বঙ্গ-সংস্কৃতিতে মহালয়ার বিবর্তন

বঙ্গ-সংস্কৃতিতে মহালয়ার বিবর্তন

‘মহালয়া’ শব্দটি বর্তমানে বাঙালি জীবন ও সংস্কৃতিতে অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় শব্দ। এর কারণ সহজেই অনুমেয়। বারো মাসে তেরো পার্বণে অভ্যস্ত বাঙালির শ্রেষ্ঠ পার্বণ দুর্গাপুজো। সুপ্রাচীন কাল থেকেই দেবী দুর্গার শরৎকালীন আবাহন বাঙালির জীবনকে নানা অনুষঙ্গে ভরিয়ে রেখেছে। তার সঙ্গে জড়িত ‘মহালয়া’-র কথা শোনেনি এমন বাঙালি দুর্লভ। তবে দুর্গাপুজোর সঙ্গে ‘মহালয়া’-র পারস্পরিক সম্পর্কের সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। বর্তমান আলোচনার দুটি অভিমুখ। একটি হল, ‘মহালয়া’ বলতে আজকে বাঙালি যা বোঝে। আর একটি হল, তার পূর্ব পরিচয় এবং উৎস সম্পর্কিত অনুসন্ধান।  

 জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের (১৮৭২-১৯৩৯) বাঙ্গালা ভাষার অভিধান (দ্বিতীয় খণ্ড)-এ ‘মহালয়া’ শব্দটি নেই। তার পরিবর্তে আছে ‘মহালয়’i শব্দটি। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৮৬৭ – ১৯৫৯) বঙ্গীয় শব্দকোষ দ্বিতীয় খণ্ড (সাহিত্য আকাদেমি সংস্করণ, ১৯৬৭ খ্রি.)-এ ‘মহালয়’ ধরনের কাছাকাছি কোনো শব্দ নথিভুক্ত হয়নি। ‘মহাল’ শব্দের উৎস হিসেবে ‘মহালয়’-এর উল্লেখ আছে, তবে তাকে ‘মহাল’ শব্দের পূর্ববর্তী রূপ হিসেবে দেখা হয়েছে, যার অর্থ ‘রাজ্য’। তাকে দুর্গাপুজোর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো সাংস্কৃতিক তাৎপর্যে ব্যাখ্যা করা হয়নি (মহালয় > (ল) মহাল)।[i] এর কারণ অনুমান করা অসম্ভব নয়। বাঙালির জীবন-যাপন, আমোদ-আহ্লাদে মহালয়া আজকে যে চেহারা অর্জন করেছে তার বিন্দুমাত্রও তখন ছিল না। জনপ্রিয় সংস্কৃতির পরিচয় বহনকারী শব্দগুলির মধ্যে ‘মহালয়া’ নামক রেডিও অনুষ্ঠানের সমার্থক শব্দ হিসেবে ‘মহালয়া’-র প্রবেশ তখনও বাঙালি জনজীবনে ঘটেনি। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ (১৩৪০-১৩৫৩) গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ যখন প্রকাশিত হয় বিশ্বকোষ প্রেস থেকে,[ii] ১৯৩৩-৩৪ খ্রিস্টাব্দে,[iii] তখনও পর্যন্ত বাণীকুমার, পঙ্কজকুমার মল্লিক এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের পরিচালনায় আকাশবাণীতে অনুষ্ঠিত চণ্ডীপাঠ ‘মহালয়া-মহিষাসুরমর্দ্দিনী’-র[iv] পরিচিতি তেমন বিস্তৃতি আর গভীরতা লাভ করেনি। একটা সংস্কৃতিগত উপাদান হিসেবে মহালয়ার ব্যাপ্তি না ঘটা আর বাংলা শব্দকোষে জায়গা না পাওয়ার কারণ অনেকগুলো।

 প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রেডিও অথবা টেলিভিশনের মাধ্যমে সম্প্রচারিত হওয়া সাংস্কৃতিক উপকরণ,  লোকজ উপাদানের স্থানীয় আবেদনের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাবশালী। স্বৈরতান্ত্রিক শাসক হিটলার থেকে নাট্যকার বের্টোল্ড ব্রেখ্‌ট পর্যন্ত বিশ শতকের প্রতিটি প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রভাব বিস্তারের এটাই ছিল অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

In a radio speech in Munich, March 14, 1936, Hitler said, “I go my way with the assurance of a somnambulist.” His victims and his critics have been equally somnambulistic. They danced entranced to the tribal drum of radio that extended their central nervous system to create depth involvement for everybody. “I live right inside radio when I listen. I more easily lose myself in radio than in a book,” said a voice from a radio poll. The power of radio to involve people in depth is manifested in its use during homework by youngsters and by many other people who carry transistor sets in order to provide a private world for themselves amidst crowds. There is a little poem by the German dramatist Berthold Brecht:

You little box, held to me when escaping
So that your valves should not break,
Carried from house to ship from ship to train,
So that my enemies might go on talking to me
Near my bed, to my pain…[v] 
[রেখা চিহ্নিত অংশ লেখকের]

তার কারণ হিসেবে সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞ মার্শাল ম্যাকলুহানের (১৯১১-১৯৮০) নিরীক্ষণ অত্যন্ত যথার্থ ও উপযোগী।  

Radio affects most people intimately, person-to-person, offering a world of unspoken communication between writer-speaker and the listener.[vi]  

অর্থাৎ রেডিও প্রত্যেক মানুষকে স্পর্শ করে ব্যক্তিগত ভাবে, যা রেডিওর উপস্থাপকের সঙ্গে শ্রোতার নিকট সম্পর্ক তৈরি করে। যেমনটা রেডিওর আবিষ্কারের আগে হওয়া সম্ভব ছিল না। লৌকিক সংস্কৃতি, গোষ্ঠীগত স্তরে স্থানিক বিস্তৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। মহালয়ার ভোরবেলাকার রেডিও-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে চণ্ডীপাঠের লোকায়ত ঐতিহ্য যা একসময়ে বাঙালির একান্ত নিজস্ব বিশ্বাস আর সংস্কৃতিগত আচরণ ছিল, আধুনিক মিডিয়াম রেডিওর সাহায্যে তা ব্যাপকতর আকার লাভ করেছে বিশ শতকের প্রথমার্ধে। বাণীকুমার, পঙ্কজকুমার মল্লিক এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ‘মহালয়া-মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ আসলে লৌকিক সংস্কৃতি থেকে গৃহীত চণ্ডীপাঠের অনুষ্ঠান, যাকে বেতার-তরঙ্গ উত্তর যুগে রেডিওয় প্রকাশের উপযোগী করে বৃহত্তর শ্রোতাসমাজের কাছে আস্বাদনযোগ্য রূপে উপস্থাপন করা হয়েছিল। মহালয়ার উপাদান গোষ্ঠীগত বা আঞ্চলিক স্তরের জিনিস হলেও তার ব্যাপ্তি আর গভীরতাকে বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সেই যুগে রেডিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

 এবারে প্রশ্ন ওঠে তাহলে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গীয় শব্দকোষে এই সংস্কৃতিগত চিহ্ন, শব্দ হিসেবে জায়গা পেল না কেন? এর প্রধান কারণ তখনও এটি বাঙালির সাংস্কৃতিক মানচিত্রে স্পষ্ট জায়গা লাভ করেনি। সেটা হতে খানিকটা সময় লেগেছে। এই অনুষ্ঠান সর্বপ্রথম সম্প্রচারিত হয় ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে বাসন্তী পুজোয় ষষ্ঠী, মতান্তরে অষ্টমীর দিন ভোরে [vii]। মার্কণ্ডেয়-চণ্ডী অবলম্বনে বাণীকুমার গদ্য ও পদ্যে মিশ্রিত ‘বসন্তেশ্বরী’ নামে চম্পু-কাব্য রচনা করেন। সুর সংযোজন করেন হরিশচন্দ্র বালী ও পঙ্কজকুমার মল্লিক। ভাষ্য ও স্তোত্রপাঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। এই ‘প্রথম’ সম্প্রচারের নাম ‘মহালয়া-মহিষাসুরমর্দ্দিনী’ ছিল না। পরের বছর ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে এটি বাসন্তী পুজোর ষষ্ঠী/অষ্টমীর বদলে সম্প্রচারিত হয় মহালয়া তিথিতে [viii]। ১৯৩৬ খ্রি., মতান্তরে ১৯৩৭ খ্রি. থেকে এটি সম্প্রচারিত হতে শুরু করে দুর্গাষষ্ঠীর ভোরে, ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ নামে। এর কয়েক বছর পর থেকে এটি আবার ফিরে যায় পুজো সূচনার ঠিক আগের অমাবস্যায়, পিতৃ-তর্পণের ভোরে।[ix]

১৯৩৬/৩৭ খ্রিস্টাব্দের মহিষাসুরমর্দিনীর সম্প্রচার হয়েছিল দুর্গাষষ্ঠীর ভোরে। এই বিশেষ দিনেই এই কাব্য পাঠ করার কারণ ছিল একটি প্রথাবাহিত আচরণ। সেটি হল, দুর্গাপুজোর শুরুতে, মাঝখানে বা শেষে চণ্ডীপাঠ করা। দুর্গাপুজোর আবশ্যিক অঙ্গ এটি। ভাষা ও সংস্কৃতি গবেষক সুহৃদকুমার ভৌমিকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী শরৎকালের কৃষি উৎসবকে পালন করার জন্য একটি মহাপুজো হত। সেই পুজোয় পাঠ করা হত দুর্গা-মাহাত্ম্য। সেই দুর্গা-মাহাত্ম্য পাঠের ঐতিহ্যই পরে দুর্গোৎসবে পরিণত হয়েছে [x]। বঙ্গে দুর্গোৎসব গ্রন্থে দুর্গোৎসবে চণ্ডীপাঠের ঐতিহ্য সম্পর্কে গিরিশচন্দ্র বেদান্ততীর্থ জানাচ্ছেন দুর্গোৎসবে শতাবৃত্তি, পক্ষাবৃত্তি, নবাবৃত্তি ইত্যাদি নানা কল্পে চণ্ডীপাঠের বিধান আছে [xi]। শুধু তাই নয়, এর অর্থ, স্তোত্র, সূক্ত এমনভাবে পাঠ করতে হবে যাতে স্বর বেশ স্পষ্ট হয়, যথাযথ বিরাম থাকে, তাড়াতাড়ি পড়া না হয়, মধুর স্বরে রস ও ভাব অনুযায়ী পড়া উপযুক্ত [xii]। প্রার্থনার একটি শ্লোক উদ্ধৃত হল।  

ত্বং বৈষ্ণবী শক্তিরনন্তবীর্য্যা
বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া।
সম্মোহিতং দেবি সমস্তমেতৎ
ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তিহেতু।।[xiii]

অর্থাৎ মা! তুমি বৈষ্ণবীশক্তি, তুমি অনন্তবীর্য্যা। তুমি এই বিশ্বপ্রপঞ্চের বীজ, তুমি পরম মায়াস্বরূপা। এই সমস্ত জগৎকে তুমিই মোহিত করিয়া রাখিয়াছ। তুমিই আবার প্রসন্না হইয়া মুক্তির কারণ প্রাপ্ত হও। ব্যাখ্যা গিরিশচন্দ্র বেদান্ততীর্থ [xiv]। দেবীমাহাত্ম্যের এই ধরনের পাঠই সাত্ত্বিক পূজার আবশ্যিক অঙ্গ বলে বেদান্ততীর্থ জানাচ্ছেন।  তবে আক্ষেপের সঙ্গে এটাও তিনি জানিয়েছেন যে, ‘পাঠকের যে সকল নিয়ম শাস্ত্রে দেখা যায়, তাদৃশ গুণসম্পন্ন পাঠকের সংখ্যা খুব কম।’[xv] রেডিওর মাধ্যমকে ব্যবহার করে সেই ঐতিহ্যকে রক্ষা করার একটা প্রক্রিয়া হিসেবে এটি করা হয়েছিল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সুললিত উচ্চারণে অনেক দূর পর্যন্ত চণ্ডীপাঠের এই শর্ত রক্ষা করে, তার সঙ্গে সুর সংযুক্ত করে খানিকটা নাটকীয় ভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল সেই পাঠ।

 ১৯৩৬/৩৭ খ্রিস্টাব্দের কিছু পর থেকে শারদীয় দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর বোধনের আগেই চণ্ডীপাঠের মাধ্যমে দেবীর আগাম বোধন সম্পন্ন হতে শুরু করে দুর্গাষষ্ঠীর ঠিক আগের অমাবস্যার ভোরে।[xvi] ভাদ্র মাসের অমাবস্যায়, পিতৃতর্পণের ভোরে। এর পরের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতেই পুজো শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্গাপুজোর চণ্ডীপাঠ শুরু হয়ে গেল তার আগেই, যে অনুষ্ঠান বাঙালির মনে সমার্থক হয়ে উঠল ‘মহালয়া’-র সঙ্গে, আদ্যাশক্তি দেবী মহামায়ার আলয়ে আগমন অর্থে। এটা এক দিক থেকে দেখতে গেলে প্রথা ভাঙার চেষ্টা। কারণ লৌকিক প্রথা মতে চণ্ডীপাঠ হওয়ার কথা পুজো শুরুর দিন থেকে শেষ দিন, মানে ষষ্ঠী থেকে দশমীর মধ্যে যে কোনো এক সময়ে। এখানে তাকে এগিয়ে আনা হল। লৌকিক আচরণের মধ্যে ঢুকে পড়ল ‘আধুনিক’ মিডিয়াম। তার প্রভাবে নতুনভাবে গঠিত হল পুরোনো ঐতিহ্য। তৈরি হল নতুন প্রথা। অনুমান করা যায়, এই পরিবর্তিত আচরণকে জনমানসে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করতে আরও অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। সম্ভবত এটাই কারণ বঙ্গীয় শব্দকোষে এই শব্দের অস্তিত্ব না থাকার। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর গ্রন্থ রচনার সময় পর্যন্ত সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, দেশীয় ও কথ্য উৎসজাত প্রায় সমস্ত শব্দকেই অন্তর্ভুক্ত করেছেন।[xvii] তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায় যে, এর পরে সাহিত্য আকাদেমি সংস্করণ হিসেবে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থটি যখন পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে, তার আগে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরও ছাব্বিশ বছর ধরে তাঁর জীবৎকালে তিনি এই শব্দটির ব্যবহার দেখেছিলেন ও সুযোগ পেয়েছিলেন অন্তর্ভুক্ত করার।[xviii] সেই সময়েও এটি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। সম্ভবত জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও আধুনিক রেডিও-মাধ্যমের তৈরি করা পারিভাষিক শব্দকে মহাকোষে অন্তর্ভুক্ত করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী অনুপ্রেরণা তখনও তৈরি করতে পারেনি ‘মহালয়া’ শব্দটি।  

সূচনা-পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহালয়া-মহিষাসুরমর্দিনীর অনুষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা জনমানসে যে ভালোভাবেই তৈরি হয়েছিল তার প্রমাণ রয়ে গেছে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের পরিবর্তিত সম্প্রচারের ঘটনায়। সে বার জনপ্রিয় চলচ্চিত্র-অভিনেতা উত্তমকুমারের উচ্চারণে চণ্ডীপাঠের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।[xix] সেই অনুষ্ঠানকে শ্রোতারা ভালো ভাবে গ্রহণ করেননি। পত্র-পত্রিকায় তার প্রমাণ আছে।[xx] ফলে আবার বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অনুষ্ঠানকেই ফিরিয়ে আনতে হয়, যা এখনও পর্যন্ত চলে আসছে। দুর্গাপুজোর অঙ্গ ‘চণ্ডীপাঠ,’ জনপ্রিয় মাধ্যমে রেডিও-প্রোগ্রাম হিসেবে দুর্গাপুজোর সার্বজনীন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্‌যাপনের অঙ্গ হয়ে উঠল। এভাবে প্রাচীন সংস্কৃতিগত ঐতিহ্যে যে প্রাক্‌ শারদীয় অমাবস্যা-মহালয়ার অস্তিত্ব ছিল, তা নতুনভাবে পুনর্গঠিত হয়ে যুক্ত হল বাঙালির সবচেয়ে বড়ো উৎসব, দুর্গোৎসবের সঙ্গে। ‘মহালয়া’ হয়ে গেল বিশেষ দিন, তবে নতুন তাৎপর্যে। যার পেছনে রয়েছে সংস্কৃতিগত বিবর্তনের চিহ্ন।

‘মহালয়া’ হিসেবে যে অমাবস্যার দিনটিকে পাওয়া গেল, তার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব প্রাচীন কাল থেকেই ছিল। তবে তার সঙ্গে বেশি যোগ রয়েছে পরলোকের অধিবাসী পিতৃপুরুষের তর্পণের, দুর্গাপুজোর সঙ্গে ততটা নয়। তিথি নক্ষত্রের হিসেব অনুযায়ী পর্যায়ক্রমিক পার্বণ হিসেবে দুর্গাপুজো ঠিক তার পরেই আসে। এটুকুই সংযোগ। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান গ্রন্থে ‘মহালয়’ শব্দটির একাধিক অর্থ করা হয়েছে। একটি অর্থ ‘উৎসবের আলয়’ [xxi]। আর একটি অর্থে বলা হয়েছে, পিতৃপুরুষেরা শ্রাদ্ধভোজনের জন্য যখন বা যেখানে গমন করেন সেটাই মহালয় (মহা+আলয়)। আলয় অর্থে ‘আবাস’ যেমন বোঝানো হয়েছে, তেমন ভাবে পিতৃপুরুষদের আগমনের সময় হিসেবে আশ্বিনী অমাবস্যাকেও উল্লেখ করা হয়েছে ‘মহালয়’ অর্থে।[xxii] আশ্বিনী অমাবস্যা অর্থাৎ আশ্বিন মাসের অমাবস্যা। এবারে প্রশ্ন উঠতে পারে, মহালয় অর্থে আশ্বিনী অমাবস্যার কথাই কেন বলা হয়েছে অভিধানে। এই প্রশ্ন নিরসনে সাহায্য নেওয়া যেতে পারে যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি শ্রী শ্রী দুর্গা গ্রন্থের (১৪২৭ বঙ্গাব্দ)। শ্রীযুত বিদ্যানিধি তাঁর গ্রন্থের ‘দুর্গোৎসব নববর্ষোৎসব’ শীর্ষক অধ্যায়ে শরৎঋতুর সূচনা ও দুর্গোৎসব প্রসঙ্গে আশ্বিনী অমাবস্যার উল্লেখ করেছেন।[xxiii] লেখকের মতে বেদাঙ্গ জ্যোতিষ অনুসারে আশ্বিন শুক্ল নবমীতে বর্ষা ঋতুর শেষ ও শরৎ ঋতুর সূচনা। এটি ঋতু সন্ধিক্ষণের মুহূর্ত। এই ঋতু সন্ধিক্ষণের কিছু দিন আগেই শুক্ল ষষ্ঠীতে দুর্গাপুজোর বোধন হয়। এই শুক্লপক্ষের অন্তিমে পূর্ণিমায় হয় লক্ষীপুজো। আর কৃষ্ণপক্ষের অন্তিমে আশ্বিনী অমাবস্যায় হয় শ্যামাপুজো। এই অমাবস্যায় পরলোকগত পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধ ও দীপ দান করা হয়। বেদাঙ্গ জ্যোতিষ মতে এই কালই পিতৃতর্পণ ও অর্ঘ্যপ্রদানের জন্য শ্রেষ্ঠ সময়।[xxiv] গিরিশচন্দ্র বেদান্ততীর্থের গবেষণা অনুযায়ী বেদাঙ্গ জ্যোতিষ শাস্ত্রের আনুমানিক রচনাকাল ১৩৭২ খ্রি. পূ.। ফলে পিতৃতর্পণের প্রশস্ত সময় হিসেবে আশ্বিনী অমাবস্যার যে নিদান এখানে দেওয়া হয়েছে সেটা বেশ প্রাচীন সংস্কার। এর পরিবর্ত আর একটি অমাবস্যাও ব্যবহৃত হয় পিতৃতর্পণের জন্য, এরই কাছাকাছি সময়ে। সেটি ভাদ্র অমাবস্যা[xxv]। বঙ্গদেশ ছাড়াও ভারতবর্ষের অন্যত্র এই ভাদ্র অমাবস্যাকে পিতৃতর্পণের তিথি হিসাবে গণ্য করার দৃষ্টান্ত রয়েছে।

Anthropological Survey of India-র ভারতবর্ষের সংস্কৃতি অনুসন্ধান প্রকল্পের গবেষক K. Gnanambal ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকার সংস্কৃতিগত অনুসন্ধান করেছিলেন তাঁর নির্বাচিত গবেষণা ক্ষেত্রসমূহের উৎসবকে কেন্দ্র করে। গবেষণার তথ্য সংকলিত হয়েছে Festivals of India (1969) গ্রন্থে। এই বইয়েরই ‘Festivals on an All-India Basis’ শীর্ষক প্রবন্ধে মহালয়ার দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ভাদ্র অমাবস্যাকে। তবে কোথাও কোথাও আশ্বিনী অমাবস্যাকেও মহালয়া অমাবস্যা হিসেবে পালিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন K. Gnanambal–  

…the new moon day at the end of dark fortnight of Bhadra (Aswini in some area) is called Mahalaya Amavasya.[xxvi]

ভাদ্র অমাবস্যায় পিতৃ-তর্পণকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মাদ্রাজবাসীদের মধ্যে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয় তার কয়েকটা ঘটনার কথা প্রাগুক্ত প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন লেখক,

 …professional purohits are limited in number and cannot cater to the needs of all at the same time. It is unusual in Madras state for large numbers who cannot afford to engage purohits individually to congregate at the nearest water source.[xxvii]

অর্থাৎ এত বিপুল পরিমাণ মানুষ ভাদ্র অমাবস্যার দিনে তর্পণে অংশগ্রহণ করেন যে তার জন্য যথেষ্ট সংখ্যক পুরোহিত পাওয়া যায় না। সবার ব্যক্তিগতভাবে পুরোহিত নিয়োগের ক্ষমতাও থাকে না। ফলে জলাশয়ের কাছে সমষ্টিগত ভাবেই তা পালন করতে হয়। এই প্রবন্ধটিই পরে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে উষা শর্মার সম্পাদিত গ্রন্থ Festivals in Indian Society গ্রন্থে (২০০৮) ।  

পিতৃ-তর্পণ ও শ্রদ্ধা নিবেদনের এই প্রথার প্রাচীনত্বকে কেন্দ্র করে পণ্ডিত নাতেশা শাস্ত্রীর অভিমত উল্লেখযোগ্য। তাঁর আলোচনার ক্ষেত্র তামিলনাড়ু। তামিল ভাষাভাষী হিন্দু জনসম্প্রদায় যারা মহালয়া অমাবস্যায় পিতৃতর্পণ করে তাদের অনুষ্ঠানের প্রাচীন উৎস সম্পর্কে শাস্ত্রীর নিরীক্ষণ উল্লেখযোগ্য—

…what is the reason for the Hindus paying greater attention to the Mahalaya Amavasya, or the new moon day of the month of Kanya (Tamil Purattasi) when the Sun is in the sign Virgo? The ‘Itihasa’, a great authority on the religious rites of Hindus, says that the moment the Sun enters the sign Virgo (Kanya) the departed Manes, leaving their abode in the world of Yama, the destroyer, come down to the world of men and occupy the houses of their descendants in this world.[xxviii]

অর্থাৎ ইতিহাস অনুযায়ী তামিল ক্যালেণ্ডারে পুরাত্তসি মাস যা গ্রেগোরিয়ান ক্যালেণ্ডার অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের মধ্যভাগ থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিস্তৃত, সেই সময়ে একটি নক্ষত্র হিসেবে সূর্য কন্যা রাশিতে প্রবেশ করে। তখন স্বর্গবাসী পিতৃপুরুষেরা ইহলোকে চলে আসেন যমলোক ছেড়ে। এটাই হয়ে ওঠে পিতৃতর্পণের মুহূর্ত যা মহালয়া নামে পরিচিত। এখানে এই প্রচলিত উৎসবের উৎস হিসেবে লেখক ইতিহাস বা পুরাণের কথা উল্লেখ করেছেন।

পুরাণ হিসেবে খুব একটা অগ্রগণ্য না হলেও অষ্টাদশ মহাপুরাণের একটি অন্যতম হল অগ্নিপুরাণ। এর প্রাচীনত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও হিন্দু ধর্মের পালনীয় সংস্কার বিষয়ে এত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বর্ণনা আছে যে অনেকে একে সংস্কৃতিগত বিশ্বকোষও বলে থাকেন। অগ্নিপুরাণ মতে শ্রদ্ধা ও পিতৃতর্পণের জন্য প্রশস্ত সময় হল অমাবস্যা ও সংক্রান্তি। আর এই কাজের জন্য গয়াভূমিই উপযুক্ত। তবে পিতৃতর্পণের জন্য একাধিক নিয়ম, পালনীয় আচরণ বর্ণনা এবং বিগত তিনপুরুষকে পিণ্ডদানের মাধ্যমে সুকৃতি ও ফললাভের কথা ঘোষণা করলেও আলাদা করে ভাদ্র অমাবস্যাকে এর জন্য কোনো বিশেষত্ব দেওয়া হয়নি। বরং তার পরিবর্তে আশ্বিন মাসের শুক্লা নবমীকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অগ্নিপুরাণ-এর ১১৭ নং অধ্যায়ে বিভিন্ন নদীর সঙ্গমস্থল ও তীর যেমন গয়া, প্রয়াগ, গোদাবরী, নর্মদা, কুরুক্ষেত্র, বারাণসী ইত্যাদি স্থান যেমন তর্পণের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছে, তেমনভাবেই বেশ কিছু পূর্ণিমাও উপযুক্ত কাল হিসেবে আখ্যা পেয়েছে। অগ্নিপুরাণ মতে–  

…sraddha done on the ninth day of bright fortnight in the month of Asvayak (October-November) …confer manifold benefits.[xxix]

অমাবস্যা-পূর্ণিমা ছাড়াও অন্যান্য তিথি যেমন চতুর্থী, নবমী ইত্যাদি তিথিও অগ্নিপুরাণ-এ উল্লেখিত হয়েছে তর্পণের জন্য। ভাদ্র অমাবস্যার বিশেষ গুরুত্ব সেখানেও নেই। তবে মনুর শাসন ও বিধি প্রয়োগের পরেই যে এই ধরনের সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার উল্লেখ আছে এখানে। অগ্নিপুরাণ-এর যে সংস্করণ এখন পাওয়া যায় তা অর্বাচীন ও আধুনিক কালের সংযোজন বলে সমালোচকদের অভিমত। এই গ্রন্থের যথাযথ রচনাকালও নির্ণয় করা যায়নি। তবে যেহেতু মনুর অনুশাসন ও যুগবিভাজনের উল্লেখ পাওয়া যায় [xxx], তাই এটা ধরেই নেওয়া যায় যে অগ্নিপুরাণ-এ উল্লিখিত বিধিনিষেধ মনুর অনুশাসনের পরের রচনা। যদুনাথ ন্যায় পঞ্চাননের অনুবাদ করা মনুসংহিতা-র প্রকাশক ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই গ্রন্থের ‘বিজ্ঞাপন’ অংশে দেবেন্দ্রনাথ মনুসংহিতা-র যে রচনাকাল উল্লেখ করেছেন তা বেদের আনুমানিক উপস্থিতিকালের তিনশ বছর পরের সময় [xxxi]। এর টীকা ও অনুলিখন দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের। ফলে অগ্নিপুরাণ-এর শ্রদ্ধা-তর্পণ বিষয়ক নিয়মকে খুব পুরোনো বলা যায় না। ফলে ভাদ্র-অমাবস্যা কবে থেকে হিন্দুদের পিতৃপুরুষের শ্রদ্ধা-তর্পণের তিথি হিসেবে বিশেষত্ব অর্জন করল তা সুনির্দিষ্ট ভাবে বলা মুশকিল। তবে শ্রদ্ধার্ঘ্য ও তর্পণ বিষয়ে যে বৈশিষ্ট্যগুলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে সেগুলি অনুসরণ করলে ‘মহালয়া’-র কাছাকাছি কয়েকটা লক্ষণ অনুমান করা যায়। যেমন মনুসংহিতা তৃতীয় অধ্যায় ২৭৮ নং শ্লোকে বলা হয়েছে,

যথা চৈবা পরঃ পক্ষঃ পূর্বপক্ষাদ্বিশিষ্যতে।
তথা শ্রাদ্ধস্য পূর্ব্বাহ্লাদপরাহ্ণ বিশিষ্যতেন।।[xxxii]

অর্থাৎ শুক্লপক্ষের তুলনায় কৃষ্ণপক্ষ শ্রাদ্ধের বিষয়ে বেশি ফল দেয়। পূর্বাহ্নের থেকে অপরাহ্ণ শ্রাদ্ধের ক্ষেত্রে অধিকতর ফলদায়ক। আবার যুগ্ম-তিথি ও যুগ্ম-নক্ষত্রে শ্রাদ্ধ করলেও তা শ্রাদ্ধকারীর অভিলাষ পূরণে সমর্থ হয়। ২৭৭ নং শ্লোকে বলা হয়েছে,

যুক্ষু কুর্ব্বন দিনর্ক্ষেষু সর্ব্বান কামান সমশ্নুতে
অযুক্ষুতু পিতৃন সর্ব্বাং প্রজাং প্রাপ্নোতি পুষ্কলাং।।[xxxiii]

অর্থাৎ দ্বিতীয়া-চতুর্থী প্রভৃতি যুগ্ম-তিথি ও ভরণী-রোহিণী প্রভৃতি যুগ্ম-নক্ষত্রে শ্রাদ্ধ করলে অভিলষিত ফললাভ হয়।

যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির জ্যোতিষচর্চা ও গবেষণা অনুযায়ী ভাদ্রের কৃষ্ণনবমী থেকে যে শরৎঋতুর সূচনা সেই ঋতুর অধিপতি রোহিণী নক্ষত্র। এই ঋতুতেই অসুরদলনী রুদ্রাণীর বোধন সূচিত হয়, এবং অন্যান্য শুভকর্মেরও অবকাশ তৈরি হয় প্রকৃতিতে। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী,

ছয় সহস্র বৎসর পূর্বে আর্যপিতামহগণ এক রোগের শান্তির নিমিত্ত রুদ্রদেবের উদ্দেশ্যে শরৎঋতু যজ্ঞ করিতেন। তাঁহারা রুদ্রের এক তারাময় প্রতিমা কল্পনা করিয়াছিলেন। কিন্তু দ্রুতগামী কাল সে কল্পনা ভাঙিয়া দিল। শরৎঋতুতে মৃগের উদয় হইল না, রোহিণীর ইদয় হইল… খ্রি.পূ. ২৫০০ অব্দের কথা। রুদ্রের দেহে এক অসুর কল্পিত হইল, রুদ্রস্থানে রুদ্রাণী আসিলেন, রুদ্রের তারাময় প্রাচীন প্রতিমায় অসুর ও রুদ্রাণী উভয়েই স্থান পাইলেন।[xxxiv]

দুর্গাপ্রতিমার যে গঠন শরৎকালের দুর্গাপুজোয় ব্যবহৃত হয় তা অসুরদলনী দুর্গার। বাসন্তীপুজোর থেকে তা পৃথক। প্রতিমার পশ্চাৎপটে প্রকৃতিতেও অনুরূপ সহাবস্থান ঘটে নক্ষত্র ও তিথির সম্মেলনে। সম্ভবত সেই কারণেই এই পর্বে যে দুটি অমাবস্যা পড়ে, অর্থাৎ ভাদ্র ও আশ্বিনী অমাবস্যা, দুটিই বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে এই সন্ধিক্ষণ বা যুগ্মতার জন্য। তবে আর একটি মত অনুযায়ী ভাদ্রমাসের অমাবস্যা শুধু নয়, গোটা কৃষ্ণপক্ষের পনেরোদিনই  শ্রাদ্ধ-তর্পণের জন্য উপযুক্ত। স্বামী অদ্বৈতানন্দের অভিমত অনুযায়ী,

মহালয়া হচ্ছে পিতৃপক্ষের বা শ্রাদ্ধপক্ষের অন্তিম তিথি। বিগত এক-পক্ষকাল ধরে পিতৃপুরুষের আত্মার পরিতৃপ্তির জন্য যে পিণ্ডার্ঘ্য অর্পিত হয়েছে ও হচ্ছে আজ তারই অন্তিম ও সর্বোত্তম তিথি।[xxxv]

দক্ষিণ-ভারতের তামিল-ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো কোনো এলাকায় এই পনেরো দিনই নিয়ম পালনের রীতি আছে। যাঁরা সেটি করতে অসমর্থ তাঁরা শুধু এই দিনটিকেই পালন করে সমান ফললাভ করেন। পণ্ডিত নাতেশা শাস্ত্রীর মতে,

…instead of performing these rights on each of the days or the fortnight, most Hindus do so only one of the days. Orthodox Hindus, however, perform ceremonies on every one of the days of this fortnight. These ceremonies terminate on the Mahalaya Amavasya day, which is therefore observed with greater sanctity than other new moon days.[xxxvi]

অর্থাৎ যারা আচারপালনের ব্যাপারে নিয়মনিষ্ঠ হিন্দু তারা ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের পনেরোদিনই পালন করেন। ভাদ্রমাসের অমাবস্যায় তার পরিসমাপ্তি হয়।

এই আলোচনা থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে মহালয়া অমাবস্যা প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষেরই একটি বিশেষ ঋতুতে পালনীয় সংস্কার, একটি সংস্কৃতিগত চর্যা। যার একটা অংশ বঙ্গদেশে পালিত হয়। তবে বঙ্গে এটা আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে শারদোৎসবের কারণে। মহালয়ার পিতৃতর্পণের মাহাত্ম্য অন্তরালে চলে  গিয়ে শারদোৎসবের সূচনার অস্তিত্বই বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখন তো বাণিজ্যিক ভাবে লাভ করার জন্য সার্বজনীন দুর্গাপুজোর পালন শুরু হয়ে যায় মহালয়ার দিন থেকেই। জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে মহালয়ার পৃথক অস্তিত্ব বিপন্ন। দুর্গাপুজোর ‘জনপ্রিয়তা’ এই সাংস্কৃতিক কৌমগত পরিচয়কে প্রায় গ্রাস করে ফেলেছে। মহালয়া হয়ে উঠেছে দুর্গাপুজোর সূচনাকারী প্রথম দিন। এক সময়ে অন্য সব পরিচয় মুছে গিয়ে হয়ত এটাই থেকে যাবে একমাত্র হয়ে। অন্তত সংস্কৃতিগত বিবর্তনের প্রবণতা সে দিকেই ইঙ্গিত করছে।

———–

তথ্যসূত্র

[i] বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৬৭, পৃ. ১৭৫২.

[ii] বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৯৬৬, পৃ. ২২. [বঙ্গীয় শব্দকোষ প্রথম খণ্ড সাহিত্য অকাদেমি সংস্করণ ভূমিকায় সংযোজিত হয়েছে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শেষ নিবেদন’ অংশ। সেখানে তিনি বিশ্বকোষ প্রেসের কার্যকর্তা নগেন্দ্রনাথ বসুর কাছে গ্রন্থ প্রকাশের ঋণ স্বীকার করেছেন।]

[iii] তদেব, ‘প্রকাশকের নিবেদন’, পৃ. ৮

[iv] প্রামাণিক, ২০২৬, পৃ. ৪৭. [দেশ পাক্ষিক ১৭ অগাস্ট, ২০২৬]   

[v] McLuhan 2001, p. 298.

[vi] Ibid, p. 125-127.

[vii] অধিকারী ২০১৯, পৃ. ১ [আনন্দবাজার ই-পেপার লিঙ্ক]

[viii] তদেব, পৃ. ১.

[ix] তদেব, পৃ. ১.

[x] ভৌমিক ২০১৫, পৃ. ৭৪.

[xi] বেদান্ততীর্থ ১৪২৯, পৃ. ৬৪.

[xii] তদেব, পৃ. ৬৩.

[xiii] তদেব, পৃ. ৬৩.

[xiv] তদেব, পৃ. ৬৩.

[xv] তদেব, পৃ. ৬৩.

[xvi] অধিকারী ২০১৯, পৃ. ২ [আনন্দবাজার ই-পেপার লিঙ্ক]

[xvii] চট্টোপাধ্যায়, ১৩৭২, পৃ. ৯-১৫. [‘ভূমিকা’, বঙ্গীয় শব্দকোষ, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য অকাদেমি, ১৯৬৬]  

[xviii] বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৩৩৯, পৃ. (১৫-২৪) [‘সংকলয়িতার নিবেদন’, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিতীয়বার পাণ্ডুলিপি শেষ করেন]

[xix] অধিকারী ২০১৯, পৃ. ২. [আনন্দবাজার ই-পেপার লিঙ্ক]

[xx] তদেব, পৃ. ২.

[xxi] দাস, ১৯৮৬, পৃ. ১৭৪০.

[xxii] তদেব, পৃ ১৭৪০.

[xxiii] রায় ১৪২৭, পৃ. ৫৮-৫৯.

[xxiv] তদেব, পৃ. ৫৯.  

[xxv] বেদান্ততীর্থ, ১৪২৯, পৃ. ৬৩.

[xxvi] Gnanambal 2008, p.72.   

[xxvii] Ibid, p.73.

[xxviii] Sastri 2003, p. 16-17

[xxix] Gangadharan (ed.) 1955, p. 350.   

[xxx] Ibid, vol ii, chapter 107.

[xxxi] ঠাকুর, ‘বিজ্ঞাপন’, ১৭৮৮ শকাব্দ

[xxxii] তদেব, পৃ. ১৮৬.   

[xxxiii] তদেব, পৃ. ১৮৬.

[xxxiv] রায় ১৪২৭, পৃ. ৩৮.

[xxxv] অদ্বৈতানন্দ ১৪১২, পৃ. ২৮৭.

[xxxvi] Sastri 2003, p. 16.

নির্বাচিত গ্রন্থপঞ্জি

বাংলা গ্রন্থ  

১. অদ্বৈতানন্দ স্বামী, ১৪১২ বঙ্গাব্দ, ‘মহালয়া’, ভাষণাঞ্জলি, কলকাতা: ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ।

২. ঠাকুর দেবেন্দ্রনাথ, ১৭৮৮ শকাব্দ, ‘বিজ্ঞাপন’, ন্যায় পঞ্চানন যদুনাথ (সম্পা.), মনুসংহিতা, কলকাতা: তত্ত্ববোধিনী যন্ত্র।

৩. দাস জ্ঞানেন্দ্রমোহন, ১৯৮৬ খ্রি., বাঙ্গালা ভাষার অভিধান (দ্বিতীয় খণ্ড), কলকাতা: সাহিত্য সংসদ।

৪. বন্দ্যোপাধ্যায় হরিচরণ, ১৯৬৬ খ্রি., বঙ্গীয় শব্দকোষ (প্রথম খণ্ড), নতুন দিল্লি: সাহিত্য অকাদেমি।

৫.  বন্দ্যোপাধ্যায় হরিচরণ, ১৯৬৭ খ্রি., বঙ্গীয় শব্দকোষ (প্রথম খণ্ড), নতুন দিল্লি: সাহিত্য অকাদেমি।

৬. বিদ্যানিধি রায় যোগেশচন্দ্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ‘দুর্গোৎসব নববর্ষোৎসব’, শ্রী শ্রী দুর্গা, বাঁকুড়া: টেরাকোটা।

৭. বেদান্ততীর্থ গিরিশচন্দ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ‘দুর্গারহস্য’ অধ্যায়, বঙ্গে দুর্গোৎসব, বাঁকুড়া: টেরাকোটা।

৮. ভৌমিক কুমার সুহৃদ, ২০১৫ খ্রি., ‘প্রাগৈতিহাসিক যুগের দেবদেবী ও ধর্মীয় ধারণা’, ধর্মবিশ্বাস বৃক্ষপূজা দেবদেবী, বাঁকুড়া: টেরাকোটা।

ইংরেজি গ্রন্থ

McLuhan Marshall, 2001, ‘Radio’, Understanding Media, London: Routledge.

Gnanambal K, 2008, ‘Festivals on an All-India Basis’, Sharma Usha (ed.), Festivals in Indian Society, New Delhi: Mittal Publications.

Sastri Natesa S.M., 2003, Hindu Feasts Fasts and Ceremonies, New Delhi: Asian Educational Services.

Gangadharan N, 1955, Chapter 107-117, Agni purana Vol 2, Delhi: Motilal Banarsidass.

পত্রিকা/ ই-পেপার লিঙ্ক

১. অধিকারী শঙ্খ, ‘মহিষাসুরমর্দিনী: বাঙালির মহালয়া’, আনন্দবাজার ই-পেপার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯, শেষ দেখা হয়েছে ৯ মার্চ, ২০২৬, পাওয়া যাবে নিম্নে সংযোজিত লিঙ্কে,

<  মহিষাসুরমর্দিনী:বাঙালির মহালয়া https://www.anandabazar.comeditorial/a-short-history-of-birendra-krishna-bhadra-s-mahisasura-mardini-in-all-india-radio-kolkata-1.1052232  

২. প্রামাণিক নিখিলরঞ্জন, ‘শতবর্ষের আলোকে বেতার নাটক’, কলকাতা বেতারের শতবর্ষ সংখ্যা, দেশ, ১৭ অগস্ট, ২০২৬।

ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত। 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *