুন আস্তানা গাড়লেন বর্দ্ধমান ইস্টিশানের কাছে একটি ঘরে, যেখানে তার রুমমেট হল তারই ইন্সটিট্যুটের দুই সহপাঠী।
সত্যকাম আর অরুণের সাহচর্য্য হারানোর পর বর্দ্ধমানে থাকতে আর মোটে ভাল লাগত না, মনে হত কোনওরকমে ঠাকুর-ঠাকুর করে আর একটা বছর পার করে দিলেই এখান ছেড়ে যাওয়া যাবে, তাই দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করতে লাগলাম। সত্যকামের ভাতছালার সেই ঘরে একবার আমি গেছিলাম। বিকেলে গেছি, কিন্তু দুই বন্ধুতে গল্পে এমনই মশগুল হয়ে পড়েছিলাম যে কখন যে রাত হয়ে গেছিল, খেয়ালই করিনি। সেই সন্ধ্যেটার কথা ভুলব না কখনও, পুরো সন্ধ্যেটা কেটেছিল আমাদের একসাথে থাকা সেই ১ বছর ৭ মাসের স্মৃতিচারণা করে।
ধীরে ধীরে শেষ একটা বছরও কেটে গেল, কোর্স শেষ করে আমি বর্দ্ধমান ছেড়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেল। বাবা চাকরি থেকে অবসর নিলে আমরা রেল কোয়ার্টার্স ছেড়ে চলে এলাম অনেকটা দূরের এক নতুন শহরে। বেশ কয়েকটা বছর বেকার বসে থাকার পর একটা চাকরিও জুটলো। সন্তোষের সাথে প্রথম প্রথম যোগাযোগটা ছিল চিঠির মাধ্যমে। ও চিঠিতে ওর পড়াশোনার খবর দিত, পম্পার সাথে শালীনতার সীমা বজায় রেখে হয়ে চলা সম্পর্কের অগ্রগতির বর্ণনাও থাকত চিঠিতে। থাকত আমাদের একসাথে কাটানো সেই সোনার দিনগুলোর ভরপুর স্মৃতিচারণা। সবশেষে আমার খবর জিজ্ঞেস করে এবং আমার মা-বাবাকে প্রণাম জানিয়ে চিঠি শেষ হত। আমিও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতাম। পরে যখন হাতে মোবাইল ফোন এল, তখন ব্যাপারটা আরও সহজ হয়ে গেল। আমি চিঠিতে ওকে আমার নম্বরটা জানালাম, আর সেই চিঠি পড়া শেষ হতেই অচেনা একটা নম্বর থেকে চলে এল আমার খুব চেনা সত্যকামের ফোন।
আজ অস্বীকার করার উপায় নেই যে এই ফোন-করে-কথা-বলার পর্বটা শুরু হবার পর আমার তরফে যোগাযোগ রক্ষায় কিঞ্চিৎ গা-ছাড়া মনোভাব এসে গেছিল। নতুন চাকরির জায়গায় প্রাথমিক পর্যায়ের চাপ এবং মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা, মূলতঃ এই কারণেই এটা হয়েছিল; তাছাড়া মনে হত, ফোন তো হাতেই রয়েছে, যখন খুশী করা তো যেতেই পারে। সত্যকাম তখন একটা চাকরি নিয়ে বারাসাতে, ফোনটা বেশীরভাগ ওই করত।
আজ বুঝি, তার বন্ধুপ্রীতির মূল্য আমি দিতে পারিনি, সে তার ভালোবাসা অপাত্রে দান করেছিল।
২০০৮ সালের জুনের মাঝামাঝি সত্যকাম ফোন করল। অরুণকে সে প্রাণাধিক ভালোবাসত, আমাদের দূরভাষে কথোপকথনের অধিকাংশটাই হত অরুণকে নিয়ে। ছোট থেকেই অরুণ পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী, আমি জানালাম যে অরুণ অফিসের কাজে ৬-৭ মাসের জন্য লন্ডনে গেছে। সত্যকামের উচ্ছ্বাস বাঁধভাঙ্গা হয়ে উঠল। বলল, “দেখেছ, শয়তানটা জানায়ওনি। ফিরুক একবার, তারপর খবর নিচ্ছি ওর। তবে যাই বল, আমাদের তিনজনের মধ্যে যোগ্যতম হিসেবেই কিন্তু বিদেশ গেল ও।”
আমি বললাম, “বিয়েটা কর এবার। দুজনে মিলে সারাটা জীবন সাঁকোর উপরেই কাটিয়ে দেবে নাকি?”
সত্যকাম বলল, “আমি আজ বললে পম্পা আমায় গতকাল বিয়ে করে নেবে। কিন্তু আমি কি করে করি বল তো! ওকে আমি পৃথিবীর সব সুখ দিতে চাই, আর এখানে যা মাইনে পাই, সেই টাকায় সেটা সম্ভব নয়। এখানে চাকরিটা নিলাম অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য। এরপর একটা ঠিকঠাক চাকরি জোটাতে পারলেই তোমাদের বিয়ের কার্ড পাঠাব। আর হ্যাঁ, বেশী কথা ঘুরিও না। ফোন তো এখন আমি একাই করি, তোমরা দুজনে তো সত্যকামকে ভুলেই গেলে।”
আমি কথা দিলাম যে এরপর থেকে আমি প্রতি মাসে ফোন করব।
জুলাই মাসের শেষ দিক, একদিন ভাবলাম, আজ অফিস থেকে ফিরে সত্যকামকে ফোন করব। কিন্তু সে আর হল না। বিকেলে অফিসের বস্ ডেকে বললেন যে আমাকে দিনকয়েকের মধ্যেই ব্যাঙ্গালোর যেতে হবে। ব্যাস্, হয়ে গেল। অফিসে একগাদা কাগজ ও অন্যান্য জিনিস গোছানোর চাপ, ঘরে ফিরে নিজের ব্যাগ গোছানো……..প্রকৃত ব্যস্ততার মাঝে সত্যকামকে ফোনটা আর করা হয়ে উঠল না। ভাবলাম, ব্যাঙ্গালোর পৌঁছেই প্রথম কাজ হবে ওকে ফোন করা। সেইমত ২৯শে জুলাই, ২০০৮ রাতে হাওড়া থেকে যশবন্তপুর এক্সপ্রেসে উঠলাম।
৩০শে জুলাই, ২০০৮। লাঞ্চ সেরে আমি ট্রেনের সিটে বসে ‘ফাইভ পয়েন্ট সাম’ওয়ান’ পড়ছি। জিন্সের পিছনের পকেটে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল। দেখলাম রঞ্জিৎ ফোন করেছে। রঞ্জিতের সাথে সময়ে-অসময়ে প্রায়ই কথা হয়, তাই অবাক হলাম না। ফোন তুলে হ্যাঁ-বল্ বলতেই রঞ্জিৎ বলল, “সৌমিক, কাল সত্যকাম মারা গেছে।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, “কি…..মানে কিব্…কিভাবে?”
উত্তরে রঞ্জিৎ যা বলল, তার সারমর্ম এই : গতকাল অফিসে কাজ করতে করতে সত্যকামের হঠাৎই অস্বস্তি লাগতে শুরু করে, কিছুক্ষণ পরেই ও সহকর্ম্মীদের অনুরোধ করে ওকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে। ওর মত সুস্থ ছেলেকে এরকম কথা বলতে দেখে সহকর্ম্মীরা বেশ চিন্তায় পড়ে যান, ওঁরা তড়িঘড়ি ওকে বারাসাত হাসপাতালে নিয়ে যান। ডাক্তারের সন্দেহ হওয়ায় তিনি সময় নষ্ট না করে চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালে রেফার করেন। সেখানে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তৎক্ষণাৎ ওর রক্তের নমুনা পরীক্ষা করেন এবং ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই সত্যকাম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। সত্যকামের বাবা দাহকার্য সেরে বাড়ীতে ফিরে রঞ্জিৎকে ফোন করে খবর দিয়েছেন।
যে ১ বছর ৭ মাস সত্যকামের সঙ্গে কাটিয়েছি, তার মধ্যে একবারও সত্যকামের সর্দ্দি অবধি হতে দেখিনি।
ট্রেন কোনও একটা স্টেশনে থামল। আমি আমার হাতে ধরা ‘ফাইভ পয়েন্ট সাম’ওয়ান’ অসমাপ্ত অবস্থায় সিটে নামিয়ে রাখলাম। সামনের সিটে এক ভদ্রলোক বসে ছিলেন, বইটা দেখে হেসে বললেন, “এই বইটা তো খুব হইচই ফেলে দিয়েছে। আমার মেয়ের বায়না, আমাকে কিনিয়েই ছাড়ল। ওর পড়া হয়ে গেলে আমিও পড়ে দেখলাম, আমারও বেশ লাগল।” শুনে আমি শুষ্ক হাসি হাসলাম। ভদ্রলোক না থেমে বললেন, “হোস্টেলের এক রুমে থাকা তিন বন্ধুর গল্প তো?”
“এক রুমে থাকা তিন বন্ধুর গল্প” — এই কথাটা শুনে আর স্থির থাকতে পারিনি, কোনওরকমে ভদ্রতাসূচক ‘হ্যাঁ’ বলে ছুটেছিলাম ওয়াশরুমের দিকে, চোখের জল লুকোতে। ওয়াশরুমে গিয়ে চোখেমুখে জলের ছিটে দিতে শুরু করলাম, মনের গহনে দ্রুতগতিতে চলতে শুরু করল এক ছায়াছবি, যার প্রধান তিন চরিত্র সত্যকাম, অরুণ আর আমি; মনের গহীনে নেপথ্যে বাজতে লাগল ভারত কাঁপানো এক গানের সেই সহজ সরল লাইনগুলো : তেরি হর এক বুরাই পে ডাঁটে উও দোস্ত্, গম কি হো ধুপ তো সায়া বনে তেরা উও দোস্ত্, নাচে ভি উও তেরি খুশি মে……
‘ফাইভ পয়েন্ট সাম’ওয়ান’ আমি আর কোনওদিন পড়ে শেষ করতে পারিনি, বইয়ের কপিটা ব্যাঙ্গালোরে DRDO-র যে গেস্ট হাউসে উঠেছিলাম, তার ড্রয়ারে ইচ্ছে করে ফেলে রেখে এসেছিলাম।
হিসাবশাস্ত্রের খাতার প্রতি পাতায় রাতের পর রাত জেগে করে যাওয়া তার সেইসব জটিল হিসেবনিকেশ, সেসব এক লহমায় অর্থহীন হয়ে গেল। কিছুই রইল না। প্রেম, গার্হস্থ্য জীবনের রঙীন স্বপ্ন, কেরিয়ার, বন্ধুত্ব, সর্বোপরি জীবন —- সব অসম্পূর্ণ রেখে সত্যকাম চলে গেল।
আমি শ্রীকান্ত হলে সে ছিল আমার ইন্দ্রনাথ, আমি চন্দ্রবরদাই হলে সে ছিল আমার পৃথ্বীরাজ, আমি জেমস্ বসওয়েল হলে সে ছিল আমার ডক্টর স্যামুয়েল জনসন।
ওয়ার্ডসওয়ার্থ ক্লাসিকস্ থেকে প্রকাশিত ডেভিড কপারফিল্ডের হলুদ হয়ে যাওয়া আনঅ্যাব্রিজড্ এডিশনটা (যেটা বর্দ্ধমান বইমেলায় সত্যকামের সাথে গিয়ে কিনেছিলাম) দেখলে সত্যকামের কথা মনে পড়ে, পম্পা নামের কোনও মেয়েকে দেখলে সত্যকামের কথা মনে পড়ে, ছানার জিলাপি আর কিংকং সাইজের গুড়ের রসগোল্লা দেখলে সত্যকামের কথা মনে পড়ে…….আর মনে পড়ে প্রিন্সেস্ অফ্ ওয়েলস্ ডায়ানার ছবি দেখলে। আমি সত্যকাম ও ডায়ানার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছি। আশা করি এখন ওরা দুজনে রোজ গল্প করে। কে জানে, সত্যকাম হয়তো রূপকথার সেই রাজকন্যের কাছে আমার নামে নালিশও করে দিয়েছে।
আর সত্যকামকে মনে পড়লেই মনে পড়ে গুলজার সাহাবের লেখা একটি গানের একটি ছত্র: “কিতাবোঁ সে কভি গুজরো তো য়্যুঁ কিরদার মিলতে হ্যাঁয়।” আমার নড়বড়ে বাংলা অনুবাদে যা এইরকম:
“গ্রন্থসরণী দিয়ে কভু তুমি হাঁটো যদি একা একা,
এই ধরনের কিছু চরিতের মিলে যেতে পারে দেখা।”
1 Comment