আমাদের ছোটো নদী

আমাদের ছোটো নদী – ওলেনট্যাঞ্জি: প্রবাস, মাতৃভাষা, ও আমার সন্তান

“আমাদের ছোটো নদী” – ওলেনট্যাঞ্জি

২০১২ সালের শরৎকালে আমেরিকার ওহায়ো রাজ্যের কলম্বাস শহরে তোলা একটি ভিডিয়ো। তাতে দেখা যায় একটি ছোট্ট ছেলে ও তার মা-কে। ছেলেটি একটি অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। মা তাকে ধরার চেষ্টা করছেন, আর নিষ্ঠাভরে, প্রাণপণে শেখাতে চাইছেন “আমাদের ছোটো নদী” – সহজ পাঠের সেই সুন্দর কবিতাটি, যা কয়েক প্রজন্মের বাঙালি শৈশবের একেবারে মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে। তিনি ছেলের পিছনে ছুটছেন, তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, আর বারবার বলছেন, “বলো, আমাদের ছোটো নদী।” ছোট্ট ছেলেটি ছুটে বেড়াতে বেড়াতে কখনো হেসে গড়িয়ে পড়ছে, কখনো দুষ্টু মুখভঙ্গি করছে, আর দুরন্ত পায়ের গতির সঙ্গে যেন তাল মিলিয়ে ছুটছে তার কথার ফোয়ারা। সেই ফোয়ারায় অনেক শব্দের বিন্দু আছে – স্পষ্ট, আধো, শেখা, মনগড়া নানান বুলি। শুধু নেই “আমাদের ছোটো নদী।” 

ছেলেটির বাবা-মা বাঙালি, তাঁরা জন্মেছেন ও বড় হয়েছেন কলকাতায়, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসূত্রে আমেরিকায় থাকেন। ছেলেটি জন্মেছে কলম্বাস শহরেই; জন্মসূত্রে সে আমেরিকান। আড়াই বছর বয়সে প্রতিদিন গুচ্ছ গুচ্ছ নতুন শব্দ কুড়িয়ে-বানিয়ে তার ছোট্ট জিভ চেষ্টা করে দ্রুতগামী মনের সঙ্গে তাল রাখতে। মার সাধ্য কী, তার নাগাল পান! সেদিন বিকেলের দৈনন্দিন ক্যামেরা শুধু ধরে রেখেছে একটি মনে রেখে দেওয়ার মত চিরন্তন মুহূর্ত। হঠাৎই দৌড়ের মাঝখানে সে থেমে যায়। একটু সামনে ঝুঁকে, পিছনে ক্যামেরা আর অনুনয়রত মায়ের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি হেসে আধো আধো স্বরে বলে ওঠে, “আমাদের ছোটো নদী – ওলেন-ট্যাঞ্জি!”

ওলেনট্যাঞ্জি। কলম্বাস শহরের মাঝখান দিয়ে ওহায়ো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ঘিরে উত্তরের দিকে বয়ে যাওয়া ঝিরঝিরে ছোটো নদীটি। যে নদীর নামে শহরের বহু ব্যবসা ও বাড়ির নামকরণ হয়েছে – এমনকি জন্মের পর প্রথম যে আবাসন তার ঠিকানা ছিল, তার নাম-ও ওলেনট্যাঞ্জি ভিলেজ। কয়েক মাস বয়স থেকে আবাসনের গা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ওলেনট্যাঞ্জির পাশে পার্কে সে ঘুরতে গেছে, হাঁস দেখেছে, একটু বড় হয়ে খেলেছে। “আমাদের ছোটো নদী” তো তার কাছে ওলেনট্যাঞ্জি-ই! 

স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার চেনা ছোটো নদীর কথা বলে সেদিন আমার ছোট্ট ছেলে যেন আগাম জানিয়ে দিয়েছিল যে ভবিষ্যতে, আমেরিকায় বড় হতে হতে, ও কীভাবে মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে বাঁচবে। কীভাবে সেই ভাষা আর তার প্রকাশগুলোকে আমেরিকান জীবনের প্রেক্ষাপটে মানিয়ে নেবে। আজ ষোল বছরের শান্ত, মিতবাক কিশোর সেই দুষ্টু, দুরন্ত বাচ্চার চেয়ে অনেক আলাদা। কিন্তু আজও সে বাবা-মার সঙ্গে জড়তাহীন বাংলায় মনের কথা বলে। আজকেই, এই লেখা লিখতে বসার একটু আগে, আমার সঙ্গে একটি বিষয়ে মতান্তর হওয়ায় সেই না-হারানো দুষ্টু হাসি-টা হেসে বলেছে, “এটা কি একটা ন্যায্য কথা হল?” 

বয়েসের সঙ্গে ওর বাংলায় কথা বলার দক্ষতা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। যদিও বাংলা পড়া বা লেখার চর্চা কয়েক বছর নিয়মিত শুরু হয়ে থেমে যাওয়ার পর আমি একটু দমে গিয়ে হাল ছেড়েছি। মনের গভীরে এই আশা সযত্নে লুকিয়ে রাখি যে “কোনোদিন শিখবে।” আপাতত মাতৃভাষায় কথা বলার সহজাত ও স্বাভাবিক অভ্যাসটিকে আমরা লালন করি, আদর করি। ও সাবলীলভাবে বাংলা বলে, প্রচলিত শব্দবন্ধ অনায়াসে ব্যবহার করে। উচ্চারণে বিন্দুমাত্র আমেরিকান টান নেই, যদিও আধো-উচ্চারণ এখনো কিছু রয়ে গেছে (যেমন ভাত-কে ভাট না, বরং দুটো-কে দুতো বলে)। বাংলা বলার সময় খুব কম ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে। যারা ওর সঙ্গে কথা বলে বা ওর কথা শোনে, তারা অবাক হয় ওর কথায় “ঝুঁকি,” “স্মৃতি,” “আঁটবে,” “আপত্তি,” “চিত হয়ে শোওয়া,” এমনকি “কাঠবেড়ালি”র মতো শব্দের স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহারে! কোন ক্লাসে পড়ো জিজ্ঞেস করলে বলে “দশ ক্লাসে।” বাড়ির আড্ডায় আমাদের বন্ধুরা ওকে অনুরোধ করে কলকাতার রাস্তার চায়ের দোকানে কীভাবে চা অর্ডার করবে তা অভিনয় করে দেখাতে। নিখুঁত টান আর ভঙ্গিতে ও বলে, “ও কা-কা! দু’কাপ চা-বিশ-কুট দিও তো!” পরিচিতদের মতে কলকাতায় না থেকেও ও কলকাতার অনেক বাঙালি শিশুর চেয়ে ভালো বাংলা বলে।

ওর সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে খুবই আরাম হয়, আর ওকে অনায়াসে চলতি শব্দ ব্যবহার করতে শুনে মজা পাই। মাঝেমাঝে ওর যথাযথ শব্দ ব্যবহারে অবাক-ও হই। সবচাইতে ভাল লাগে যখন পরিবারের ও পরিচিত বয়োজ‍্যেষ্ঠরা, বা কলকাতার সাধারণ পথচলতি মানুষ, বা কলকাতার বাড়িতে যাঁরা কাজ করেন, কাউকে ওর সঙ্গে কথা বলতে ইংরেজি শব্দ খুঁজতে হয় না বা আমাদের অনুবাদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় না। সবাই ফোনে বা সামনাসামনি ওর সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেন, আর ও-ও অবলীলায় নিজের ভাল লাগা, মন্দ লাগা, প্রয়োজন হওয়া, মজা পাওয়া – সব তাঁদের বলে! 

আনন্দ, আরাম, তৃপ্তি হয়, তবে বিশেষ গর্ব অনুভব করি, তা বলব না। তার কারণ একটাই। আমার বর আর আমার মাতৃভাষা বাংলা। সন্তানের সঙ্গে বাংলায় কথা বলা আমাদের কাছে স্বাভাবিক ছিল, তাকে বাংলা “শেখানোর” কোনো “প্রচেষ্টা” ছিল না। কলকাতায় বা পৃথিবীর অন্য কোথাও থাকলেও আমরা আলাদা কিছু করতাম না। শুধুমাত্র সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম দুটো, বিশেষ করে ও কথা বলতে শুরু করার সময়। এক, ওর আশেপাশে আমরা নিজেরা স্বাভাবিকভাবেই কথা বলব, ওর সুবিধে বা বোঝার জন্য নিজেদের কথাবার্তা বদলাব না। আর দুই, বাংলায় ওর সঙ্গে কথা বলাটাকে আমরা সহজ আর মজার করব।  

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস চলে গেল। ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে ইউনেস্কো ভাষাকে সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলা ভাষা নিয়ে বিপ্লব-ই যে মাতৃভাষার এই উদযাপন ও স্বীকৃতির কারণ, তা নিয়ে অহংকার হয় বৈকি। এখানে আমেরিকান সহকর্মী আর বন্ধুদের এই দিন-টির ইতিহাস আর মাহাত্ম্য বোঝাই। আর দুঃখ-ও হয়, যখন খোদ কলকাতায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে “গেল গেল” রব সংবাদ মাধ্যম ও সমাজ মাধ্যম-এর কল্যাণে জানতে পারি। হয়তো এইসব কারণেই লিখতে বসা। তবে এই লেখা কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা বা বিশ্লেষণ নয়, আর সমালোচনা তো নয়-ই। বরং এটি আমার ব্যক্তিগত ভাবনা, অভিজ্ঞতা, এবং আমাদের কয়েকটি ছোটো সিদ্ধান্তের গল্প, যেগুলো দ্বিতীয় প্রজন্মের এক আমেরিকান শিশুর জীবনে সমান ব্যবহৃত দুই ভাষার স্বাভাবিক ও আনন্দময় সহাবস্থান সম্ভব করেছে। 

আমার বর ও আমার ব্যক্তিগত জীবন এবং আমার পেশাগত জীবনের কেন্দ্রে সবসময়ই ছিল ভাষা। “কেন্দ্র” শব্দটি ব্যবহার করা বেশ যথাযথ, কারণ আশি-নব্বই-এর দশকে আমাদের বেড়ে ওঠায় ভাষার স্থান নিয়ে তিনটি সমকেন্দ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক-পারিবারিক বৃত্ত আঁকা যায়। সবচেয়ে বৃহৎ পটভূমি অবশ্যই ঔপনিবেশিকোত্তর ভারতবর্ষ, যেখানে ইংরেজি হল “স্ট্যাটাস সিম্বল,” যা জানলে বেশ কল্কে পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি, এবং মতাদর্শেরর নিরিখে বিপরীতধর্মী, ছিল আরেক বৃত্ত – কমিউনিজম-অনুপ্রাণিত পশ্চিমবঙ্গ, যেখানে ইংরেজিকে “বুর্জোয়া শ্রেণির ভাষা” আখ্যা দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে “বাংলা মাধ্যম” আর “ইংরেজি মাধ্যম”-এ পড়া বাচ্চাদের মধ্যে দূরত্ব আরও বেড়েছিল, এবং ইংরেজি-কেন্দ্রিক “স্ট্যাটাস”-এর বিষয়টি আরও প্রকট হয়েছিল। আর সবচেয়ে নিবিড় বৃত্তটি ছিল আমাদের নিজেদের পরিবার ও ইংরেজি-মাধ্যম বেসরকারি দুটি স্কুল, যেখানে দুজন পড়েছিলাম।

প্রবাসে বাংলা শেখা

আমার বর সাত বছর কাটিয়েছে একটি আবাসিক হিন্দু মিশনারি স্কুলে। স্কুলের লাইব্রেরিতে ইংরেজি, আর বাড়িতে বাংলা সাহিত্যের প্রতি ওর ভালবাসা গড়ে ওঠে। দুই ভাষার শব্দ নিয়ে খেলা আর কৌতুক করা ওর আজীবনের স্বভাব, তা ওর রসবোধের অন্যতম পরিচায়ক-ও বটে। কলেজে পড়ার সময় দেখতাম যে বাংলা আর ইংরেজি ও প্রচুর পড়ে, আর দুই ভাষাতেই ভাল লেখে। ওর ইংরেজি বলাতে জড়তা ছিল। কিন্তু ইংরেজি ভাল লেখা বা প্রচুর পড়া নিয়ে যেমন অহংকার করতে দেখিনি, তেমনি ইংরেজি ভাল বলতে না পারা নিয়ে কোনো হীনমন্যতা ছিল না। উচ্চারণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে বা ভুল হলে অবলীলায় বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করত বা শুধরে নিত। ভাষার দখল আসলে ওর কাছে কোন সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অবস্থানের মাপকাঠি ছিল না। কলেজে আমাকে একবার শেক্সপিয়ার থেকে উদ্ধৃতি দেওয়ায় আমি ধরতে পারিনি বলে বহুদিন অবধি পিছনে লাগত যে রসায়ন নিয়ে পড়েও ও ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী আমার থেকে অনেক বেশি বই পড়েছে। তা অবশ্য আমি তখনো মানতাম, আর এখনো মানি। বিশ্বের নানা প্রান্তের ও নানা বিষয়ে অনবরত বই পড়ার অভ্যাস ওর এখনো আছে। ভাষা ওর কাছে নিখাদ আনন্দ আর বোঝাপড়ার জায়গা।

আমি যে রবীন্দ্র-অনুপ্রাণিত স্কুলে পড়েছি, সেখানে মাতৃভাষা ও ইংরেজি, দুটোরই বানান, ব্যাকরণ, উচ্চারণ ও ব্যবহার খুব যত্নের সঙ্গে শেখানো হত। দুই ভাষারই বয়সপোযোগী সাহিত্য, গান, ইতিহাস ছিল দৈনন্দিন স্কুলজীবনের অঙ্গ। ক্লাস টেন অবধি আমি সংস্কৃত শিখেছি। পরে একটি কড়া ইংরেজি-মাধ্যম, বা যাকে বলে “ট্যাঁশ” স্কুলে এগারো-বারো ক্লাসে পড়ার সময়, স্রেফ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার জন্য ইংরেজি-তে একনাগাড়ে কথা বলা আয়ত্ত করেছিলাম। বাবা তাঁর প্রজন্মের একজন বিশিষ্ট কবি হওয়ায় প্রথিতযশা কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী দের সঙ্গে নিত্য ওঠাবসা ছিল। আর মা ছিলেন একজন একনিষ্ঠ পাঠক ও আলোচক। তাঁর বাংলার প্রতি ভালবাসা এতটাই গভীর যে অবসরের পরে, ষাটোর্দ্ধ বয়েসে তিনি বাংলায় একটি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। আমার ছোটোবেলা নিবিড়ভাবে ভরা ছিল বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য-সঙ্গীতে। দুই ভাষার প্রতিই শ্রদ্ধা আরও দৃঢ় হল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়তে গিয়ে। একাধিক অধ্যাপকের সান্নিধ্যে এলাম, যাঁরা ইংরেজি সাহিত্যের পণ্ডিত হয়েও নিখুঁত বাংলায় নিয়মিত প্রখ্যাত সাহিত্যপত্রিকায় লিখতেন। ক্লাসে মুগ্ধ হয়ে আমি তাঁদের কাছে ম্যাকবেথ বা প্যারাডাইস লস্ট পড়তাম, আর ক্লাসের বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময়ে তাঁদের করা সমালোচনা বা অনুবাদ নিয়ে কথা বলতাম। 

দুটি ভাষার প্রতি নিজেদের গভীর ভালবাসা থেকে, ও একটি থেকে আরেকটিতে অনায়াস যাতায়াত করার এই ক্ষমতা চাক্ষুষ করে, আমাদের মনে যেন বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছিল যে কেউ একটি ভাষায় স্বচ্ছন্দ ও আত্মবিশ্বাসী হলে অন্য ভাষাও চাইলে সহজেই আয়ত্ত করতে পারে। হয়তো এই কারণেই আমরা কখনও ভয় পাইনি যে বাংলায় কথা বললে আমাদের ছেলে ইংরেজিতে কথা বলতে শিখবে না। মনে পড়ে যে ও জন্মানোর কয়েক মাস পরে আমি কথাচ্ছলে এক বন্ধুকে বলেছিলাম যে ও বাংলায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারলে আমি ততটাই আনন্দ পাব, যতটা অনেক বাঙালি মা তাঁদের সন্তানের “স্পোকেন ইংলিশ” নিয়ে পান।

কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও উপায়-টিকে সচেতনভাবে তৈরি করতে হয়েছিল বইকি। প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল ভাষাকে “নাম” দেওয়া। দু’বছর বয়সে “ভাষা” কী জিনিস, তা নিয়ে ওর কোনো ধারণাই ছিল না – “বাংলা” আর “ইংরেজি” ছিল কেবল দুটো শব্দ। আমরা তাই ভাষাগুলোর নাম দিলাম “বাড়ির কথা” আর “স্কুলের কথা।” ভাষাকে তার ব্যবহারের স্থান দিয়ে চিহ্নিত করা হল বটে, তবে তার পাশাপাশি ও সেগুলি ব্যবহারের পাত্রদের-ও আলাদা করতে পারল। শিশুরা খুবই বুদ্ধিমান। একাধিক ভাষার সূক্ষ্মতা সহ নানা বিষয় নিজেরাই বুঝে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ওদের আছে। হয়তো আমরা বড়রাই নিজেদের গণ্ডীগুলো দিয়ে ওদের সীমিত করে ফেলি। আমরা বাড়িতে শুধু বাংলা বলতাম, আর বাংলাভাষী পরিচিতদের সঙ্গে বাইরেও। কদিন বাদেই দেখলাম যে ও অনায়াসে বাংলাভাষীদের সঙ্গে “বাড়ির কথা” বলছে, আর বাইরের সবার সঙ্গে “স্কুলের কথা।” এমনকি বাঙালি ও অবাঙালি বন্ধুরা যেকোনো জায়গায় একসঙ্গে থাকলে ও নিজে থেকেই বুঝে নিচ্ছে কার সঙ্গে “বাড়ির কথা” আর কার সঙ্গে “স্কুলের কথা” বলতে হবে। এই প্রসঙ্গে মনে আছে একটা মজার ঘটনা। যেহেতু আমেরিকায় বাড়ির বাইরে ও সাধারণত ইংরেজি শুনত ও বলত, ওর সাড়ে তিন বছরে কলকাতায় এসে প্রথমদিন জুতোর দোকানে এক অচেনা ভদ্রলোক ওর সঙ্গে বাংলায় কথা বলায় খুব অবাক আর খুশি হয়ে আমাকে বলেছিল, “মা, কাকু বাড়ির মতো কথা বলল!” এবং সেবার রাস্তায়, বাজারে, রেলস্টেশনে, পরিচিতদের বাড়িতে, ও যে কী অনর্গল বকবক করেছিল! 

আমেরিকায় আমাদের চারপাশের মানুষেরাও বেশ সাহায্য করেছেন এ বিষয়ে। যখন প্রথম ও কথা বলতে শুরু করেছে, সেই সময় নাগাদ ও ডে-কেয়ারেও যেতে শুরু করে। আমরা বাড়ির বাইরেও ওর সঙ্গে বাংলায় কথা বলতাম। কয়েক সপ্তাহ বাদে আমি ডে-কেয়ারের শিক্ষিকা-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম ও ওঁর কথা বুঝছে কিনা, আর নিজের প্রয়োজনের কথা বলতে পারছে কিনা। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে ওঁর কথা বোঝা যে প্রয়োজন সেটা ও জানে, তাই না বুঝলে ও নিজেই যেনতেনপ্রকারেণ বোঝার ব্যবস্থা করে নেবে; তাছাড়া বাচ্চারা নিজেদের প্রয়োজন শুধু কথায় না, নানারকম ভাবে বোঝাতে পারে। সেইসঙ্গে তিনি খুব উৎসাহভরে বলেছিলেন, “ইংরেজি শেখার সুযোগ তো ও আজীবন পাবে, মাতৃভাষার একমাত্র উৎস তো আপনারা!” দেশেবিদেশে আমাদের সব বাংলাভাষী বন্ধুদের আমরা সবসময় বলেছি ওর সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে। এমনকি আমাদের আমেরিকান বন্ধুরা বা ওর বন্ধুদের আমেরিকান বাবা-মা-রাও সানন্দে ওর “অমুক মাসি” আর “তমুক কাকু” হয়ে উঠেছে! 

পরবর্তী ধাপ ছিল ওর শব্দভাণ্ডার বাড়ানো। আমার ছেলের জন্মের সময় একটি বলিভিয়ান পরিবার আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। আমি লক্ষ করতাম যে নয়, সাত, ও তিন বছর বয়েসি তাদের তিনটি বাচ্চা যখন স্প্যানিশে কথা বলে, তখন একটিও ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে না। আমেরিকায় বড় হওয়া সত্ত্বেও এমনই অবিমিশ্রভাবে তারা মাতৃভাষা ব্যবহার করে, যে স্প্যানিশ না জানলে কেউ তাদের কথোপকথনের বিষয়বস্তুও আন্দাজ করতে পারবে না। আমার ছেলে কথা বলা শুরু করলে আমি সেই বন্ধুর কাছে জানতে চাইলাম কীভাবে সেটা সম্ভব হয়েছে। সে প্রথমেই বলল সচেতনভাবে বাচ্চাদের শব্দভাণ্ডার বাড়ানোর কথা, “তুমি বা আমি যেহেতু দুটো ভাষাই জানি, রোজকার কথার মধ্যে কোন শব্দ আমরা ব্যবহার করব সেটা আমাদের পছন্দের ব্যাপার। কিন্তু ভেবে দেখো, আমাদের বাচ্চারা ইংরেজি শব্দই ব্যবহার করবে, কারণ তারা অনেক ক্ষেত্রে বাংলা বা স্প্যানিশ শব্দটা জানেই না। আমার বাচ্চাদের আমি সব কিছুর স্প্যানিশ শব্দ বলে দিই, এমনকি তুলনায় কম ব্যবহৃত শব্দও। তারপর ওদের পছন্দমত ওরা বলবে। কিন্তু পছন্দ যাতে করতে পারে, সেই সুযোগটা তো আমাদেরই দিতে হবে।” আমি হুবহু তার কথা অনুসরণ করলাম। Light, color, use, difficult, easy, risk – এরকম অনেক শব্দ চলতি কথায় হয়তো আমরা ইংরেজিতেই বলতাম। তার বদলে “আলো,” “রং,” “ব্যবহার,” “শক্ত,” “সহজ,” “ঝুঁকি,” ইত্যাদি বলতে শুরু করায় এরকম অগুনতি শব্দ ঢুকে পড়ল ওর ভাণ্ডারে। বরং এই সুবাদে আমরা নিজেরাও বহু বাংলা শব্দ মনে করতে শুরু করলাম, এবং খুব মজা পেলাম!

মজা প্রসঙ্গে বলি, আমরা কখনোই চাইনি যে আমাদের সন্তান অনিচ্ছা নিয়ে মাতৃভাষায় কথা বলুক। অতিরিক্ত কড়াকড়ি করলে ও বিরক্ত হবে, আর আস্তেআস্তে বিরূপ হয়ে উঠবে, এটা আমরা জানতাম। তাই পুরো বিষয়টাকে মজাদার করব ঠিক করলাম। মাঝেমাঝে ইংরেজি শব্দ বলে ফেলার প্রবণতা তখন ওর-ও ছিল, আর আমাদের-ও। কিন্তু তা নিয়ে ভাষাপুলিশি না করে নিজেদের মধ্যে একটা খেলা শুরু হল। “Language salad” কথাটায় “স্যালাড”-কে “অর্থহীন শব্দের মিশ্রণ” হিসেবে ধরা হয়। তেমনই বাংলায় কেউ ইংরেজি শব্দ মেশালে আমরা তাকে নাম দিলাম “স্যালাড ভাষা।” আর স্রেফ না ভেবে জগাখিচুড়ি ভাষা বললে তাকে বলতাম “stinky salad।” দুর্গন্ধ বোঝাতে কথাটা আবার নাক কুঁচকে বলতে হত! তারপর এল সেই দিন। মার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে গিয়ে বলেছি, “তুমি যে শার্ট-টা দিয়েছিলে।” পাশে বসে খেলতে খেলতে আমার পাঁচ বছরের ছেলে নাক কুঁচকে আমাকে ঠিক করে দিল, “শার্ট নয় মা, জামা।” 

ও বড় হওয়ার সময় যে বিষয়টি আমাদের কাছে ক্রমশ প্রাধান্য পেতে লাগল তা হল যে বাংলা সংস্কৃতি আমরা ওর উপর চাপিয়ে দিতে চাই না। শুরুতে যে ভিডিও-টার কথা আছে, সেই সময় আমি চেষ্টা করেছিলাম ওকে কবিতা আর গান শেখাতে, কিন্তু যতদূর পারতাম, সেগুলোকে প্রাসঙ্গিক করতেও চেষ্টা করতাম, হয়তো “আমাদের ছোটো নদী ওলেনট্যাঞ্জি”-র কথা মনে রেখেই! যেমন ওর “চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে” শেখা। সেই সময় কলম্বাসে আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এমি আর জেসনের বিয়ে ছিল। আমার পুত্রের প্রথম “বিয়ে” দেখা, স্বভাবতই বাড়িতে তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। ও “চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে/ কদমতলায় কে/ হাতি নাচছে, ঘোড়া নাচছে-র” পরে শিখল, “এমি-মাসির বিয়ে!” 

কিন্তু আরো বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা এটাও বুঝলাম যে আমরা যতই ভাল অনুবাদ করে দিইনা কেন, বা মাঝেমধ্যে কথা পাল্টে প্রাসঙ্গিক করি না কেন, মাতৃভাষায় সাহিত্য বা সঙ্গীতের সামাজিক বা সাংস্কৃতিক রেফারেন্স এদেশে ওর খুবই সামান্য। তাই সেগুলো শেখাতে জোর করলে পাখির মত বুলি হয়তো আওড়াবে, কিন্তু তা হবে অর্থহীন আর অন্তঃসারশূন্য। আর বেশি “বোঝালে” আমার বরের ভাষায়, “বোঝা-টা বোঝা হয়ে” যাবে। তাছাড়া ও স্বভাবলাজুক, এবং কারো মনোযোগ আকর্ষণ করতে একেবারেই পছন্দ করে না। আর আমরা সংস্কৃতি চর্চা করি, বা আমাদের ছেলে “সংস্কৃতিমনস্ক,” প্রবাসে বা দেশে কারো কাছে তা জাহির করার তাগিদ আমরা অনুভব করিনি কখনোই। তাই ওর পাঁচ-ছয় বছর বয়েস থেকে গান বা কবিতা শেখানোর চেষ্টা আর করিনি। কেউ জিজ্ঞেস করলে “সরি” না বলে স্পষ্ট বলেছি যে ও বাংলায় কথা বলে, গল্প করে, কিছু পরিবেশন করে না। এতে ওরও এই নিয়ে কোনো গ্লানিবোধ তৈরি হয়নি।  

তার বদলে আমরা ওর আশেপাশে সহজভাবে বাংলার মণিমুক্তো ছড়িয়ে রেখেছি। ওকে সুকুমার রায়ের ছোটোগল্প পড়ে শোনানোর সময় সাধুভাষার শব্দগুলি আমি কথ্য বাংলায় বলেছি। আমার বর ওকে নানারকম চলতি কথা শিখিয়েছে, “লে হালুয়া” সমেত! আর স্বরচিত “পিন্টুদা” আর “ঝন্টুদা”-র গল্প শুনিয়েছে, যারা দু’জন বাস্তব জীবনের অভিযাত্রী। তারা নাকি টাইটানিক ছেড়ে যাওয়ার সময় “এক থালা আলু আর মাছ ভাজা” খেতে ব্যস্ত ছিল বলে জাহাজ মিস করেছিল এবং প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল! আমার খটকা লাগাতে পরে বর আমাকে চুপিচুপি বলেছে যে হ্যাঁ, আলু আর মাছ ভাজা ফিশ অ্যান্ড চিপস-ই বটে, যা ইংল্যান্ডের বন্দর এলাকার সাধারণ মানুষের খাবার! বাড়িতে আর গাড়িতে অবিরাম আধুনিক বাংলা গান চলে – মহীন থেকে সুমন, চন্দ্রবিন্দু থেকে অনুপম, তালপাতার সেপাই থেকে বর্ণ অনন্য। আমি বাড়িতে চলতে ফিরতে রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে ভাটিয়ালি, আধুনিক থেকে জীবনমুখী, সবরকম গান করি। বছর পাঁচেক আগে আমাদের এগারো বছরের ছেলেকে একদিন একা একা “জীবনে কী পাব না” গাইতে শুনেছিলাম – পরের লাইনে আগের দিন চাওয়া ল্যাপটপটা পাবে কী পাবেনা তার অনিশ্চয়তার সঙ্গে মিলিয়ে, নিজের মতো করে কথা বানিয়ে নিচ্ছে! আজ ষোল-তে পৌঁছে গান নিয়ে ওর নিজের পছন্দ-অপছন্দ তৈরি হয়েছে, কিন্তু আমি গাইলে চুপ করে শোনে। বাংলা গান চললে আপত্তি কখনোই করে না। শীত পছন্দ বলে বরফ গলতে শুরু করলে রাগত গলায় ঈষৎ সুর লাগিয়ে বরং বলে, “এই যে, ব-স-ন্ত এসে গেছে!” 

শব্দ ও ব্যাকরণের ব্যাপারে আমরা বিশুদ্ধতাবাদী, কিন্তু প্রাসঙ্গিকতার ক্ষেত্রে আমরা বাস্তববাদী। এখন ক্লাস টেনে বাংলা হয়তো সত্যি-ই ওর ভাবনার বা নিজের সঙ্গে কথা বলার ভাষা নয়। তবু ও আমাদের সঙ্গে বা বাঙালি কারো সঙ্গেই ইংরেজিতে কথা বলে না। কোনো শব্দ বা প্রয়োগে আটকে গেলে আমরা ব্যাখ্যা দিতে পিছপা হই না, আবার ওর শব্দচয়ন অস্পষ্ট হলে ওকে ব্যাখ্যা দিতে বলি। কখনো কথার মধ্যে ইংরেজি বললে (“আমি wait করব”) আমি থামিয়ে জিজ্ঞেস করি wait-এর বাংলা কী। ও “আমি দাঁড়াব” বললে ধৈর্য ধরে বলি আরেকভাবে বলতে। ও “কেন, দাঁড়াব-ই তো!” বলে ইতস্তত করে। দুদণ্ড থেমে বলে, “ও, আমি অপেক্ষা করব!” দুজনেই হাসি। আজকাল অনেক সময় ইংরেজিতে ভাবে আর বাংলায় অনুবাদ করে বলে কিছু কিছু প্রয়োগ বেশ মজার হয় – “ও ধরা পেল” (He got caught) বা “তুই বানালি আমাকে এটা করতে” (You made me do this)! উৎসাহ দিয়ে ঠিক করে দিই, আবার শব্দগুলো ব্যবহার করার সুযোগ করে দিই। 

আমাদের কোনো অবাস্তব প্রত্যাশা নেই যে ও কোনোদিন “তিন ভুবনের পারে” ছবিটি দেখবে, বা অনুপমের “বসন্ত এসে গেছে”র রূপক বুঝবে। আমি অবশ্যই চাই যে ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকুমার রায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, আরও অনেকের লেখা মূল বাংলায় পড়ুক কোনোদিন। কিন্তু এও জানি যে তার সম্ভাবনা ক্ষীণ। নিজেকে আশ্বস্ত করি – “হ’লে হ’ল, না হ’লে নেই।” স্কুলে ও জার্মান ভাষা-ও শেখে বেশ কিছু বছর যাবত, গত বছর সেদেশে গিয়ে একটি পরিবারের সঙ্গে তিন সপ্তাহ থেকে এসেছে। ভবিষ্যতে হয়তো শুধু গুটি কয়েক মানুষের সঙ্গেই ও বাংলায় কথা বলবে। আশা রাখি যে তবু বাংলা ওর নিজের ভাষা থাকবে – মজা করার আর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার! আর কলকাতায় গেলে “দিম্মার বাড়ির কাছাকাছি একা চলাফেরা করতে পারব,” এই নির্ভীক আশ্বাসে মন ভরে যায়।

বিপন্ন ও বিলুপ্তপ্রায় ভাষা ও উপভাষা নিয়ে ইউনেস্কোর মানচিত্র সারা পৃথিবীর কয়েকশো মাতৃভাষার ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে। “পৃথিবীটা নাকি ছোটো হতে হতে” এক অলস, বোধহীন, বৈচিত্র্যহীন জগতে পরিণত হচ্ছে। প্রতিদিনই আমাদের চারপাশে নতুন নতুন যোগাযোগের মাধ্যম জন্ম নিচ্ছে, অথচ পৃথিবীর প্রাচীন আঞ্চলিক ও উপভাষাগুলো কয়েকটি আন্তর্জাতিক ভাষার কাছে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে, এবং উদ্বেগজনক হারে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সীমান্তে আর মানুষের মনের ভিতর দেওয়াল উঠছে, আর চলছে অবিরাম কথোপকথন আর কোলাহল। এক ভাষার শব্দ আর বাক্যাংশ অন্য ভাষায় মিশে গিয়ে এক জগাখিচুড়ি ভাষা তৈরি হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যম, সংবাদ (ও ভুয়ো সংবাদ), অনলাইন-অফলাইন দ্বৈততা, ভাষার পরিবর্তনশীলতা – এই সবকিছুর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে নানা পরিসরে আলোচনা চলছে। 

সভ্যতার মতোই ভাষাও নানাভাবে রূপান্তরিত হয়। বাঁক নেওয়া নদীর মতো ভাষা ব্যক্তিগত স্রোতের গল্প বলে, আর তার দুকূল জুড়ে গড়ে ওঠা সমাজের, সভ্যতার গল্পও বয়ে নিয়ে চলে। কারও কাছে ভাষা কেবল দৈনন্দিন যোগাযোগের আর মনের ভাব আদানপ্রদানের মাধ্যম, আবার কারও কাছে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র। মাতৃভাষাকে কেউ নিজের গোষ্ঠীর একান্ত উত্তরাধিকার মনে করে, আর ব্যবহারিক ভাষা হয়ে ওঠে অন্যদের সঙ্গে সেতুবন্ধনের উপায়। আমার অভিজ্ঞতা বলে যে ভাষার ব্যবহার ব্যাকরণের নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা গেলেও ভাষা ও তার ব্যবহারকারীর মধ্যে সম্পর্ক কখনোই একরকম হতে পারে না। ভাষা আমাদের অন্যদের সঙ্গে মেলায়, আবার আমাদের ভাবনার জগতে ঢুকে নিজেকে বুঝতেও সাহায্য করে। বিশেষ করে আমাদের প্রত্যেকের মাতৃভাষার সঙ্গে সম্পর্ক একান্তই ব্যক্তিগত। 

আর সেইজন্যই একটি মিষ্টি বাংলা কবিতার নামহীন নদীই হয়ে যেতে পারে মিসিসিপি, গঙ্গা, ডানিউব, বা ওলেনট্যাঞ্জি!

———-

ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত। 

ডঃ মৃত্তিকা সেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। স্নাতকোত্তর পড়ার সময় “দ‍্য স্টেট্সম‍্যান” পত্রিকায় তাঁর সাপ্তাহিক কলাম ও অন‍্যান‍্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে। পরে ব‍েঙ্গালুরুর “দ‍্য ডেকান হেরাল্ড” দৈনিকে সাংবাদিক ছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিকেশন স্টাডিজে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট করে বর্তমানে গবেষণাক্ষেত্রে কাজের পাশাপাশি নিয়মিত লেখার কাছে ফিরছেন। সচরাচর ইংরেজিতে লেখেন, বাংলায় লেখা সম্প্রতি শুরু করেছেন। মৃত্তিকা নিউ জার্সির বাসিন্দা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *