কুইয়ার ইকোলজি, একটি চালু নির্মাণকে বিনির্মাণের গল্প

কুইয়ার ইকোলজি, একটি চালু নির্মাণকে বিনির্মাণের গল্প

আবহাওয়ার পরিবর্তনে ক্যুইয়ার ইকলজি

জীবনের শেষ কটি বছরে তৃতীয় লিঙ্গের অধিকারের ওপর বেশ কয়েকটি সিনেমা বানিয়েছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর ‘চিত্রাঙ্গদা’ সিনেমার কথা মনে আছে? সেখানে প্রোটাগনিস্ট রুদ্রের মা তাঁর বাবাকে বলেছিলেন, “কোনটা স্বাভাবিক! যার যা স্বভাব সেইটাই তো স্বাভাবিক।” এই কথাটা এমনই, যা আলগোছে এড়িয়ে যাওয়া যায় কিংবা অতলে ডুব দিয়ে ভাবতেও বসা যায়। আধুনিক বাঙালি মানুষটির আজও বেঁচে থাকা উচিত ছিল, থাকলে হয়তো আমরা এই ভাষ্যের নবতম ব্যাখ্যা পেতাম বাংলা ভাষায় কিংবা চিত্রভাষায়। ঋতুপর্ণ কিন্তু আমাদের অজান্তেই খুলে দিয়েছিলেন একটি নতুন দিগন্তের ঠিকানা। হালফিলে যা ডানা মেলেছে ‘কুইয়ার ইকোলজি’ নামে।

এই শব্দবন্ধটি বুঝতে হলে প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু প্রচলিত ধারণার নিরসন হওয়া দরকার। সম্ভবত পৃথিবীতে সবচেয়ে ম্যানিপুলেটেড চরিত্রটির নাম প্রকৃতি। প্রকৃতিকে নিজের খেয়ালখুশিমতো সংজ্ঞা দেওয়া যায়। প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত শব্দ “প্রাকৃতিক,” যাকে গোদা বাংলায় “ন্যাচারাল” বলা হয় এবং এটিকে একটা সরলরৈখিক কাঠামোয় ফেলে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষ্যে পরিপুষ্ট করার নামই বোধহয় মানবসভ্যতা। সেই অতি পরিচিত বিষয় যার নাম “ন্যাচারাল” বা “স্বাভাবিক,” সে বোধহয় নিজেও জানে না তার নামে কী কী ফতোয়া জারি করা হয়। মনে হয় সে যেন এক মাঝবয়সি বেত্রবতী মহিলা, যার নামে আছে এক সংবিধান আর যার চোখ রাঙানির ভয়ে সবাই তটস্থ! পান থেকে চুন খসলেই তার নাম করে বলে দেওয়া হয়, “এ মোটেও স্বাভাবিক না, এটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজ।” কিন্তু প্রকৃতি মোটেই সেরকম নয়, প্রকৃতিকে যতই মাঝবয়সি মহিলা দারোগা ঠাওরানো হোক না কেন, আদতে সে এক ফচকে বালিকা। নিয়মের খাতা খুলে সে তাতে একরাশ জল ঢেলে দেয়। সে বাইনারিতে বিশ্বাস করে না, বিশ্বাস করে না সাদা আর কালোর নির্ভেজালতায়, কারণ সে জানে ধূসর অঞ্চলের গুরুত্ব। সে জানে দিন আর রাতের সংযোগস্থলে আসে মায়াবী বিকেল, ধীরে ধীরে নামে রহস্যময় সন্ধ্যা।

এই প্রকৃতিকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় সাদা আর কালোর নির্ভেজাল সীমানার বাইরে ওই ধূসর রহস্যময় অঞ্চলেই বুঝি তার রঙ্গময় মঞ্চ। একা একা স্বতন্ত্রভাবে সেখানে কেউ বেঁচে থাকতে পারে না, সবাই সবাইকে স্পর্শ করে থাকে আদরে, ভালোবাসায় কিংবা ঘৃণায়, কখনও নিবিড়ভাবে ‘ভিতরে পশিয়া যায়,’ ভিতর-বাহিরে মিলেমিশে থাকে অদ্ভুতভাবে, কিংবা নিজেদের মধ্যেই কঠিন প্রতিযোগিতা করে চলে অনবরত। যেমন একটি ছত্রাক গাছের শিকড়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে বেঁচে থাকে, কিছু ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে আছে বলেই মানুষ বেঁচে আছে, কিছু মাছ জীবনের মাঝপথে লিঙ্গ পরিবর্তন করে, অসংখ্য প্রাণীর মধ্যে প্রজনন সীমানার বাইরে গিয়েও ঘনিষ্ঠ সামাজিক ও যৌন আচরণ চোখে পড়ে। এগুলোকে কি প্রকৃতিবিরুদ্ধ বলা যাবে? অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রকৃতিকে একটি নিয়মের বেড়াজালে ঘেরা সুশৃঙ্খল কাঠামো হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে, যার নিয়মের ব্যত্যয় হওয়াকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় না।

‘কুইয়ার ইকোলজি’ এই ধারণাটিকে প্রশ্ন করে; না, একেবারেই উদ্ধতভাবে নয়, বরং অতি বিনয়ের সঙ্গে। এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, বিষয়টির এই রকম নাম কেনই বা হল, বা কেনই বা একে ‘কুইয়ার ইকোলজি’ বলা হবে! অনেকেই নিপাটভাবে ভেবে নেন যে কুইয়ার ইকোলজি মানে সমকামী প্রাণীদের নিয়ে গবেষণা। কিন্তু তা ঠিক নয়। হ্যাঁ, সমকামী প্রাণীদের নিয়ে আলোচনা ‘কুইয়ার ইকোলজি’র একটি বিশেষত্ব হলেও মনে রাখতে হবে, এখানে ‘কুইয়ার ইকোলজি’ একটি চিন্তন পদ্ধতি যা স্থির পরিচয়কে প্রশ্ন করে, বাইনারিকে প্রশ্ন করে, বৈচিত্র্য ও সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। ‘কুইয়ার ইকোলজি’ প্রকৃতির বৈচিত্র্যগুলোকে ব্যতিক্রম নয়, স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখতে বলে। কারণ তার মতে, পৃথিবীতে কোনো প্রাণী একা নয়, নিয়মের নিগড়ে বাঁধা নয়, আর কোনো পরিচয়ই চিরস্থায়ী নয়।

বিষয়টার জন্ম নিয়ে খানিক ইতিহাস আছে। সেই ১৯৭০ থেকে ‘৯০ সালের মধ্যে কাজ শুরু হয়েছিল “ইকোফেমিনিজম” নিয়ে। Vandana Shiva, Carolyn Merchant এবং Val Plumwood-এর মতো সমাজবিদরা বলতে শুরু করেছিলেন যে নারী আর প্রকৃতিকে একই কাঠামোয় ফেলে বিচার করা হয়। যেমন, নারী মানে মাতৃত্ব, নারী মানে উর্বরতা, কিংবা নারী এক সম্পত্তি। প্রকৃতিও ঠিক সেই রকম। ইকোফেমিনিজম চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল যে পশ্চিমা দর্শনের ডুয়ালিজম বা দ্বৈত বিভাজনে একদিকে যদি পুরুষ থাকে, অন্যদিকে আছে নারী; একদিকে আছে যুক্তি, তো অন্যদিকে আবেগ; একদিকে আছে মানুষ, তো অন্যদিকে প্রাণী; একদিকে সংস্কৃতি, তো অন্য পাশে প্রকৃতি। দ্বিতীয় অংশের বস্তুগুলোকে ভোগ করা যায়, জোর খাটানো যায় বা তাদের উপর অধিকার কায়েম করা যায়।

এইভাবে ইকোফেমিনিজম প্রথম বাইনারিকে প্রশ্ন করল, নিয়ন্ত্রণকে প্রশ্ন করল। আর তখনই অবাক কাণ্ড ঘটল! এই ইকোফেমিনিজমের হাত ধরেই ধীরে ধীরে খুলে গেল একটি নতুন দরজা, যে দরজায় ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে ‘কুইয়ার ইকোলজি’ প্রশ্ন করল—স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক এই বিভাজনটিও কি একটি বিভ্রান্তিকর বিভাজনের নিদর্শন নয়! অর্থাৎ ইকোফেমিনিজমের উত্তরসূরি হয়েও কুইয়ার ইকোলজি তার অনুগামী হল না, নিজের পথ তৈরি করে নিল। জুডিথ বাটলার, ইভ কোসফস্কির মতো নারীবাদীরা প্রশ্ন তুললেন যে নারী ও পুরুষ—এই দুই বিভাগ কি আলটিমেট? চূড়ান্ত? কিংবা বৈধ? নাকি এগুলো সমাজ ও সভ্যতার জবরদস্তি চাপানো নিদান। এই প্রশ্নগুলো থেকেই জন্ম নিল কুইয়ার থিওরি।

আর এই প্রশ্নগুলোকে একটা রাজনৈতিক ভাষা দিলেন গ্রেটা গার্ড। তিনি প্রথম ‘কুইয়ার ইকোলজি’ এই শব্দবন্ধটি স্পষ্ট করে উল্লেখ করলেন। চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন ক্ষমতায়ন বা সিস্টেম অব পাওয়ারের অবারিত আগ্রাসন নারীদের শোষণ করে, এলজিবিটিকিউ+ মানুষদের প্রান্তিক করে, আদিবাসীদের ভূমি দখল করে, প্রাণীদের সম্পদে পরিণত করে এবং সার্বিকভাবে প্রকৃতিকে লুটের সামগ্রী বানায়। তাই তিনি বলেন, “ইকোলজি উইদাউট জাস্টিস ইজ ইম্পসিবল।”

Staying with the Trouble: Making Kin in the Chthulucene বইতে ডোনা হ্যারাওয়ে বললেন, আজকের পরিবেশগত ও সামাজিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কোনো অলৌকিক প্রযুক্তি বা ভবিষ্যতের আশ্চর্য সমাধানের অপেক্ষা না করে মানুষ ও অন্যান্য জীবের মধ্যে নতুন ধরনের সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। এই বইটির সবচেয়ে আলোচিত ধারণা হল ‘Making Kin।’ এখানে ‘আত্মীয়তা’ শুধু রক্তের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হারাওয়ের মতে, এই ক্ষতিগ্রস্ত পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য একা থাকা নয়, বরং মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং অন্যান্য জীবের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বিস্তৃত সম্পর্ক গড়ে তোলাই সবচেয়ে জরুরি।

পশ্চিমা দর্শনে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা ছিল যে মানুষ যেন প্রকৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। হারাওয়ের মতে মানুষ প্রধান নয় বরং মানুষ, কুকুর, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, গাছ, প্রযুক্তি—সবাই একে অপরকে গড়ে তুলেছে, সমৃদ্ধ করেছে, জীবনযাপনের কৌশল শিখিয়েছে। সেই রকম ‘কুইয়ার ইকোলজি’ও বলে, মানুষ আলাদা কোনো সত্তা নয়। হারাওয়ে বলতে চেয়েছেন যে আত্মীয়তা মানে শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়। আত্মীয়তা বিষয়টা অনেক বড়। প্রতিটি জীব একে অপরের আত্মীয়। তার ফলে পরিবার মানে দাঁড়াল বৃহত্তর, শুধু স্বামী-স্ত্রী-সন্তান — এই ধারণাও প্রশ্নের মুখে পড়ল। সমস্ত জীবের মধ্যেকার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গেল।

‘কুইয়ার ইকোলজি’ এখান থেকে এই ধারণাগুলো আত্মসাৎ করে বলে, যদি স্পিসিসের সীমানাই এত অস্পষ্ট হয়, তাহলে জেন্ডারের সীমানা এত কঠোর হবে কেন! প্রকৃতি মানে সমাহার, বিবিধের মাঝে মিলনের গান, নিয়মের সঙ্গে তার ব্যত্যয়েরও গান। সব মিলেই পৃথিবী। পৃথিবী যেমন বিষমকামীর, সমকামীরও তেমনই।

তৃতীয় তরঙ্গের নারীবাদী জুডিথ বাটলার-এর মতে, জেন্ডার একটি পারফরম্যান্স, জেন্ডার হল অভিনয়। অর্থাৎ সমাজ যাকে ন্যাচারাল ভাবে সেইমতো মানুষকে তাঁর রোল প্লে করে যেতে হয়। কিন্তু Catriona Mortimer-Sandilands আরও একধাপ এগিয়ে তার প্রবন্ধ সংকলন Queer Ecologies: Sex, Nature, Politics, Desire (co-edited with Bruce Erickson)-এ প্রশ্ন করলেন যে প্রকৃতি আসলে কী? প্রকৃতি কি নির্দিষ্ট বাইনারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, নাকি সে নিজেই নিয়মভঙ্গের মূর্তিমতী নিদর্শন। বইটিতে মরটিমার আলোচনা করেন যে “প্রকৃতি মানেই বিষমকামী”—এই ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। মরটিমারের এই বইটিকে ‘কুইয়ার ইকোলজি’র প্রতিষ্ঠাতা গ্রন্থ হিসেবে ধরা যেতে পারে।

মরটিমারের মতে, পরিবেশচিন্তা আরও সমৃদ্ধ হতে পারে যদি কুইয়ার তত্ত্ব-এর ধারণাগুলিকে গ্রহণ করা হয়। তিনি সেই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন যেখানে ভাবা হয় যে প্রকৃতি স্বভাবতই সুশৃঙ্খল, বিশুদ্ধ এবং শুধুমাত্র প্রচলিত যৌনতার নিয়ম অনুসরণ করে।

এদিকে চিন্তাবিদ স্টেসি এলাইমোর বলেন যে শরীর বদ্ধ বাক্স নয়, তার সীমারেখা নেই। বনে যে বাতাস বয়ে যায়, সেই বাতাস মানব শরীরেও হিল্লোল তোলে, প্রাণের জোগান দেয়। তিনি বলেন “Trans Corporeality” এই শব্দগুচ্ছের কথা। যা দেহকে অতিক্রম করে, পরিচিত আর অপরিচিতের সীমানা পেরিয়ে যায়, বিশ্বের সমস্ত কিছুর মধ্যে একটি সূত্রমালা গেঁথে দেয়।

নিকোল সীমরের হাত ধরে ‘কুইয়ার ইকোলজি’ তার স্পষ্টতা পায়। নিকোল সরাসরি প্রশ্ন করেন, যা কিছু সুন্দর যা কিছু বিন্যস্ত যা কিছু দৃষ্টিনন্দন, তাই কি প্রকৃতি? প্রকৃতি মানে যদি সৌন্দর্য হয়, তবে সৌন্দর্যের বিপ্রতীপ রূপও হয়; প্রজাপতি যদি প্রকৃতির রূপ, তবে আরশোলাও প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। যা কিছু আগাপাছতলা পচে যাওয়া, অসুন্দর অবিন্যস্ত, যা কিছু বেহিসাবি, অদ্ভুত—তাকেও মেনে নিতে হবে প্রকৃতির অংশ হিসেবে। আর মেনে নিতে হবে যে সুন্দর-অসুন্দর, নিয়ম আর বেনিয়মের সমাহারেই গড়ে ওঠে এই পৃথিবী।

এইসব তাত্ত্বিক ধারণাগুলির পেছনে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন Bruce Bagemihl, তাঁর লেখা Biological Exuberance: Animal Homosexuality and Natural Diversity’হল ১৯৯৯ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক গ্রন্থ যা কুইয়ার ইকোলজির অনেক তত্ত্বকে একেবারে হাতে-কলমে প্রমাণ করে ছাড়ে। আসলে কিনা, এই বইটি হল মানুষ ছাড়াও বাকি প্রাণিজগতের সমলৈঙ্গিক যৌন আচরণ এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত আচরণ নিয়ে করা গবেষণাগুলির একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা। এই বিষয়ে এটি একটি যুগান্তকারী বই হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ লেখক শত শত গবেষণাকে একত্র করে দেখিয়েছেন যে প্রাণীদের আচরণ মানুষের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। ব্রুস ব্যাজেমিল দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রাণীবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলোকে নথিভুক্ত করে প্রাণিজগতে সমলিঙ্গের প্রেমালাপ, যৌন আচরণ, জুটি গঠন, একসঙ্গে সন্তান প্রতিপালনের বিচিত্র বিবরণ উপস্থাপন করেছেন। লেখক যে কুইয়ার ইকোলজিকে পরিপুষ্ট করার জন্যই তার বই লিখেছেন এরকমটা নয়, কিন্তু কুইয়ার ইকোলজিস্টরা তাদের তাত্ত্বিক যুক্তির হাতে-গরম সমর্থন এই বইতে পেয়ে যান।

যেমন ধরুন অনেক ডলফিন বিশেষত বটলনোজ ডলফিনের মধ্যে পুরুষ-পুরুষ জোট বা মেইল অ্যালায়েন্স থাকে, যা শুধুমাত্র সারভাইভাল স্ট্র্যাটেজি নয়, তাদের ঘনিষ্ঠতার বিশেষ প্রকাশও বটে। অস্ট্রেলিয়ান কালো রাজহাঁস পুরুষ জুটি একসঙ্গে বাসা তৈরি করে, ডিমের যত্ন নেয় এবং ছানাপোনা লালন-পালন করে। লেসান অ্যালবাট্রস জুটি আবার এই কাজটাই হরেদরে করে থাকে, শুধু তাদের জুটিটা দুই মহিলা মক্কেল সমন্বিত। এইরকমভাবে বোনোবো-সহ অনেক প্রজাতির কথা উল্লেখ করা যায় যাদের মধ্যে হোমোসেক্সুয়ালিটি বহুল প্রচলিত।

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার দেখা যায় ক্লাউনফিশের প্রজাতির মধ্যে। ক্লাউনফিশ প্রজাতির সবচেয়ে বড় আকৃতির মাছটি হচ্ছে গিয়ে স্ত্রী; এইবার সে যদি মারা যায়, তবে বড় পুরুষটি স্ত্রীতে রূপান্তরিত হয়। এই ঘটনাকে sequential hermaphroditism বলা হয়। র‍্যাস মাছের মধ্যেও অবস্থাগতিকে এই লিঙ্গ পরিবর্তনের ঘটনা দেখা যায়। ছত্রাক জগতে এমন প্রজাতির ছত্রাক আছে যেখানে মিলনের জন্য মাত্র দুটি নয়, হাজার হাজার সম্ভাব্য মেটিং টাইপ রয়েছে।

অনেক আদিম জনগোষ্ঠীতে কিন্তু সমলৈঙ্গিক যৌনাচরণকে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। গিলবার্ট হার্ট আবার লিখেছেন রিচুয়ালাইজড হোমোসেক্সুয়ালিটির বিষয়ে। পাপুয়া নিউগিনির একটি জনজাতি যাদের নাম গেবুসি, তাদের উপর সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গিয়েছিল যে এরা বহু বহু শতক ধরে এই রিচুয়ালাইজড হোমোসেক্সুয়ালিটির উদ্‌যাপন করে আসছে; অধুনা বহু চর্চিত হোমোসেক্সুয়ালিটির বিষয়ে কিছু না জেনেই। তারপর ধরুন, কিছু আদিম সমাজে জেন্ডার ফ্লুইডিটি কিন্তু বহাল তবিয়তে আছে। তবে সেটা সব সময় যৌনতা সম্পর্কিত নাও হতে পারে। যেমন নেটিভ আমেরিকানদের মধ্যে আছে টু-স্পিরিটের ধারণা। এখন এই টু-স্পিরিট ধারণাটা নিয়ে বহু হাল্লাগুল্লা হয় বটে, কিন্তু ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলে দেখা যাবে যে নেটিভ আমেরিকানদের মধ্যে এই টু-স্পিরিটেড মানুষেরা খুবই সম্মাননীয় ছিল। তাদের মধ্যে ছিল ঐশ্বরিক দ্বৈত দিব্যদৃষ্টি। তাদের মধ্যে ছিল নারী ও পুরুষ উভয়ের চারিত্রিক শক্তি ও উদারতা। নিজস্ব জনজাতির উপকারে তাদের ছিল প্রশ্নাতীত দক্ষতা। এই সব আদিম প্রথা ক্রিশ্চান মিশনারিদের প্রভাবে ধীরে ধীরে তার নিজস্ব চরিত্র হারায়। শুনতে অবাক লাগবে যে আমেরিকার বিখ্যাত টারটল দ্বীপকে বলা হয় প্রাচীন কুইয়ারদের পীঠস্থান।

ভারতীয় দর্শন কি ‘কুইয়ার ইকোলজি’কে সঙ্গ দিতে পারে! প্রশ্নটা মনে হতেই উত্তর এল, ‘কুইয়ার ইকোলজি’ তো চরম আধুনিক তত্ত্ব। তার জন্ম আমেরিকা ও ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ে, তার ভাষা উত্তর-আধুনিক, তার প্রশ্ন লিঙ্গ, যৌনতা, পরিবেশ ও ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে। অন্যদিকে ভারতীয় দর্শনের জন্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বৌদ্ধিক জগতে। তার প্রশ্ন মুক্তি, আত্মা, ব্রহ্ম, কর্ম, দুঃখ ও চেতনা নিয়ে। প্রথম দর্শনে মনে হয়, এই দুই জগতের মধ্যে কোনো সম্পর্কই নেই। কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে দেখি, কিছু মিল তো আছেই।

কুইয়ার ইকোলজি বাইনারি অস্বীকার করে, সে স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক বলে পৃথিবীকে ভাগ করার পক্ষপাতী নয়। উপনিষদও এক অর্থে যেকোনো বিভাজনকে প্রশ্ন করে। বলা হয়, “সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম” অর্থাৎ এই সমগ্র বিশ্বই ব্রহ্ম। কিংবা ধরুন বৌদ্ধ দর্শনের “প্রতীত্যসমুৎপাদ” যার অর্থ কোনো কিছু একা জন্মায় না, একা এক্সিস্ট করে না।

ডোনা হ্যারাওয়ের Making Kin বা স্টেসি আলাইমোর Trans-corporeality পড়তে পড়তে কখনও কখনও মনে হয়, তারা যেন অন্য ভাষায় একই ধরনের আন্তঃসম্পর্কের কথা ভাবছেন, কিন্তু তাঁদের উদ্দেশ্য আধ্যাত্মিক নয়, রাজনৈতিক ও দার্শনিক।

জৈন দর্শনের অনেকান্তবাদ বলে, সত্য একমুখী নয়; বহু দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে দেখতে হয়। ‘কুইয়ার ইকোলজি’ও বলে, প্রকৃতিকে একটি মাত্র ছকে বন্দি করা যায় না। ভারতীয় পুরাণের “অর্ধনারীশ্বর”, লোকায়ত ধারার বনদেবী, সর্পদেবী, নদীমাতৃকা সবই এই অন্তর্জালের অংশ, যেখানে প্রকৃতি, মানুষ, প্রাণী, ঈশ্বর একাকার হয়ে যান।

আজও বহু ভারতীয় আদিবাসী সমাজে বন শুধু সম্পদ নয়; নদী শুধু জল নয়; পাহাড় শুধু পাথর নয়। তারা একে অপরের আত্মীয়। মানুষ তাদের মালিক নয়, বরং তাদের সহযোদ্ধা। হারাওয়ের Making Kin পড়লে এই সম্পর্কভিত্তিক বিশ্বদর্শনের সঙ্গে এক ধরনের মিল পাওয়া যায়। ভারতীয় দর্শন এবং কুইয়ার ইকোলজির উৎস ভিন্ন হলেও কোনো এক মোহনায় এসে তাদের স্রোতধারা একে অপরকে স্পর্শ করে।

সংক্ষিপ্তভাবে বলা যেতে পারে যে ‘কুইয়ার ইকোলজি’ এমন এক পরিবেশ-দর্শন, যা প্রকৃতিকে কোনও স্থির, বিশুদ্ধ সত্তা হিসেবে দেখে না, বরং বৈচিত্র্য এবং অনিশ্চয়তায় ভরা একটি গতিশীল জগৎ হিসেবে বোঝার চেষ্টা করে। মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ, অণুজীব সকলের বেঁচে থাকা, জীবন যুদ্ধে সামিল হওয়া সবই এই গতিশীল পৃথিবীর মধ্যে জারি থাকা একটি জটিল আন্তঃসম্পর্কের অংশ। কুইয়ার ইকোলজি আদতে দেখায় যে পুরুষ কিংবা নারী, স্বাভাবিক কিংবা অস্বাভাবিক, সভ্য অথবা অসভ্য— এগুলো মানুষের তৈরি কিছু পরিভাষা মাত্র, প্রকৃতির কাছে আদপে হয়তো এই সীমারেখাগুলি খুব অস্পষ্ট। প্রকৃতির কাছে সবাই সমান। কারণ সে এক্সক্লুসিভ নয়, পরিপূর্ণভাবে ইনক্লুসিভ।

———-

তথ্যসূত্র

Bagemihl, B. (1999). Biological exuberance: Animal homosexuality and natural diversity. NY: St. Martin’s Press.

Brown, A. M., and Ray. A. (2025, February 13). “All Ecology is Queer.” Orion, Spring 2025. https://orionmagazine.org/article/all-ecology-is-queer/

De Groot, S. (2024, March 26). “What is Two-Spirit?” Part One: Origins. Canadian Museum for Human Rights. Available: https://share.google/WyvVpFrYLfmu1GnQm

Johnson, A. C. (2011, March 24). “How to Queer Ecology: One Goose at a Time.” Orion, March/April 2011. Available: https://orionmagazine.org/article/how-to-queer-ecology-once-goose-at-a-time/

Poiani, A. (2010). Animal homosexuality: A biosocial perspective. Cambridge, UK: Cambridge UP.  Available: https://api.pageplace.de/preview/DT0400.9780511784392_A23679941/preview-9780511784392_A23679941.pdf

ছবিঃ অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত। 

উত্তরবঙ্গে জন্ম কিন্তু বিবাহসূত্রে দক্ষিণবঙ্গের বাসিন্দা। থাকেন কলকাতায়। প্রবন্ধ থেকে শুরু করে ছোটগল্প, উপন্যাস  কিংবা অনুবাদ, সাহিত্যের সব ধারায় কাজ করবার চেষ্টা করেন। নামি ও অনামি বহু পত্রিকায় লিখেছেন। প্রকাশিত বই রা প্রকাশন থেকে 'পটারাম ও অন্যান্য,' পালক প্রকাশন থেকে, 'রঙ্গ দেখে অঙ্গ জ্বলে?'

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *