অমৃত কুম্ভের সন্ধানে: কালকূটের সাহিত্য পরিক্রমা

সমরেশ বসু বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সারা জীবনে তিনি স্বনামে এবং ছদ্মনামে অসংখ্য সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, যা সমসাময়িক সমাজদর্পণে আজও ভীষণ প্রাসঙ্গিক, একথা বলাই বাহুল্য।
একথা ঠিকই যে সমরেশ বসুর আত্মপ্রকাশের সময়টি ছিল বাংলা সাহিত্যের সুবর্ণযুগ। তারাশঙ্কর, মানিক রয়েছেন, খ্যাতির শিখরে রয়েছেন বিভূতিভূষণ; আবার নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র ছাড়াও সাহিত্য পাঠকদের তালিকায় অন্য প্রিয় লেখক-লেখিকারাও রয়েছেন। কিন্তু সমরেশ বসু প্রথম থেকেই এমন একটি জায়গায় দাঁড়াবার উদ্যোগ করেছিলেন, যেখানে ‘উত্তরসূরি’ শব্দটির ছাপ কোনোভাবেই তাঁর গায়ে লাগেনি।
সমরেশ বসুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে তাঁর লেখা ‘এক কলমে সমরেশ, আর একটিতে কালকূট’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিলোত্তমা মজুমদার লিখেছিলেন: “স্বনামে লেখা কঠিন কর্কশ, বাস্তবতাধর্মী রচনার একেবারে বিপ্রতীপে তিনি নিয়ে এসেছিলেন কালকূটের কুয়াশাচ্ছন্নতা, তন্ময় বৈরাগ্য ও নিয়তিবাদ।”
সমরেশ বসুর দ্বিতীয় সত্তায় ‘কালকূট’ সাধারণভাবে সবার কাছে প্রধানত ভ্রমণ-সাহিত্যিক রূপে পরিচিত হলেও, যে অর্থে ভ্রমণ-সাহিত্যের বা ভ্রামণিকের পরিচয়, কালকূটের ভ্রমণ কোনোভাবেই সে অর্থে নয়। তাঁর ভ্রমণ শাস্ত্র-সাহিত্যের পথ ধরে সমাজ, ব্যক্তিজীবন ছুঁয়ে, কল্পলোকের অকূলে হারিয়ে গেছে। আবার জনপদের নর-নারীর সুখ-দুঃখকে ছুঁয়ে নিবিড় অরণ্যের অন্তরে তা প্রবেশ করেছে। কালকূটের স্বকীয়তা ও মৌলিকত্বে পাঠকমানস সে কারণেই আলোড়িত হয়। সেখানে সুকৌশলে তথ্যভারাক্রান্ত না করে সহজ প্রাঞ্জল ভাষায় জীবন তথা সমাজদর্পণের সার্থক প্রতিফলন ঘটেছে। ১৯৫২ সালে ‘ভোটরঙ্গ’ কালকূট ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়। কালকূট শব্দের অর্থ তীব্র বিষ। এরপর ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় কালকূটের বিখ্যাত উপন্যাস ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে।’
সাহিত্যজগতে আবির্ভাবের পর থেকে সমরেশ বসুর নিরবচ্ছিন্ন সৃজন আমরা পেতে থাকলেও, ‘কালকূট’ সত্তার সৃষ্টিতে কিন্তু সময়ের বড় ব্যবধান চোখে পড়ে। ১৯৫৪ সালের পর আমাদের দীর্ঘ সময় প্রতীক্ষা করতে হয়েছে। দীর্ঘ এগারো বছর পর ১৯৬৫ সালে আমরা আবার কালকূটের কাছ থেকে পেলাম ‘স্বর্ণশিখর প্রাঙ্গণে।’ তবে এরপর কিন্তু আর দীর্ঘ প্রতীক্ষা নয়; মাত্র দু-তিন বছরের ব্যবধানেই একে একে পেতে শুরু করেছি কালকূটের সব অমর সৃষ্টি —যেমন বহুপ্রতীক্ষিত ‘কোথায় পাব তারে’ (১৯৬৮), ‘বাণীধ্বনি বেণুবনে’ (১৯৭১), ‘আরব সাগরের জল লোনা’ (১৯৭২), ‘নির্জন সৈকতে’ (১৯৭২) বা ‘মন চলো বনে’ (১৯৭৩)।
ঠিক এরপর থেকেই তাঁর লেখায় এল আশ্চর্য বাঁক। এক পৌরাণিক চরিত্রকে বিনির্মাণ করলেন কালকূট, গড়ে তুললেন এক বিশ্বাস্য, রক্তমাংসের মানুষ। পাঠকসমাজ অভিভূত হল ‘শারদীয়া দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘শাম্ব’ উপন্যাস পড়ে; যার প্রকাশকাল ১৯৭৮ সাল। ১৯৮০ সালে এই ‘শাম্ব’ উপন্যাসের জন্যই পেলেন মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার। কালকূটের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি ‘দেখি নাই ফিরে;’ ১৯৯৩ সালে মরণোত্তর আনন্দ পুরস্কার প্রাপ্তি এই অনবদ্য উপন্যাসের জন্যই। স্বাভাবিকভাবেই, এই প্রবন্ধে আমরা সমরেশ বসু নয়—তাঁরই অন্য এক অনন্য সত্তা ‘কালকূট’-এর সাহিত্যকীর্তির ওপর আলোকপাত করার প্রচেষ্টা করব।
এক আত্মঅন্বেষণ ধরা পড়ে তাঁর লেখনীতে, যখন কালকূট ‘অমৃত বিষের পাত্রে’ (১৯৯১) উপন্যাসে লেখেন—
প্রতিজ্ঞা ছিল যে মনে, যাব নির্বাসনে। অরণ্যে না। বনের গভীরে নিবিড়ে, ছায়াঘন অন্ধকারে, ঝিঁঝি ডাকা নিঝুম প্রহরে না। যেখানে কোনো আড়ালে থেকে পাহাড়ি ঝরনা কুলকুল বহে, বাজে কোনো এক অপ্রাকৃত অনাদিকালের দুর্বোধ্য গানের সুরে, নির্বাসনে যাব না সেখানে।
নির্বাসন কি কেবল বনবাসেই হয়? অথবা নির্জন পাহাড়ে? কিংবা সমুদ্রের ছায়াহীন দূর বালুচরে? নির্বাসন যদি অনিবার্য হয়, সে কি পটলডাঙার অন্ধ গলির বদ্ধ ঘরে সম্ভব না? অথবা শ্যাওলা ধরা, ঘিঞ্জি বাড়ি ঠাসা চাঁপাতলা ফার্স্ট বাই-লেনে? নির্বাসন তো মনে মনেও সম্ভব। মন নিয়ে যাও বনে। মন চালান দাও পাহাড়ে সমুদ্রে যে কোনো নির্জনে। মনকে বলো, মন চলো যাই নির্বাসনে। সব ছেড়ে, সমাজ সংসার বন্ধন যত ভালো-লাগা ভালোবাসা, নিবিড় করে নিয়ে থাকা, আকাঙ্ক্ষা ইচ্ছায় উদ্বেল পাওয়া না-পাওয়া, সব কিছু ছেড়ে মন নির্বাসনে থাকো। বধির হও, অন্ধ থাকো, অনুভূতিকে রাখো মুড়ে জড়ত্বের কাঁথায়। যা শোনবার জন্য শ্রবণ উন্মুখ, তা শুনি না, যা দেখবার জন্য চোখ ব্যাকুল, তা দেখি না। অনুভবের নাম হোক অচল নগর। সেখানে হাসি কান্না সব খেলা বন্ধ, কাজ অকাজের সব পাট চোকানো। এই হবে মনে মনে নির্বাসন—জলে থেকেও জল ছোঁয়া নেই। চার দেওয়ালের চারিদিকেই অরণ্য পর্বত সমুদ্র। মাথার আচ্ছাদন আকাশ নির্জন নির্বান্ধব, আমি বসে আছি একাকী। মাইকেলএঞ্জেলোর সেই চিত্রটি ভাসছে চোখের সামনে। একাকী নগ্ন পুরুষ বসে আছে পাহাড়ের কোলে, নির্বাক গম্ভীর, গভীর দৃষ্টি বহু দূরে। কিন্তু সে কি নির্বাসিত না আমি নির্বাসিত? কালকূট—নির্বাসিতের এই নাম ভালো। তীব্র বিষ, আমি গরল, আমি হলাহল।
কালকূটের জীবন ও সাহিত্যে তার প্রভাব
সমরেশ বসু তথা কালকূটের জীবন বড়ো বিচিত্র; ঘাত-প্রতিঘাত, দারিদ্র্য, জীবনযুদ্ধ, দাম্পত্য জীবন, রাজনীতি—সবকিছুই তাঁর সাহিত্যে প্রভাব ফেলেছিল। জীবনের দুঃখ, দুর্দশা, গ্লানি থেকে মুক্তি পেতেই তাঁর ভ্রমণ অচেনার খোঁজে। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের কাছে অবহেলা আর অযত্ন সমরেশ বসুকে গড়ে তুলেছিল অন্যভাবে। গান-বাজনা, আঁকা ও থিয়েটারের প্রতি তীব্র আকর্ষণ এবং পড়াশোনায় অমনোযোগের কারণে পিতা মোহিনীমোহন ও বড়দা মন্মথনাথ সমরেশের ওপর বিরক্ত ছিলেন। এই থিয়েটার করতে গিয়েই ম্যালেরিয়া ও জন্ডিসে আক্রান্ত ভাইয়ের প্রতি বীতশ্রদ্ধ বড়দা কোনো মনোযোগ না দেওয়ায় সমরেশের মনে বিরুদ্ধ অভিমানের জায়গা তৈরি হয়েছিল। বয়সে বড়ো এক যুবতীকে বিবাহ করে অতি অল্প বয়সেই বাড়ির থেকে বেরিয়ে আলাদাভাবে সংসার পাতা, অর্থের জন্য ডিম বিক্রি, কখনও কোয়ার্টারে মেমসাহেবদের পোর্ট্রেট এঁকে রোজগার এবং ১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সত্যপ্রসন্ন দাশগুপ্তের সঙ্গে পরিচয় ও ১৯৪৪ সালে পার্টির সদস্যপদ প্রাপ্তি—এরকমই বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ সমরেশ বসুর জীবন বোধহয় কালকূটের রূপান্তরে প্রভাব ফেলেছিল। এরপর কারাবাস, বিশ্বযুদ্ধ, স্বাধীনতা লাভ—সবকিছুই প্রভাব ফেলেছিল ব্যক্তিজীবনে। ১৯৪৬-এর দেশের উত্তপ্ত ও জটিল পরিস্থিতিতে রচনা করলেন অসাধারণ ছোটগল্প ‘আদাব’, যা সমরেশ বসুকে পাঠকমহলে পরিচিতি এনে দিয়েছিল। ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরির নকশাঘরে বসে লিখে ফেললেন তাঁর প্রথম উপন্যাস— ‘নয়নপুরের মাটি।’
সমরেশের শৈশব কেটেছিল বাংলাদেশের বিক্রমপুরে আর কৈশোর কলকাতার উপকণ্ঠে নৈহাটিতে। জীবিকার তাগিদে এক সময় মাথায় করে ডিম পর্যন্ত ফেরি করে বেচেছেন তিনি। ফলে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ ছিল তাঁর সমগ্র জীবন। পরবর্তীকালে তাঁর যাপিত জীবনের সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতাকেই তিনি নিত্য ও আমৃত্যু ফুটিয়ে তুলেছেন সাহিত্যের নানা আঙ্গিকে। তৎকালীন কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে অন্য কোনো নিশ্চিত জীবিকার কথা না ভেবে, শুধু সাহিত্যকেই একমাত্র পেশা হিসেবে বেছে নেবার দুঃসাহস সে সময়ে কজনই বা দেখাতে পেরেছেন? আর সেই কারণেই বোধহয় প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক দেবেশ রায় তাঁর প্রয়াণে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লেখা রচনাটির শিরোনামই দিয়েছিলেন, “জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি লেখক এবং পেশাদার লেখক।”
জীবনের সমান্তরালে চলেছে তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামও; ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি ইছাপুরের রাইফেল ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন এবং একই সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন মেহনতি মানুষের আন্দোলনে। তিনি ছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য। এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ১৯৪৯–৫০ সালে তাঁকে জেলও খাটতে হয়। তবে তাঁর সৃজনশীল সত্তা সেখানেও থমকে যায়নি; জেলখানায় বসেই তিনি রচনা করেন তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস— ‘উত্তরঙ্গ।’ রচনাকালের দিক থেকে এটি দ্বিতীয় হলেও, বইয়ের আকারে আদতে এটিই ছিল তাঁর প্রথম ছাপা উপন্যাস।
এরপর তাঁর জীবনে এল আরেক বাঁক। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি লেখালেখিকেই একমাত্র পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেন। এত বড়ো অনিশ্চিত এক জীবন বেছে নেবার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন বলেই আজও তিনি বাংলা সাহিত্যে এক বিরল প্রতিভা। তবে কেবল এই পেশাদার জীবনের লড়াই-ই তাঁর শেষ কথা ছিল না, তাঁর ভেতরে লুকিয়ে ছিল চেনা গণ্ডি পেরিয়ে এক পরম অচেনার কাছে পৌঁছে যাওয়ার ব্যাকুলতা—যাকে বলে ‘Sense of wonder’—এক চিরায়ত বিস্ময়বোধ। সমাজ আর রাজনীতির সেই বদ্ধ ও চেনা পরিবেশ যখন তাঁর মনের ভেতর আর অনুরণন তুলতে পারছিল না, ঠিক তখনই আত্মপ্রকাশ ঘটল পরিব্রাজক ‘কালকূটের’। এক মুক্ত বহির্বিশ্বের স্বাদ আস্বাদনে ঘর ছেড়ে বের হয়ে পড়লেন তিনি; লালনের গানের কথায় মন বলে উঠল: “আমার ঘরের কাছে আরশিনগর, এক পড়শি বসত করে।” তাঁর এই আরশিনগর আসলে হল সমগ্র জগৎ আর জগৎজন, আর সেই নিভৃত পড়শি হল তাঁর নিজেরই আপন সত্তা। বুকে জমা তীব্র গরলের জ্বালা জুড়াতে যে অমৃতের খোঁজে কুম্ভমেলায় যাওয়া (‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’)—তা শুধু অমৃত আস্বাদনে গরলের কষ্ট মেটানোর চেষ্টা নয়—অচেনাকে জানা আর অদেখাকে দেখার এক তীব্র আর্তি।
‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’-এর শেষাংশে কালকূটের আত্মসমীক্ষায় উঠে আসে অসংখ্য মানুষের সঙ্গমে অবগাহনের প্রতি বিচিত্র বিস্ময়। তাঁর কথায়—
সত্য, আমি ভগবান পেতে ছুটে আসিনি। ডুব দিতে এসেছিলাম লক্ষ হৃদি সায়রে। এখন, এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, আমার সারা বুক বড় ভারী! সে যে কিসের ভারে এমন পাষাণ হয়েছে জানিনে। এত লক্ষ লক্ষ লোক। আমি ডুব দিলাম, কি ডুব দেওয়ার সময় হয়েছে জানিনে। কিন্তু প্রাণভরে একটা নিশ্বাসও নিতে পারছিনে। কিসে ভরে উঠল মন এমনি করে। কি পেলাম।
প্রথমত এই মানুষের পরশ পাওয়ার সদিচ্ছায় ভাগ্যক্রমে যখন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-র পক্ষে রিপোর্টাজ কভার করার জন্য কুম্ভমেলায় যাওয়ার সুযোগ এল, তখন তিনি তা লুফে নিলেন। আর্থিক দৈন্য স্বীকার করেও তিনি তাঁর কালকূট সত্তাকে এগিয়ে দিলেন। এজন্য দৈনিক ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য় বক্স ক্যামেরায় তোলা ছবিসহ রিপোর্টাজ প্রকাশিত হলেও সমরেশের সংগ্রহে অনেক কিছু। আর তাই ‘দেশ’-এর সম্পাদক সাগরময় ঘোষের সম্মতি ও কানাইলাল সরকারের অনুমোদনে সমরেশ তাঁর কালকূটকে হাজির করলেন ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনি ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে।’ অথচ সেই অমৃতকুম্ভের মধ্যে তিনি তাঁর বিষকুম্ভটিকেও প্রদর্শন করেছেন। সেজন্যই এ যাত্রা এলাহাবাদে কুম্ভমেলায় শুরু হয়ে অচেনাকে চেনার দীর্ঘ পরিক্রমা; কাছে-দূরে, তুচ্ছে ও মহতে তাকে খোঁজার চেষ্টা সার্থক রূপ পাচ্ছে ‘কোথায় পাব তারে’-তে, সেই পরিচিত বেষ্টনীর মধ্যে রূপ বিকাশ ঘটেছে। সর্বত্র এক আসন্ন মহোৎসবের ডাক।
আসলে অচেনার ডাক শোনার অভ্যেস সেই ছোট বয়স থেকেই। নিজেই বলেছেন ‘কোথায় পাব তারে’-র প্রথম অংশে বুড়িগঙ্গায় নৌকো নিয়ে ভেসে যেতে যেতে: “তার ডাক শুনেছি সেই কোন ভোরে। …যখন তাঁর (মায়ের) কোলের কাছে শুয়ে প্রথম চোখ খুলেছিলাম। সেই থেকেই ডাক শুনেছি, দৌড় দিয়েছি।” এ ডাক তাঁর প্রকৃতির কাছে, প্রকৃতির টানে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও আত্মঅন্বেষণ।
‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ থেকে শুরু
কালকূট যখন উপলব্ধি করছেন মানুষ দুঃখ চিরন্তন জেনেও সর্বদা সুখের সন্ধানে ব্যস্ত— পশ্চিমের গোরা থেকে নাগা সন্ন্যাসীর দল সবাই চলেছে অমৃতের টানে; ক্লান্তি ও পথশ্রমের নিত্য কষ্টকে ভুলে এই ছুটে চলা, আত্মোপলব্ধির সন্ধানই ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ উপন্যাসে কালকূট স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আগেই ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’-র প্রেক্ষাপট আলোচনা করা হয়েছে। ১৩৬১ সালের কার্তিক মাসে (ইংরেজি ১৯৫৪ সালের নভেম্বরে), বেঙ্গল পাবলিশার্স থেকে ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। প্রথমে এটি ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল এবং ভীষণভাবে পাঠককুলে সমাদৃত হয়। সেসময় সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র করার জন্য এর চিত্রস্বত্ব নিতে চাইলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে সম্ভবপর হয়নি। বোম্বের প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক বিমল রায় হিন্দি ও বাংলার দুটি চিত্রস্বত্বই কালকূটের কাছ থেকে কিনে নিয়েছিলেন পরবর্তীতে।
এর দ্বিতীয় মুদ্রণে কালকূট ‘বিচিত্র’ নামে একটি সংযোজনী লেখেন, যাতে আছে—
অনেক বিচিত্রের মধ্যে মানুষের চেয়ে বিচিত্র তো আর কিছু কোনো দিন দেখিনি। সে বিচিত্রের মাঝেই আমার অপরূপের দর্শন ঘটেছে। ভেবেছিলাম, একদিন মানুষ ছাড়িয়ে, অন্য কোনোখানে আমার সেই অপরূপের দেখা পাব। যখন কোনো নিরালা মুহূর্তে, বিস্ময়ে বেদনায় আনন্দে লক্ষ করেছি, এক প্রসন্নময়ের আবির্ভাব ঘটেছে আমার চোখের সামনে, তখনই অবাক হয়ে দেখেছি, সে আর কেউ নয়, মানুষ! তাকে ছাড়িয়ে কোনো অপরূপের দর্শন আমার ঘটল না। তাই আমার সব নমস্কার মিলিয়ে এক নমস্কার নিয়ে ফিরেছি বারংবার তারই দরজায়।
এলাহাবাদের কুম্ভমেলায় পৌঁছে তিনি অনুসন্ধান করেছেন বশিষ্ঠমুনির আশ্রম, খুঁজেছেন ত্রিবেণী সঙ্গমের প্রকৃত রূপ। সারা ভারতের দর্শন পেয়ে তিনি আপ্লুত হয়েছেন আনন্দে। ধর্ম, বেশ ও ভাষার ভিন্নতা সত্ত্বেও দুঃখ, বেদনা, হাসি ও অশ্রুতে মানুষ যে আসলে একই— তা হৃদয়ঙ্গম করেছেন।
তাই তো বিশিষ্ট সাহিত্য সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ আসলে ‘তীর্থপটে রসচ্ছবি।’
আবার এক বয়স্ক ব্যক্তি, যিনি চোখে দেখতে পান না, তাঁর ভাইপো তাঁকে এই উপন্যাস পড়িয়ে শোনালে অভিভূত সেই বৃদ্ধ লেখককে চিঠিতে লিখেছেন: “আমার সব অন্ধত্ব ঘুচে গেল ভাই।”
পত্রটি পড়ে লেখকের প্রতিক্রিয়া ছিল—অন্ধ ব্যক্তি তাঁর চেয়েও চক্ষুষ্মান। এই অন্তর্ভেদী দৃষ্টিই লেখকের জীবনানুসন্ধানের সবচেয়ে বড়ো দিক।
আবার ‘শাম্ব’-তে সেই অমোঘ সত্যকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছেন— ‘মানুষ নিজের কাছে নিজেই অপরিচিত।’ দুঃখময় জীবনকে স্বীকার করে বিচিত্র সব মানবমনের অমৃতকামী প্রত্যয়ের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন কালকূট। আসলে নিজেকে যত বেশি চিনতে পারা যায়, ঠিক তত বেশি চেনা যায় অন্যকেও; আর এই আত্মোপলব্ধির মধ্য দিয়েই মানুষের ভেতরের অচেনা সত্তাটি একদিন সবার কাছে আপন হয়ে ওঠে।
আসলে কালকূটের জীবনে এক যুগসন্ধিক্ষণ ছিল ১৯৪৯ থেকে ১৯৫২ সাল। নিজের স্ত্রী গৌরীদেবীর প্রতি অবিশ্বাস ও পার্টি নেতাদের সঙ্গে মনোমালিন্য— তাঁর মনের গভীরে ক্লান্তি ও স্বপ্নভঙ্গের বেদনা এনে দিয়েছিল। অশান্ত মন যখন ব্যাকুল হয়ে পেতে চাইছে শান্তির খোঁজ, তখন ১৯৫৪ সালে সারা ভারত জুড়ে শুরু হয়েছে কুম্ভমেলার প্রস্তুতি। কালকূট ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। অশান্ত গার্হস্থ্য জীবন, সমাজের আশাহীনতা ও অবিশ্বাস— কালকূটের লড়াকু সত্তাকে এগিয়ে নিয়ে গেল অচেনার খোঁজে, অভিমানী কবিসত্তাকে অমৃতসন্ধানী করে তুলল। আর এই চালিকাশক্তিই তাঁকে ‘অমৃতের খোঁজে’ টেনে নিয়ে গেছে বারবার।
ছদ্মনামের প্রসঙ্গে তিনি ‘গাহে অচিন পাখি’-তে তিনি লিখেছেন: “ছদ্মনামের প্রয়োজন হয় নামের আড়াল থেকে নিজেকে ব্যক্ত করার কারণে।” ১৯৫২ সালে ‘ভোটদর্পণে’ লেখার সময় ছদ্মনামের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও পরবর্তীতে এই ছদ্মনামই তাঁর অন্তরে ও বাহিরে এক নতুন ‘আমি’র জন্ম দিয়েছিল। পাশাপাশি রাজনৈতিক জগৎ থেকে সরে যাওয়াও তাঁর মধ্যে বহির্বিশ্বের স্বাদ আস্বাদনের আগ্রহ বাড়িয়েছিল বহুগুণ।
মেলা ও তীর্থক্ষেত্রে কালকূট
বাউলমনের অনুরাগী কালকূট বাউল, ফকির, সহজিয়া সাধকদের মিলনক্ষেত্র মেলায় বারবার ছুটে গেছেন সাধনার গূঢ় রহস্যকে আত্মস্থ করার অভিপ্রায়ে এবং তা প্রাঞ্জলভাবে পাঠকদের কাছে তুলে ধরেছেন। কালকূটের এই মেলাকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলি আবর্তিত হয়েছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জীবনচর্চাকে কেন্দ্র করে। কালকূটের এই ভ্রমণ বা পরিক্রমা আসলে ‘মানুষকে জানার জন্য’, নিজেকে জানার জন্য, দেশকে জানার জন্য। অগণিত মানুষের মেলায় কালকূটের সন্ধান— এক অনির্বচনীয় স্বদেশ-আত্মার। তাঁর এই তীর্থ বা মেলা পরিক্রমার কথা অনেক উপন্যাসেই আমরা দেখছি। ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ (প্রয়াগের কুম্ভমেলা, ১৯৫৪), ‘খুঁজে ফিরি সেই মানুষ’ (কেন্দুবিল্ব গ্রামের জয়দেব মেলা, ১৯৬০), ‘কোথায় পাব তারে’ (শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা, মলুটির কালীপুজো, নানুর, বক্রেশ্বর, কাটোয়ার অট্টহাস মন্দির, নবদ্বীপের ধূলট উৎসব, বর্ধমানের কুলীনগ্রামের মেলা, নৌগ্রামে জলেশ্বরের শিবরাত্রির মেলা, কেঁদুলির জয়দেব মেলা, হাড়োয়ার পীর গোরাচাঁদের মেলা, ১৯৬৮), ‘বাণীধ্বনি বেণুবনে’ (বিহারের দ্বারভাঙা জেলার জনকপুরে রাম-সীতার মেলা, ১৯৭১), ‘অমাবস্যায় চাঁদের উদয়’ (কামরূপ কামাখ্যা, ১৯৭৫), ‘ঘরের কাছে আরশিনগর’ (কুলীনগ্রাম, মানধর মেলা, ১৯৭৯), ‘চলো মন রূপনগরে’ (আঁটিশেওড়া, জামালপুরের বুড়োরাজ মেলা, ১৯৮১), ‘কোথায় সে জন আছে’ (কল্যাণী ঘোষপাড়ায় দোলমেলা, ১৯৮৩), ‘পুণ্যভূমে পুণ্যস্নান’ (সোনপুরের হরিহরছত্রের মেলা, ১৯৮৭), ‘যে খোঁজে আপন ঘরে’ (বীরভূমের মন্তলাগ্রামে বুংকেশরা ভৈরবের মেলা, কেঁদুলির জয়দেব মেলা, বেলুরিয়া, ১৯৮৭), ‘পূর্ণকুম্ভ পুনশ্চ’ (হরিদ্বারের কুম্ভমেলা, ১৯৮৮)—এরকম অজস্র মেলার কথা আমরা পাই তাঁর উপন্যাসে। একটা কথা এখানে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, মেলাকে কেন্দ্র করে উপন্যাস লিখিত হলেও মূল কেন্দ্রবিন্দু কিন্তু তীর্থক্ষেত্র নয়, তীর্থযাত্রী। পুণ্যস্নানের পুণ্যসঞ্চয়ের বাসনা নয়, বরং ত্যাগের স্বীকারোক্তি, আত্মসমর্পণবোধ এখানে মুখ্য।
চরিত্র ও বিশ্বাসযোগ্যতা, স্বদেশ অন্বেষণ
‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’-তে প্রয়াগের প্রথম রাতে কালকূট স্বকর্ণে শোনেন, নিরাবরণ ভারত কাঁদতে কাঁদতে বলছে: “বহুত পাপ কিয়া ভগবান! হে ঈশ্বর, আমার অর্থ নাও, আমার সোনা নাও, আমার খাওয়া নাও, আমাকে বিবস্ত্র করো, আমার সব নিয়ে আমায় মৃত্যু দাও। আমার এই পাপের প্রাণ আমি তোমার পায়ে দিচ্ছি। গ্রহণ করে তুমি আমাকে মুক্তি দাও। …হাতে-পায়ে খিল ধরে যাবে। ভাববে মৃত্যুকামনা শুনছি কার? আমি কোথায় এসেছি, যেখানে মানুষ অসংকোচে প্রকাশ করছে তার পাপ। নিবেদন করছে প্রাণ।”
আবার গঙ্গাস্নানের পুণ্যলগ্নে মৌন রাত্রির আলো-আঁধারিতে গৃহাবধূত পরিবারের নিরাবরণ স্নান দেখে লেখকের মনে হয়েছে, এই নগ্নতা আকাশের মতো উদার, গঙ্গা ও যমুনার মতো দ্বিধামুক্ত, লীলায়িত ও অপরূপ।
আবার ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’-তে পাঁচুগোপাল, দেশান্তরী রমণীমোহন, বলরাম, শ্যামা, ভিনদেশী ভিখারিনী সর্বনাশী, হিদের মা, খনপিসির দল, অন্ধগায়ক সুরদাসের সেই বিখ্যাত সংলাপ: “কোঈ নহি বতা সকতা কিধর গয়ী সড়ক, কঁহা গয়া রাস্তা। হ্যায় না বাবুজী?”—সবকিছু নিয়েই এ এক ভারতবর্ষের উপাখ্যান শুনিয়েছেন কালকূট। মানুষের ভিড়ে, অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্যে সবকিছু একাকার হয়ে গেছে। মনিয়াবাঈ ও রঘুনন্দনের সম্পর্ক এবং রঘুনন্দনকে হারিয়ে রামভক্ত রামজীদাসী রূপে রূপান্তরের মর্মন্তুদ কাহিনি আমাদের প্রত্যক্ষ করালেন কালকূট।
‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’-র পর সবচেয়ে আলোচিত গ্রন্থ হল ‘কোথায় পাব তারে’। তাঁর আটটি তীর্থক্ষেত্রের মধ্যে পাঁচটি তীর্থক্ষেত্রই বীরভূমকে কেন্দ্র করে। তাই বাউল ঘুরে ফিরে আসে তাঁর উপন্যাসে। বাউল কে? এই প্রশ্নের উত্তরে বাউল জানায়—সে মনের মানুষ, সে রসিক, সে অচিন পাখি, সে অধরা। তাকে পাওয়া যায় সহজ সাধনে, সহজ ভজনে, মানব-মানবীর মিলনে, নারী-পুরুষের শাশ্বত প্রেমে। যেখানে শুরু হয়েছে ‘খুঁজে ফিরি সেই মানুষে’, তারই সার্থক গভীর ব্যাখ্যা পেলাম ‘কোথায় পাব তারে’ গ্রন্থে (প্রকাশকাল ১৯৬৪ সাল, আনন্দ পাবলিশার্স)।
১৯৬০ সালে একটি নাতিদীর্ঘ রচনা ‘খুঁজে ফিরি সেই মানুষে’ কেঁদুলির জয়দেব মেলাকে কেন্দ্র করে লিখেছিলেন কালকূট। অনেক সমালোচক মনে করেন, এটিই পরবর্তীতে তাঁর ‘কোথায় পাব তারে’ রচনার মূল অনুপ্রেরণা।
‘কোথায় পাব তারে’-তে লেখকের বাল্যস্মৃতি, পূর্ববঙ্গের দিনগুলো ফিরে আসে। ইছামতী নদী পার হতে গিয়ে অধর মাঝির নৌকায় মামুদ গাজির সঙ্গে আলাপ আমাদের লেখকের কৈশোর স্মৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। কালকূটের বর্ণনায় অজানা-অচেনা ইটিন্ডা, হাসনাবাদ, ইছামতী নদী, কদমতলা, নারিন্দার পুল, গ্যান্ডারিয়া, বুড়িগঙ্গা পাঠকের চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে ওঠে। গাজির গাওয়া লালনের গানে ধরা পড়ে এক বৃহত্তর মূল্যবোধ, এক গভীর দর্শন। যার অভিঘাত হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক।
হেডমাস্টার ব্রহ্মনারায়ণ চক্রবর্তী, তাঁর শহুরে কন্যা ঝিনি বা অলকার সঙ্গে কথোপকথন, হোটেল-মালিক নারান ঠাকুর ও তাঁর দোকানের কর্মচারী ফোঁচা ও ফোঁচার স্ত্রীকে নিয়ে ঘটনাপ্রবাহ, মাহাতো চাচা ও তার তিন নম্বর স্ত্রী আঙুর, অনন্ত পাল আর বারবধূ দুলির প্রেম প্রত্যক্ষ করে লেখকের উপলব্ধি: “সমাজ আছে, অনাদি-অনন্তে। মনকে বলি, আমাকে তুমি এই ক্ষণে সামাজিক হতে বলো না। দুলির পরাজয়ের মাঝখানে যে মন বিরাজ করে, চোখের জল পড়ে, তার শরিক করো। আজ আমার সেই মনেতে বসত, সেই মনেতে ভাসি।” লেখকের এই উপলব্ধি আমাদের অজান্তেই যেন চোখে জল এনে দেয়।
আবার শেষ লগ্নে পৌষমেলার যাত্রাপথে শান্তিনিকেতনে, মলুটি গ্রামে রায়মশাইয়ের আমন্ত্রণে কালকূটের ভ্রমণ, তান্ত্রিক দেবী মৌলীক্ষার কথা, ধনু ও তিপুর প্রণয়গাথা—এরকম বিচিত্র কাহিনি নিয়ে উপন্যাসটি অগ্রসর হয়েছে। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায় গোপীদাস, বিন্দু, অচিনদা, গোকুল, সুজন—সবাই যেন এক পরিবারভুক্ত।
‘অমাবস্যায় চাঁদের উদয়’ (১৯৭৫) লেখকের কথায় সাধনতত্ত্বের কাহিনি, প্রকৃতি ও পুরুষের মিলনজাত। এ মিলন ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’ নয়। এ মিলন সাধন প্রক্রিয়ার অংশ। এই সাধনলীলা কালকূট উপলব্ধি করেছেন কামাখ্যায় প্রাণতোষ বাবা ও পবিত্রী মায়ের সাধনলীলা থেকে। এই সাধনলীলার উপস্থিতির কারণেই বাউল ও তন্ত্রের মধ্যে অনেকটাই সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। কালকূট শুধুমাত্র রেলের কামরায় যাত্রাপথের বর্ণনা দিয়ে পাঠকমনকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করেননি, বরং এমন কিছু চরিত্রের উপস্থিতি এনেছেন, যেমন—বিমলা, পবিত্রী মাতা বা জগৎসন্ন্যাসিনীর রহস্যময়তা, যা পাঠকমানসে তীব্র কৌতূহল সৃষ্টি করে। লেখক জানতে চেয়েছেন যে রূপ, যৌবন এবং কণ্ঠে সুমধুর সুর থাকা সত্ত্বেও তিনি সন্ন্যাসী কেন? মা কি তান্ত্রিক? তার উত্তরে পবিত্রী মা বলেছেন: তিনি তান্ত্রিকের সর্বসিদ্ধিদাত্রী, অভেদজ্ঞান মায়াবীজের মন্ত্রে শুদ্ধ, তিনি শক্তি। তিনি বীরের শক্তি, শিব। তিনি জগৎস্বরূপিণী ব্রহ্মাণ্ড। তাঁর শক্তি প্রেমের।
‘শাম্ব’ কালকূটের আর-এক জনপ্রিয় উপন্যাস। প্রকাশকাল ১৯৭৮। এ যেন এক পৌরাণিক আখ্যানের বিনির্মাণ। কালকূট এই উপন্যাসটি রচনার শুরুতেই ভারতীয় পুরাণকথার এক বিস্তৃত ব্যাখ্যা হাজির করেছেন, যা আধুনিক মননপ্রসূত। চিহ্নিত করেছেন স্বর্গ-নরকের ভৌগোলিক স্থান। ভারতের ইলাবৃতবর্ষকে ইন্দ্রপুরী হিসেবে চিহ্নিত করা এবং অমৃতাদির গূঢ় পরিচয়—যা ভারতীয় আয়ুর্বেদেরই চূড়ান্ত ফল, কালকূটের ব্যাখ্যায় তা নিতান্তই বাস্তব। সুরলোক, অসুরলোক, যক্ষ-রক্ষ-গন্ধর্বলোক এবং তাতে বসবাসকারী প্রজাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় নিয়ে হাজির হয়েছেন ‘শাম্ব’ উপন্যাসটিতে। কিন্তু এগুলো কোনোটিই উপন্যাসের মুখ্য বিষয় নয়, বরং তিনি পৌরাণিক আখ্যানকে কেন্দ্র করে এক আধুনিক উপন্যাস রচনা করেছেন।
‘শাম্ব’-কে তিনি একটা মহিমান্বিত জায়গায় নিয়ে গেছেন, কৃষ্ণকে গড়ে তুলেছেন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে। শাম্ব এই শাপমুক্তির উদ্দেশ্যে চন্দ্রভাগা, উদয়াচলাদি তীর্থে তীর্থে ঘুরেছেন। তাঁর শাপমুক্তির যাত্রা ছিল অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা, মৃত্যু থেকে জীবনের দিকে যাত্রা, ব্যক্তি থেকে বিশ্বের দিকে যাত্রা; এই যাত্রা শুধু রোগমুক্তির যাত্রা নয়, আত্মার মুক্তির এক অনন্ত যাত্রাও। এই যাত্রা, সংসার-হলাহলে আবক্ষ নিমজ্জিত এক মানুষের অমৃত লাভের উদ্দেশ্যে যাত্রা।
কালকূটের মানবজীবনকেন্দ্রিক অমর সৃষ্টির মধ্যে ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ (১৯৫৪), ‘মুক্তবেণীর উজানে’ (১৯৮১), ‘তুষার সিংহের পদতলে’ (১৯৭৬), ‘ঘরের কাছে আরশিনগর’ (১৯৭৯), ‘মন চলো রূপনগরে’ (১৯৮২), ‘নির্জন সৈকতে’ (১৯৭২), ‘আরব সাগরের জল লোনা’ (১৯৭২), ‘পিঞ্জরে অচিন পাখি’ (১৯৮২), ‘মন চলো বনে’ (১৯৭৩), ‘বনের সঙ্গে খেলা’ (১৯৭৪), ‘প্রেম নামে বন’ (১৯৭৪), ‘কোথায় পাব তারে’ (১৯৬৮), ‘স্বর্ণশিখর প্রাঙ্গণে’ (১৯৬৫), ‘হারায়ে সেই মানুষে’ (১৯৭৫) সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
সমালোচকরা কালকূটের সৃষ্ট প্রায় চল্লিশটির বেশি উপন্যাসকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন:
ক) লক্ষ রূপের আরশিতে বৈচিত্র্যের অন্বেষণ—এই পর্বের বিখ্যাত উপন্যাসগুলি হল: ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে,’ ‘পুণ্যভূমে পুণ্যস্নান,’ ‘হারায়ে সেই মানুষে,’ ‘মুক্তবেণীর উজানে,’ ‘পিঞ্জরে অচিন পাখি,’ ‘ঘরের কাছে আরশিনগর,’ ‘মন চলো রূপনগরে।’
খ) প্রকৃতির আকর্ষণে ঘরছাড়া কালকূটের মানবজীবন অন্বেষণ—এই পর্বে আমরা পাচ্ছি: ‘মন চলো বনে,’ ‘প্রেম নামে বন,’ ‘বনের সঙ্গে খেলা,’ ‘নির্জন সৈকতে,’ ‘স্বর্ণশিখর প্রাঙ্গণে,’ ‘তুষার সিংহের পদতলে,’ ইত্যাদি।
গ) বাউলের সহজিয়া সাধনার মানবমনে তত্ত্বতালাশ—যেমন: ‘কোথায় পাব তারে,’ ‘খুঁজে ফিরি সেই মানুষে,’ ইত্যাদি।
উপসংহার:
সমরেশ বসু যখন ‘কালকূট’ ছদ্মনাম গ্রহণ করলেন, নিজের দুই নামের সত্তাকে বিষয়ে ও লিখনশৈলীতেও পৃথক করতে তৎপর হয়েছিলেন। এ যেন দ্বৈত সত্তা। কালকূটের রচনায় আমরা পাচ্ছি রঙ্গরহস্যপ্রিয়তা, তন্ময় বৈরাগ্য, নিয়তিবাদ, গভীর দর্শন এবং অনেকটা বাউলিয়া মনের রসস্ফূর্তি। কালকূটের সৃষ্টিরা সমরেশ বসুর কঠিন, কর্কশ, বাস্তবতাধর্মী রচনার থেকে একেবারেই পৃথক। বিশিষ্ট সাহিত্যিক তিলোত্তমা মজুমদার তাঁর ‘এক কলমে সমরেশ, আর একটিতে কালকূট’ প্রবন্ধে লিখেছেন,
কালকূটের চরিত্রগুলি কুয়াশাচ্ছন্ন, তারা শূন্যে ভ্রাম্যমাণ, কিংবা মহাকাব্যিক। সমরেশ বসুর চরিত্ররা রক্ত-মাংসের গন্ধ ছড়িয়ে বেঁচে থাকা বা বাঁচতে চাওয়া মানুষ। অথচ তিনি লিখছেন একই কালে। একই উপলক্ষে, দুই ভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে দুই নামে লিখিত ভিন্ন স্বাদের উপন্যাস।
এটাই সমরেশ বসু বা কালকূটের সাফল্য।
অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্ত্রী লীলা রায় একবার সমরেশ বসুকে প্রশ্ন করেছিলেন: “তুমি কেন লেখো?”—সমরেশ বিব্রতভাবে বলেছিলেন: “জানবার জন্যই লিখি।” অসাধারণ এই অকপট স্বীকারোক্তি। যে কোনো লেখককে কোনো বস্তুনিষ্ঠ উপন্যাস লিখতে গেলে অনেক কিছু জানতে হয়। “কী জানবার জন্য?”—স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের পিঠে এসেছিল এই প্রশ্ন। সমরেশ বসু তখন একটুও না ভেবে উত্তর দিয়েছিলেন: “মানুষকে জানবার জন্য।” এই আত্মানুসন্ধানই স্রষ্টাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলে অচেনাকে চেনা আর অদেখাকে দেখার উদ্দেশ্যে। তাঁর হাত ধরেই পাঠক পৌঁছে যায় লেখকের কল্পলোকে, মনভূমে।
———-
ছবি অন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত।
